জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২৬ ১:৫০ পিএম

নদী থেকে উঠে আসা রুপালি এই মাছ এখন শুধু ঘাট বা বাজারেই নয়, জায়গা করে নিয়েছে অনলাইনেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা পেজ ও আইডিতে ছবি দিয়ে চলছে ইলিশ বিক্রির প্রচার।

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার ইলিশের সুনাম রয়েছে দেশে-বিদেশে। প্রতারকরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চাঁদপুরের নাম ব্যবহার করে অনলাইনে ইলিশ বিক্রির প্রতারণার ফাঁদে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

অপরদিকে ঘরে বসে মাছ পাওয়ার সুবিধায় ক্রেতারাও আগ্রহী হচ্ছেন। এই সহজলভ্যতার আড়ালেই তৈরি হয়েছে নতুন এক ঝুঁকি।

ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে। চাঁদপুরের প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে জেলার বাইরে থাকা কিছু অসাধু ব্যক্তি অনলাইনে মাছ বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।

অর্ডারের পর টাকা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতার হাতে পৌঁছাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ। বরং টাকা পাওয়ার পর ক্রেতার ফোন নম্বরই ব্লক করে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইনে ইলিশ কেনাবেচা নিয়ে সতর্কতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে চাঁদপুরের সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছঘাট সংলগ্ন মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সচেতনতামূলক সভায় উঠে আসে অনলাইন ইলিশ বিক্রির নানা অনিয়মের বিষয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চাঁদপুর জেলা কার্যালয় এবং জেলা মৎস্য অফিস যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

সভায় সংশ্লিষ্টরা জানান,চাঁদপুরের কোনো ব্যবসায়ী অনলাইনে ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নন। তবে ব্যবসায়ীদের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে সেগুলো ব্যবহার করছে কিছু অসাধু ব্যক্তি। ফেসবুক পেজ বা ব্যক্তিগত আইডিতে এসব ছবি প্রচার করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এরপর অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর মাছ না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ ক্রেতা অনলাইনে যে মাছটি দেখছেন, সেটি আদৌ বিক্রেতার কাছে আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকছে না।

অনলাইনে ইলিশ কেনার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কম দাম অনেক সময় ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে। বাজারদরের তুলনায় কম দামে বড় ইলিশ পাওয়ার আশায় অনেকে যাচাই-বাছাই না করেই অর্ডার করে ফেলেন। কিন্তু এই জায়গাটিই প্রতারকদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাই অনলাইনে ইলিশ কেনার আগে শুধু ছবি বা দাম দেখে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাজারে একই আকার ও মানের ইলিশের দাম কত, সেটিও আগে জেনে নিতে হবে।

বিশেষ করে অপরিচিত কোনো ফেসবুক পেজ বা ব্যক্তিগত আইডি থেকে মাছ কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

প্রতারণা এড়াতে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’র ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সভায়। অর্থাৎ মাছ হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করা। এতে অন্তত টাকা পাঠিয়ে মাছ না পাওয়ার ঝুঁকি কমে। কোনো বিক্রেতা যদি মাছ হাতে পাওয়ার আগেই পুরো টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেন, তাহলে ক্রেতাকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতারণার শিকার হলে বিষয়টি চেপে না রেখে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

অনলাইন ইলিশ ব্যবসায় প্রতারণা কমাতে শুধু ক্রেতাদের সতর্ক করাই নয়, বৈধ ব্যবসায়ীদের আলাদা করে চিহ্নিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনলাইন ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির উদ্যোগে বৈধ অনলাইন মাছ ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

এই তালিকা ব্যাপকভাবে প্রচার করা গেলে ক্রেতারা যাচাই করে বিক্রেতা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন, অন্যদিকে প্রতারকদের জন্যও অনলাইনে ভুয়া ব্যবসার সুযোগ কমবে।

চাঁদপুরে ইলিশের দাম নিয়েও আলোচনা হয়েছে সভায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়ানো গেলে দামও অনেকাংশে কমে আসতে পারে।

ইলিশের চাহিদা বেশি থাকলেও বাজারে সরবরাহ তুলনামূলক কম হলে স্বাভাবিকভাবেই দামের ওপর চাপ পড়ে। তাই দাম নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সরবরাহ বা বাজার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী অনিয়ম করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সভায় জানানো হয়েছে।

ইলিশ কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের শুধু দাম নিয়ে সচেতন হলেই হবে না, মাছের মান ও ওজন নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

সভায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ, যৌক্তিক মূল্যে মাছ বিক্রি, পচা বা নষ্ট মাছ বিক্রি না করা এবং ওজনে কম না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কারণ বাজারে একজন ক্রেতা যতটা প্রতারণার শিকার হন, নিম্নমানের বা ওজনে কম মাছ পেলেও তাঁর ক্ষতি হয়।

ইলিশের মৌসুমে ক্রেতাদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। অনলাইন সেই আগ্রহকে আরও সহজ করেছে। এখন ঘরে বসেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ইলিশের অর্ডার দেওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তির এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ প্রতারণার পথও বেছে নিচ্ছে। তাই অনলাইনে ইলিশ কেনার আগে বিক্রেতার পরিচয় যাচাই, বাজারদর সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, সম্ভব হলে ক্যাশ অন ডেলিভারি বেছে নেওয়া এবং প্রতারণার শিকার হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর মতো সতর্কতাগুলো জরুরি।

চাঁদপুরের ইলিশের খ্যাতি যেমন মানুষের রসনায় আনন্দ এনে দেয়, তেমনি সেই নাম ব্যবহার করে কেউ যেন মানুষের পকেট খালি করতে না পারে, এ দায়িত্ব ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সবার।

শেষ পর্যন্ত ইলিশের বাজারে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠছে একটি বিষয়, মাছ কেনার আগে মাছের মতোই বিক্রেতাকেও চিনে নেওয়া।

টিআর

শেয়ার

পাঠকের মতামত

সুন্দরবনের উপকূলে লবণাক্ত জমিতে সবুজের বিপ্লব

বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ জনপদে এবার সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। একসময় লবণাক্ততার ...

কলকাতায় আবাসিক হোটেলে আগুন, কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চারজন নিহত

ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ একই ...

বাণিজ্য প্রতিদিনে সংবাদ প্রকাশের পর মানিকগঞ্জে ভেজাল ছানা-ঘির কারখানা সিলগালা, জরিমানা ৫০ হাজার

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছানা তৈরির কারখানা নিয়ে জাতীয় দৈনিক বাণিজ্য প্রতিদিন-এ সংবাদ প্রকাশের পর মানিকগঞ্জে অভিযান ...