
ড. মো. আবু হাসান
২০২৬ সালের এপ্রিল মাস দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ইতিহাসের পাতায় বিপরীতমুখী দুটি আখ্যানের জন্ম দিয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে উৎসবমুখর পরিবেশে ইউরেনিয়াম লোড করেছে। অন্যদিকে, ৬ এপ্রিলে ভারতের তামিলনাড়ুর কালপাক্কাম পারমাণবিক কেন্দ্র পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো থোরিয়াম থেকে ইউরেনিয়াম-২৩৩ তৈরি করে জ্বালানি-বিপ্লবের সূচনা করেছে। এই দুটি সমান্তরাল ঘটনার গভীর তুলনা করলেই আমাদের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ নামক মরীচিকার ভেতরের কঙ্কালটি পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে ভারত সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে মাত্র ১০,৫০০ কোটি টাকায় আগামী শত শত বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার এক মজবুত ভিত্তি গড়ছে, সেখানে আমরা কী করছি? আমরা মাত্র ৬০ বছরের জন্য ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল রুশ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েছি। এই বিপুল ব্যয়ের ৯০ শতাংশই রাশিয়ার ঋণ। এর ওপর ৫.৫৩% উচ্চ সুদের হার, বিনিময় হার ও দেশের ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে, বিশেষজ্ঞদের মতে এই প্রকল্পের প্রকৃত খরচ শেষ পর্যন্ত ২ লাখ কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সামষ্ঠিক অর্থনীতির এই বিশাল অঙ্কগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ঠিক ২৮ এপ্রিলে। উৎসবের দিনটিতে অর্থনীতির গ্যাজুয়েট এক পেশাজীবী তাঁর ফেসবুকে ‘আইরন লেডি’র বন্দনা শেষে ঘরে ফিরলেন। বাসায় এসে লোডশেডিং পেয়ে তিনি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিচক্ষণতা নিয়ে আনুগত্যের তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন। অথচ গভীরে গেলেন না, টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থেকেও কেন দেশকে বিদ্যুতে স্বাবলম্বী না করে বিদেশি ডিজেল-নির্ভর লুটেরাদের ‘কুইক রেন্টাল’ মডেলে আটকে রাখা হলো। এদিকে, গরমে অতিষ্ঠ মেয়ের আইপিএসের আবদার আর স্ত্রীর অভিযোগে তিনি বিব্রত হন; কারণ গত ১১ বছর বেতন না বাড়া এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে তাঁর ক্রয়ক্ষমতা এখন তলানিতে। যে আলোর স্বপ্নে তিনি বিভোর, তার নেপথ্যের ৫০০ কোটি ডলার লুণ্ঠণের অভিযোগ আর উচ্চ সুদের ঋণের বোঝা আসলে তাঁরই প্রকৃত মজুরি শুষে নিচ্ছে। তিনি অর্থনীতি জানেন, অথচ রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষাক্ত সাপটি যে তাঁর নিজের ঘাড়েই ছোবল মারছে, সেই রূঢ় সত্যটি তাঁর উপলব্ধির বাইরে।
এদিকে, রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষকদের নির্মোহ দৃষ্টিতে রূপপুরের এই ‘রূপকথা’ কোনো প্রকৌশলগত বিস্ময় নয়; বরং এটি একটি নিপুণভাবে সাজানো শোষণের আখ্যান, যা নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি জাতিকে ঋণের শেকলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে আবদ্ধ করার এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই নিবন্ধের উদ্দ্যেশ্য নয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পের উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। এমনকি যারা শুরুতে ঝুঁকি নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছিলেন, লোডশেডিংয়ে জর্জরিত জাতির জন্য রূপপুরও এখন তাঁদের কাছে সাময়িক আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বরং প্রশ্নটি ভিন্ন: এই মেগাপ্রকল্পগুলোর গভীরের রাজনৈতিক অর্থনীতি না বুঝে, কেন একটি ‘কাল্ট’ পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসককে কৃতিত্ব দিয়ে মহান বলছে? কেন উচ্চশিক্ষিত সমাজও নিজের পকেট কাটার এই আত্মঘাতী উৎসবে মেতে ওঠে? এই নিবন্ধে আমরা সেই কাল্ট মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ করব এবং উন্মোচন করব রূপপুরের নেপথ্যে থাকা সেই ‘সপ্তভুজ লৌহ কাঠামো’, যা আধুনিক স্বৈরতন্ত্রের লুণ্ঠনের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ধারণ করে আছে।
