দিদারুল আলম
প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬ ৪:৪৬ পিএম

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবছর চট্টগ্রামে মোট কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু। ফলে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৫২০টি।

এই ঘাটতি পূরণে দেশের বিভিন্ন জেলা-নাটোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ পার্বত্য অঞ্চল থেকে গরু আনা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর। তিনি জানান, অবৈধভাবে বিদেশি পশু প্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে এবং দেশীয় উৎপাদন দিয়েই চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে।

চট্টগ্রামে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১১ হাজারের বেশি খামার রয়েছে, যেখানে দেশি ও বিদেশি জাতের গরু, মহিষ, ছাগলসহ বিভিন্ন পশু লালন-পালন করা হচ্ছে। উৎপাদিত পশুর মধ্যে গরু, মহিষ ও ছাগলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও চাহিদার তুলনায় তা কিছুটা কম। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক হারে পশু মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ফটিকছড়ি, বাঁশখালী ও মিরসরাই শীর্ষে রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে এসে চাহিদা দাঁড়ায় আট লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টিতে। চলতি বছর চাহিদা কিছুটা কমে আট লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি বলে সূত্র জানায়।

জানা গেছে, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, মিরসরাই, পটিয়া, হাটহাজারী, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, রাঙ্গুনিয়া, সন্দ্বীপ, রাউজানসহ বিভিন্ন উপজেলায় গত কয়েক বছরে খামারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এখন সারা বছর পরিকল্পিতভাবে পশু লালন-পালন করছেন কোরবানির মৌসুম সামনে রেখে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন চাঙ্গা হচ্ছে, তেমনি বাইরের জেলার ওপর নির্ভরশীলতাও কমছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ফটিকছড়িতে সবচেয়ে বেশি গরু রয়েছে- মোট ৪৩ হাজার ৯৭৪টি। বাঁশখালীতে ৩৮ হাজার ৩৩২টি এবং মিরসরাইয়ে ৩৮ হাজার ৪১টি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়া পটিয়া, হাটহাজারী, সাতকানিয়া, রাঙ্গুনিয়া, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পশু রয়েছে।

গরুর পাশাপাশি মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সরবরাহও কম নয়। জেলায় মহিষ রয়েছে ৪৭ হাজার ৮৩৪টি, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সন্দ্বীপে। ছাগলের সংখ্যা এক লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি এবং ভেড়া রয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩টি।

এদিকে, পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ বাড়ার কারণে এবছর কোরবানির পশুর দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খামারি ও সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীদের মতে, গোখাদ্য, চিকিৎসা, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মালিক মোহাম্মদ ওমর বলেন, স্থানীয় উৎপাদন কমার কারণ হচ্ছে, এখানে অস্বাভাবিকভাবে গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে। বিভিন্ন খাদ্যের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। বিষয়টি নিয়ে বহুবছর ধরে আমরা আমাদের এসোসিয়েশন থেকে সরকারকে বলে আসছি।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের যে খাদ্যপণ্য চালসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বাজার মনিটরিং করা হয়, অভিযান চলিয়ে জরিমানা করা হয়। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু গো-খাদ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু হয় না। ফলে হঠাৎ করেই গো–খাদ্যের উৎপাদকরা দাম দেড়গুণ করে ফেলে। যেমন সয়াবিনের খৈল ২৬শ টাকা থেকে ৩৩শ টাকা করে ফেলেছে, এটা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।

মালিক মোহাম্মদ ওমর বলেন, যেসব খামারির আয়ের অন্য কোনো সোর্স নেই, তারা গো-খাদ্যের দাম ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পেলে অনেক সময় এডজাস্ট করতে না পেরে খামারই বন্ধ করে দেন। এবার চট্টগ্রামে খামারিও কমেছে। যাদের বিকল্প আয় আছে তারা দাম বাড়লেও অপেক্ষা করেন। চট্টগ্রামে অনেকগুলো ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে।

কোরবানির পশু কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেই এখন হাটের পরিবর্তে সরাসরি খামার থেকে পশু কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে অনলাইন লেনদেনে প্রতারণার ঝুঁকি থাকায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে লাল রঙের গরু-বিশেষ করে রেড চিটাগাং ও শাহিওয়াল জাতের প্রতি আগ্রহ বেশি। এছাড়া নেপালি, অস্ট্রেলিয়ান জাতের গরু, এমনকি দুম্বা ও উটের প্রতিও আগ্রহ রয়েছে কিছু ক্রেতার মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সার্বিক চিত্র বিবেচনায় কোরবানির পশুর কোনো বড় সংকটের আশঙ্কা নেই। জাতীয় পর্যায়ে চাহিদার তুলনায় পশুর উদ্বৃত্ত থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে আন্তঃজেলা নির্ভরতা বাড়ছে।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে পশুর হাট প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে। সাগরিকা, বিবিরহাটসহ বড় হাটগুলোতে পশু আসা শুরু হয়েছে। ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাজার আরও জমজমাট হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

মোড়লগঞ্জ-শরণখোলা-খুলনা রুটে বিআরটিসির নৈরাজ্য অনিয়মে অতিষ্ঠ যাত্রীরা

বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ-শরণখোলা-খুলনা রুটে চলাচলকারী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) বাস সেবাকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের মধ্যে ...

চুয়াডাঙ্গায় ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সড়কের আলুকদিয়া বাজার এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় আব্দুল্লাহ (১৫) নামে এক কিশোর মোটরসাইকেল আরোহীর মর্মান্তিক ...

নবীনগরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন এমপি আব্দুল মান্নান

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বৃক্ষরোপণ ও চারাগাছ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান। ...

পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি 

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ফাতেমা মতিন মহিলা মহাবিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে এইচএসসি নারী পরীক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি ও ...

এলজিইডি চাঁদপুরের নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুজ্জামানের দায়িত্ব গ্রহণ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চাঁদপুর জেলা কার্যালয়ের নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেছেন মো. ...