বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬ ৩:১০ পিএম , আপডেট: জুন ১৫, ২০২৬ ৪:৪৬ পিএম
  • গত বছর মার্চে ছিল ৪৮৮৮ কোটি টাকা
  • চলতি বছরের মার্চে ৫৪০৭ কোটি টাকা
  • এক বছরে বেড়েছে ৫১৯ কোটি টাকা
  • এক বছরে হিসাব বেড়েছে ১০৮০১১৯টি।

২০১০ সালে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সুবিধা দিতে ১০,৫০ ও ১০০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছিল সরকার। এগুলোকে নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট (এনএফএ) বলা হয়। তবে, স্কুল ব্যাংকিং ও কর্মজীবী শিশুদের অ্যাকাউন্ট এই হিসাবের বাইরে। এই নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ব্যালেন্স বা সার্ভিস চার্জ/ফি নেই। সমাজের সব স্তরের মানুষের আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের আওতায় এসব অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে।

এছাড়া, সাধারণ চলমান সঞ্চয় হারের তুলনায় নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্টগুলোতে বেশি হারে সুদ দেওয়া হয়। এই ব্যাংকিং সুবিধাভোগীর মধ্যে আছেন- কৃষক, পোশাক শ্রমিক, অতি দরিদ্র, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীরাসহ অনেকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ শেষে এসব মানুষের সঞ্চয় এবং হিসাব সংখ্যা উভয় বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা হিসাবে আমানত বেড়েছে ২৯১ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

তথ্য মতে, এক বছরের ব্যবধানেও বেড়েছে এসব হিসাবে আমানত। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা হিসাবে আমানত বেড়েছে ৫১৯ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে নো ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯২ লাখ ৩২ হাজার ৫৭০টি। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোতে স্বল্প আয়ের মানুষের অ্যাকাউন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৯টি। সেই হিসাবে তিন মাসে অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বেড়েছে ৮৪ হাজার ৩১৯টি।

তথ্য মতে, এক বছরে বেড়েছে এসব মানুষের হিসাব সংখ্যাও। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোতে নো ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭০টি। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোতে স্বল্প আয়ের মানুষের অ্যাকাউন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৯টি। সেই হিসাবে এক বছরে অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বেড়েছে ১০ লাখ ৮০ হাজার ১১৯টি।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর থেকে কয়েক মাস দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিলো। এরপরে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংকট কিছুটা কাটতে শুরু করায় দেশের ব্যাংকিং খাতের উপর মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করে। এর ফলে স্বল্প আয়ের মানুষেরাও ব্যাংকে টাকা রাখতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকও বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। এসব কারণে ব্যাংকে আমানত ফিরতে শুরু করেছে। তবে বর্তমানে ব্যাংক খাতে আবার যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আমানত রাখার পরিমাণ কমবে।

তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে আসা মোট প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ৮২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৮৪৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সেই হিসাবে তিনমাসে এসব হিসাবে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এছাড়া, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে নো-ফ্রিলস হিসাবের আওতায় কৃষকদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৮০৮ কোটি, অতি দরিদ্রদের ৩৪৭ কোটি, পোশাকশ্রমিকদের ছিল ৪৭৬ কোটি, মুক্তিযোদ্ধাদের হিসাবে ৯৯১ কোটি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের হিসাবে ১ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা।

আর চলতি বছরের মার্চ শেষে কৃষকদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬৩ কোটি, অতি দরিদ্রদের দাড়িয়েছে ২৭৭ কোটি, পোশাকশ্রমিকদের দাড়িয়েছে ৫০৬ কোটি, মুক্তিযোদ্ধাদের হিসাবে ৯৯০ কোটি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের হিসাবে ১ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষক এবং গবেষণার সংস্থা গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর রিসার্চ ফেলো গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার নো-ফ্রিলস হিসাবের আমানত বৃদ্ধি মূলত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ইতিবাচক প্রতিফলন। গত এক বছরে এসব হিসাবে আমানত ৫১৯ কোটি টাকা এবং হিসাব সংখ্যা ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ ও আস্থা বাড়ছে।

তিনি বলেন, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভাতা, কৃষি সহায়তা, শ্রমিকদের মজুরি এবং প্রবাসী আয়ের একটি অংশ এখন সরাসরি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিতরণ হওয়ায় এসব হিসাবে অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। একই সঙ্গে নো-ফ্রিলস হিসাব পরিচালনায় কোনো ন্যূনতম জমা বা সার্ভিস চার্জ না থাকা এবং তুলনামূলক বেশি সুদের সুবিধাও নিম্ন আয়ের মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করছে।

খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ জনির মতে, গত বছরের রাজনৈতিক ও আর্থিক অস্থিরতার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরে আসছে। ফলে আগে যারা নগদ অর্থ বা অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে সঞ্চয় করতেন, তাদের একটি অংশ এখন ব্যাংকমুখী হচ্ছেন। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগী, কৃষক ও পোশাকশ্রমিকদের আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা এ পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধারা ধরে রাখতে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, আমানতকারীদের আস্থা অটুট রাখা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচিগুলো আরও বিস্তৃত করা জরুরি। অন্যথায় সাম্প্রতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আমানত বৃদ্ধির গতি শ্লথ হতে পারে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ফ্রিল্যান্সার ও সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজে নতুন নির্দেশনা

দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ করতে নতুন নির্দেশনা ...