কাল্ট মনস্তত্ত্ব, আত্মঘাতী কৃতজ্ঞতা ও সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ:
‘কাল্ট’ বলতে বোঝায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক এমন এক অন্ধ আনুগত্য, যেখানে নেতা নিজেকে সাধারণ মানবীয় সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেন এবং অনুসারীরা তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ করে। এই কাল্ট-নেতৃত্বই হলো শোষণের পুরো স্থাপত্যের ভিত্তিপ্রস্তর। কারণ, একবার কোনো জনগোষ্ঠী যখন নিজেদের শোষককেই মহান রূপকার হিসেবে পূজা করতে শেখে, তখন সমালোচনার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায়; আর সেখানেই খুলে যায় লুটপাটের অবাধ দুয়ার। এই কাল্ট-মানসিকতার সবচেয়ে ভয়াবহ বৈশিষ্ট্য হলো এর আত্মঘাতী স্বভাব। আমার বর্ণিত পেশাজীবীর কথাই ধরুন। রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডের দিনে তিনি ফেসবুকে ‘আইরন লেডি’র বন্দনা করলেন, অথচ পরক্ষণেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর পে-স্কেল আটকে যাওয়ার যন্ত্রণায় দিশেহারা। তিনি বোঝেন না যে, রূপপুরে একটি বালিশের দাম যখন ৬,৭১৭ টাকা ধরা হয়, তখন সেই কৃত্রিম ব্যয় মেটাতে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে বা টাকা ছাপাতে বাধ্য হতে হয়; যা চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি ঘটায়। অন্যদিকে, যখন ৫০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার করা হয়, তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়ে। এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়, যা আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়িয়ে ‘ব্যয়-বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি’ সৃষ্টি করে। রূপপুরে এই অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি, তা সে দুর্নীতির কারণেই হোক বা দুর্বল নেগোসিয়েশনের কারণেই হোক, পরিশেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তাঁর ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দেয়। যে আলোর জন্য তিনি ধন্যবাদ জানাচ্ছেন, সেই আলোর বর্ধিত বিলটিই আসলে তাঁর বেতন-বৃদ্ধি ও মেয়ের আবদার পূরণের সক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে।
এই মনস্তাত্ত্বিক অন্ধত্বের কারণেই লুণ্ঠনের তথ্য সামনে এলেও অনুসারীরা তা ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়ে তাত্ত্বিক অসম্ভবতার দোহাই দেয়, কিন্তু কাঠামোগত শোষণের বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায়। গ্লোবাল ডিফেন্স কর্পের প্রতিবেদনে রূপপুর থেকে যে ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, তা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। এটি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বাংলাদেশের লুণ্ঠন-সংস্কৃতির বাস্তব চিত্রটি ভয়াবহ। দেশের সাধারণ ঠিকাদার থেকে প্রকৌশলী মাত্রই জানেন, কমিশন, অতিমূল্যায়ন এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিবিধ সেবায় ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমেই সাধারণত প্রকল্পগুলোতে ‘রেন্ট সিকিং’ সম্পন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, তৃণমূল পর্যায়ের একজন অভিজ্ঞ ঠিকাদারের বর্ণনায়, একটি সাধারণ সড়ক বা ব্রিজের নির্মাণ ব্যয়ের অন্তত ৬০ শতাংশই বিভিন্ন স্তরে রেন্ট-সিকিং বা উপরি খরচ হিসেবে বেরিয়ে যায়। রূপপুরের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞে এই প্রক্রিয়াটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও সুসংহত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই আত্মঘাতী অন্ধত্বের সুযোগেই লুটেরা শাসকেরা গড়ে তোলে উন্নয়নের প্রতীকী স্থাপত্য, শাসক যত বড় স্বৈরাচারী, তত বড় তার স্থাপত্য। প্রাচীন মিশরের ফারাওরা যেমন পিরামিড গড়েছিলেন হাজারো দাসের রক্ত আর ঘামের ওপর, এরশাদ যেমন রাস্তাঘাটের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে লুটপাট ঢেকেছিলেন, অথবা আইয়ুব খান যেমন জাতীয় সংসদ ভবনকে ‘লৌহমানব’-এর কীর্তি হিসেবে প্রচার করেছিলেন; ঠিক তেমনিভাবে হাসিনা-কাল্ট রূপপুরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোকে ‘উন্নয়নের মহাকাব্য’ বানিয়ে লুটপাটকে বৈধতা দিয়েছে। এই শ্রেণির শাসকেরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন সব প্রকল্প হাতে নেয়, যেখানে ব্যয় অতিমূল্যায়নের সুযোগ থাকে এবং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে দুর্নীতির খবর চেপে রাখা যায়।
কিন্তু সবচেয়ে গভীর ক্ষতিটি হলো উন্নয়নের এই দৃশ্যমান স্তম্ভগুলোর আড়ালে ঘটে যাওয়া সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ। কাল্ট যখন ‘কুইক রেন্টাল’-এর নামে কুইক লুটপাট বা আদানির মতো অসম চুক্তিকেও উন্নয়ন ভেবে বন্দনা করে, তখন জাতীয় স্বার্থ বলিদান হয় অলিগার্কদের স্বার্থে। আমরা দেড় দশকে একটি দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি তৈরি করিনি, কক্সবাজার-কুয়াকাটার বিশাল থোরিয়াম সম্পদ কাজে লাগাইনি। এর বদলে আমরা বেছে নিয়েছি ইতিহাসের সর্বোচ্চ সুদে রাশিয়ার ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণের ফাঁদ। অথচ একই এপ্রিলে ভারত দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে থোরিয়াম প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র ১০,৫০০ কোটি টাকায় শত বছরের জ্বালানি-স্বাধীনতা অর্জন করা যায়। দুর্বল নেগোসিয়েশন বা কাঠামোগত ব্যর্থতা নিয়ে কথা বললেও কাল্ট অনুসারীরা গালিগালাজ শুরু করে। শোষিত জনগণ যখন নিজের শোষণকেই ‘স্বাধীনতা’ ভেবে মেনে নেয়, তখনই পরিপূর্ণ হয় সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ।
প্রকৃতপক্ষে, মানবসম্পদ উন্নয়ন না করে এবং নিজস্ব প্রযুক্তির সক্ষমতা না বাড়িয়ে এ ধরনের পরনির্ভরশীল মেগাপ্রকল্প মূলত বালির ওপর প্রাসাদ গড়ার নামান্তর। যখন কোনো দেশ বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগের বদলে কেবল ‘টার্ন-কি’ প্রজেক্ট বা বিদেশের ধার করা প্রযুক্তির ওপর ভর করে, তখন তা টেকসই উন্নয়ন নয় বরং লুণ্ঠনের এক মহোৎসবে পরিণত হয়। নিজস্ব প্রকৌশলী বা গবেষক তৈরি না করে বিদেশি ঋণে কেনা এই সক্ষমতা আসলে একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদী দাসত্বের দিকে ঠেলে দেয়। ভিত্তি শক্ত না করে কেবল দৃশ্যমান চাকচিক্য বাড়ানো আদতে দেশকে কয়েক দশক পিছিয়ে রাখার এক সুনিপুণ কৌশল; যেখানে উন্নয়ন হয় অলিগার্কদের পকেটে, আর ঋণের বোঝা চেপে বসে পরবর্তী প্রজন্মের ঘাড়ে। নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতার অভাবই লুণ্ঠনকারীদের জন্য লুপহোল তৈরির সুযোগ করে দেয়, যার চূড়ান্ত মূল্য চুকাতে হয় জাতীয় সার্বভৌমত্ব দিয়ে।
লুণ্ঠনের ইকোসিস্টেম:
রূপপুর প্রকল্প নিছক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি একটি জটিল ও সুসংহত ক্ষমতা-কাঠামোর কেন্দ্রীয় প্রতীক, যাকে আমি নাম দিয়েছি ‘সপ্তভুজ লৌহ কাঠামো’। এটি সাতটি পরস্পর-নির্ভরশীল বাহুর সমন্বয়ে গঠিত এক শোষণ-ইকোসিস্টেম, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি রন্ধ্রে নিজের শিকড় গেঁড়ে বসেছে। (১) কাল্ট নেতৃত্ব ও পরিবারতন্ত্র: এটি এই কাঠামোর প্রাণভোমরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভাগিনি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী, তাঁর মা শেখ রেহানা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নাম জড়িয়েছে কিকব্যাক নেওয়ার অভিযোগে। এই অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে ‘প্রচ্ছায়া লিমিটেড’ ও ‘জুমানা ইনভেস্টমেন্ট’-এর মতো ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে। (২) আমলাতান্ত্রিক কমপ্লেক্স: ২০১৩ সালে রুশ চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলেছিলেন, রূপপুরের মাটি পারমাণবিক কেন্দ্রের উপযুক্ত নয়। এক সাহসী সাংবাদিক তা লিখতে চাইলে তাঁর সম্পাদক অনুমতি দেননি। প্রকল্প পরিচালকের বেতন প্রধানমন্ত্রীর ছয়গুণ, ৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা! ৩৬২ কর্মকর্তার বেতন-ভাতায় বরাদ্দ ৬৯৮ কোটি টাকা। অফিসসজ্জায় ব্যয় ১৬৮.৪০ কোটি টাকা (যেখানে পদ্মা সেতুতে লেগেছিল ২.৬০ কোটি)। এই আমলাতান্ত্রিক কমপ্লেক্সের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো দুর্বল নেগোসিয়েশন, যা রূপপুরের ব্যয় আকাশচুম্বী করেছে। (৩) লুটেরা ব্যবসায়ী: ৬,৭১৭ টাকার বালিশ (বাজারমূল্যের ২০ গুণ) নিছক একটি ট্রেইলার। সিমেন্ট, রড, ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে কনসালটেন্সি ফির প্রতিটি খাতে অতিমূল্যায়ন চলেছে। টাস্কফোর্স প্রতিবেদন বলছে, দুর্নীতিতে ৮টি মেগাপ্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার। (৪ ও ৫) বিচারিক দখল ও মিডিয়া কার্টেল: বিচারব্যবস্থা পঙ্গু, দুদকের তদন্ত ফাইলবন্দি। নোয়াম চমস্কির ভাষায় মিডিয়া ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ তৈরি করে, সত্য গুম করে কেবল শাসকের গুণকীর্তন গায়। ১২০ জন সাংবাদিক ট্রেনিংয়ের নামে রাশিয়া গিয়ে ‘ব্রেইনওয়াশ’ হয়। (৬ ও ৭) ভূ-রাজনৈতিক দাসত্ব ও তৃণমূল মাফিয়া: রাশিয়ার বিশাল ঋণ বাংলাদেশকে ৬০-৮০ বছরের জ্বালানি-উপনিবেশে পরিণত করেছে (যাকে সমাজবিজ্ঞানী ওয়ালারস্টাইন ‘ওয়ার্ল্ড-সিস্টেম থিওরি’ বলেছেন)। অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে বালু থেকে বালিশ সরবরাহ, সবই মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণে।
রূপপুরের অর্থনৈতিক বাস্তবতা:
অর্থনীতির নির্মোহ বিচারে রূপপুর একটি ধ্রুপদী ‘শ্বেতহস্তী’। বেন্ট ফ্লাইভবার্গের ‘মেগাপ্রজেক্ট প্যারাডক্স’ অনুযায়ী, এ ধরনের প্রকল্পের ব্যয় সর্বদা অতিরঞ্জিত হয় এবং সুফল আসে অনেক কম। রুপপুরের ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার রুশ ঋণ। সুদের হার ৫.৫৩%, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। প্রতিদিন কেবল সুদ বাবদই যাচ্ছে ১০-১২ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আসল পরিশোধ শুরু হবে। তখন সুদ-আসল মিলিয়ে রাশিয়াকে বছরে ১.৬৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি দিতে হবে। ডলারের বিনিময় হার ৮০ থেকে ১২২ টাকা হওয়ায় প্রকল্পের খরচ এমনিতেই আরও ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি কিলোওয়াট নির্মাণ ব্যয় ২,১৫৭ ডলার, রাশিয়ায় ২,২৭১, ভারতে ২,৭৭৮ এবং বাংলাদেশের রূপপুরে এই ব্যয় ৫,২৭৫ ডলার। নতুন জ্ঞান-অবকাঠামো ও জনশক্তি গড়ার কারণে প্রথম প্রকল্পে খরচ বেশি হওয়াই স্বাভাবিক ধরে নিলেও অর্থনীতির প্রান্তিক ব্যয় বিবেচনায় নিলে এই প্রকল্প লাভজনক নয়। রূপপুরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় পড়বে ১০ টাকা ২১ পয়সা। অথচ হাঙ্গেরির পাস্ক-২ কেন্দ্রে খরচ ৮ টাকা ৬১ পয়সা এবং ভারতের কুডানকুলামে ৬ টাকা ৫৯ পয়সা। এই বিশাল বিনিয়োগের ‘সুযোগ ব্যয়’ হিসাব করলে দেখা যায়, একই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যয় করলে তার ‘প্রান্তিক উৎপাদন’ রূপপুরের চেয়ে বহুগুণ বেশি হতো। আমরা যতটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছি, তার বিনিময়ে যে পরিমাণ জাতীয় সম্পদ বিসর্জন দিচ্ছি, তার অনুপাত চরম ভারসাম্যহীন।
উন্নয়ন বনাম স্বাধীনতা:
অমর্ত্য সেনের মতে, উন্নয়ন হলো মানুষের সক্ষমতা ও স্বাধীনতার প্রসার, কেবল কংক্রিটের দানব নির্মাণ নয়। মেট্রোরেল, রূপপুর বা পদ্মা সেতুর মতো অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও এর উন্নয়ন-মডেলটি প্রশ্নবিদ্ধ। উচ্চ সুদের ঋণে লুণ্ঠননির্ভর উন্নয়ন স্বাধীনতা আনে না, বরং সৃজনশীল পরাধীনতা তৈরি করে। মিতব্যয়িতার অর্থনীতি জাতিকে ঋণের ফাঁস থেকে বাঁচিয়ে আত্মমর্যাদা দেয়, আর লুণ্ঠননির্ভর মডেল পরবর্তী প্রজন্মকে উপহার দেয় বিষণ্নতা। প্রতিবেশী দেশগুলো যখন সাশ্রয়ী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মডেল বেছে নিচ্ছে, আমরা তখন হাঁটছি বিপরীত পথে। পাকিস্তান আমদানিকৃত জ্বালানি ছেড়ে বিকেন্দ্রীভূত ‘ছাদ-সৌর’ বিপ্লবের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে এনেছে। ভারত নিজস্ব খনিজ সম্পদ (থোরিয়াম) ব্যবহার করে নামমাত্র খরচে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
রূপপুরের শক্তিতে আমাদের ড্রয়িংরুম হয়তো লোডশেডিংমুক্ত হবে, কিন্তু সেই আলোর প্রতিটি শিখায় মিশে থাকবে দুর্নীতি, দুর্বল নেগোসিয়েশন আর এক প্রজন্মের ঋণের দীর্ঘশ্বাস। পারমাণবিক সক্ষমতা আমাদের প্রয়োজন, কিন্তু তার জন্য দরকার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান। মনে রাখতে হবে, ঋণের টাকায় ৩০ বছর আগে তৈরি সেতু পেরিয়ে আজও যেমন দিনমজুরকে বাড়তি টোল দিতে হয়, রূপপুরের এই বিপুল ঋণের মূল্য আমাদের সন্তানদের আগামী কয়েক দশক ধরে চোকাতে হবে।
যতক্ষণ শোষিত জনগণ শোষককে ‘ধন্যবাদ’ দিবে, ততক্ষণ কোনো মেগাপ্রকল্পই প্রকৃত মুক্তি আনতে পারবে না। আপনি আপনার দেশের প্রকৃত মালিক; আপনার কষ্টের ঘামেই এ দেশের প্রতিটি ইট গাঁথা হয়েছে। তাই এই মালিকানা কখনো লুণ্ঠনকারীদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। লোডশেডিং দূর হওয়ার পাশাপাশি আমাদের মননের অন্ধকারও কাটুক, রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তব উপলব্ধির নতুন আলোয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: hhafij@yahoo.com
এনজে
- ১বিএনপি নব্য স্বৈরাচার হওয়ার পথে হাঁটছে : নাহিদ ইসলাম
- ২ডিজিটাল ট্রেড ও ফ্রিল্যান্সারদের সহায়তায় একাধিক নতুন বিধান
- ৩স্বাস্থ্যখাতে গবেষণায় খুবই কম ব্যয় করা হচ্ছে: জিয়াউদ্দিন হায়দার
- ৪আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন কারাগারে
- ৫পাবনায় যমুনা ব্যাংকের উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের সমাপনী, সনদ ও ক্রেস্ট বিতরণ
- ৬মৌলিক প্রশিক্ষণ নেওয়া ৫৬ শিক্ষানবিশ এএসপিকে বদলি
- ৭ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করল ব্র্যাক ব্যাংক
- ৮আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত
- ৯সিরাজগঞ্জে নদীভাঙন কবলিতদের পাশে জেলা প্রশাসক
- ১০২০২৬ সালের মধ্যে বন্ধ কারখানা চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- ১জবির নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্প নিয়ে ভয়ংকর নীলনকশা!
- ২নেশা চক্রের খপ্পরে অচেতন গরু ব্যবসায়ী, উদ্ধারের দুই দিন পর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিল ‘আজকের তারুণ্য’
- ৩বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ
- ৪চাঁদপুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ
- ৫সরকারি বীজ খোলা বাজারে অবৈধভাবে বিক্রির দায়ে ৭ দিনের কারাদণ্ড
- ৬শুধু নিরাময় নয়, রোগ প্রতিরোধে মনোযোগ দিতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- ৭নবীনগর উপজেলা পরিষদে মাতৃদুগ্ধ কর্নার ও নারীদের নামাজের স্থান চালু
- ৮টেকসই অর্থায়নে উল্লম্ফন, কমেছে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ
- ৯বাকৃবিতে স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত
- ১০একটি সাক্ষরের ভুলে ভেঙে গেল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন





পাঠকের মতামত