বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৭, ২০২৬ ৩:৩৭ পিএম , আপডেট: জানুয়ারী ২৭, ২০২৬ ৩:৪১ পিএম

শিক্ষার্থীদের চোখে বিশ্ববিদ্যালয় মানে কেবল একটি ক্যাম্পাস নয়—এটি পরিচয়ের জায়গা, স্বপ্ন নির্মাণের কারখানা। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই বহু নবীন শিক্ষার্থী পা রাখছে রাজধানীর সরকারি সাতটি কলেজ নিয়ে গঠিত “ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি”–এর পথে।

এই সাতটি কলেজ হলো—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ।

২০১৭ সালে এই সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভুক্ত করা হয়। তবে অধীভুক্তির পর থেকেই শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত বৈষম্য ও প্রশাসনিক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। ক্লাসের অনিয়ম, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা, ভুতুড়ে ফলাফল এবং প্রশাসনিক জটিলতা হয়ে উঠেছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।

সে সময়ে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান চোখ হারান—যা সাত কলেজের আন্দোলনের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে আছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে শুরু হওয়া সাত কলেজ সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, সাতটি কলেজকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তারা অধীভুক্তির ঝুলন্ত অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে এবং উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম হবে।

আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাত কলেজ সংস্কারের প্রেক্ষাপটে অনেকেরই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নীতিগতভাবে সাত কলেজ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়—অর্থাৎ “ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি”—প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

পরবর্তীতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একটি খসড়া স্কুলিং মডেল প্রস্তাব করে। তবে সাত কলেজের শিক্ষক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাত কলেজ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা কমিটির আপত্তির কারণে সেই মডেল থেকে সরে এসে নতুন একটি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়।

নতুন প্রস্তাবিত মডেলে সাতটি কলেজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে তাদের সংযুক্তিতে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, যা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবশেষে, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে এটি শুধু নতুন নামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি তাদের অতীতের ক্ষোভ, বর্তমানের অপেক্ষা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের সমষ্টি। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির চার শিক্ষার্থীর ভাবনা ও প্রত্যাশা জানাচ্ছেন।

এ বিষয়ে ইডেন মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার চৌধুরী বলেন, এখান থেকেই বের হবে দেশের ১ম সারির অফিসার, ক্যাডার, গবেষক ও বিশ্বমানের নন্দিত ব্যক্তিবর্গ।

তিনি বলেন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয় এটি লাখো শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের মানসিক বিড়ম্বনা, নেতিবাচক মন্তব্য, দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যাওয়া অপমানের পর এক অতি আকাঙ্ক্ষিত বিজয়,এক আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াই। নবীন হিসেবে এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রথম ব্যাচ এর শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিকে দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখতে। ইনশাআল্লাহ এখান থেকেই এখন থেকে বের হবে দেশের প্রথম সারির অফিসার, ক্যাডার, গবেষক এবং বিশ্বমানের নন্দিত ব্যক্তিবর্গ। এখানে পর্যাপ্ত গবেষণাগার, উন্নত ও যথাযথ শিক্ষামূলক পরিবেশ ইত্যাদি আমাদের প্রত্যাশা। শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা সবাই সমান এখানে কোনো বৈষম্য কাম্য নয় আর চাইলেই যে ডিসিইউ থেকেও ভালো কিছু সম্ভব ইনশাআল্লাহ ঢাকা সেন্ট্রাল হবে তার প্রমাণ।

নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন কবি নজরুল কলেজের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান মিয়া।

তিনি বলেন, যেহেতু এটি শিক্ষা সিন্ডিকেট কে পরাজিত করে জয়ী হওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় সেহেতু শিক্ষার্থী হিসাবে আমার প্রথম ভাবনা থাকবে ভবিষ্যতে যেন কোন শিক্ষা সিন্ডিকেট এর আক্রশ এর শিকার না হতে পারে। ডিসিইউ পূর্ণাঙ্গ পেতে একটি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা যাতে করে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করা যায়।একজন শিক্ষার্থী হিসেবে চাওয়া সকল ছাত্র এবং শিক্ষক একত্রিত হওয়ার জন্য একটি টিএসসি খুব প্রয়োজন এবংঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির একটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা যেটিতে সকল ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে। সুন্দর পরিবহনের ব্যবস্থা থাকবে ও একটি ভালো শিক্ষার পরিবেশ, সহযোগিতাপূর্ণ শিক্ষক এবং নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ থাকবে।

ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এম. আবু বকর শেখ বলেন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি গৌরবের সাথে বিনির্মানে সহযোগিতা করবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের উচ্চ শিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এই বিদ্যাপীঠ শুধু উচ্চ শিক্ষাই প্রদান করবে না বরং দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি গৌরবের সাথে বিনির্মাণে সহযোগিতা করবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে।

তিতুমীর কলেজের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষার্থী এফ.এ টুটুল বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত অংশ হতে পারাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আমাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও সংগ্রাম এক সুতোয় গাঁথা। আমরা চাই এক ও অভিন্ন পরিচয় ক্যাম্পাসের সীমানা পেরিয়ে আমাদের পরিচয় হবে ঢাকেবিয়ান। ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমাদের ন্যায্য অধিকার, আত্মপরিচয় ও মর্যাদার প্রতীক। আমরা চাই একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ যেখানে শিক্ষা, গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরস্পরের পরিপূরক হয়ে বিকশিত হবে। নবীন হিসেবে আমরা আশাবাদী এই ক্যাম্পাস থেকেই গড়ে উঠবে আগামীর যোগ্য, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা, ঢাকেবিয়ানরা, অগ্রণী ভূমিকা রাখতে চাই প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা নিয়েই আমাদের পথচলা। সব বাধা অতিক্রম করে আমাদের প্রতিষ্ঠান তার প্রাপ্য মর্যাদার আসনে পৌঁছাবেই এই অটল বিশ্বাস বুকে ধারণ করেই আমরা এগিয়ে চলেছি। ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত অংশ হতে পারাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

পাবিপ্রবিতে নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি ১ জন

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) নবীন শিক্ষার্থীদের সাথে র‍্যাগিংয়ের ...

ক্লিন ক্যাম্পাসের অংশ হিসেবে প্রশাসনের উদ্যোগে ইবিতে ডাস্টবিন স্থাপন

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ার লক্ষ্যে ক্লিন ক্যাম্পাসের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ...

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে আরএইচস্টেপের কর্মশালা

তরুণদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ...

যবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক পদে নতুন মুখ

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (যবিপ্রবিসাস) ষষ্ঠ কার্যনির্বাহী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং প্রচার, ...

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরল কমিটির হাতে

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) দেওয়া ক্ষমতা বাতিল করেছে সরকার। এ ...

শিশুদের প্রযুক্তি থেকে দূরে নয়, নিরাপদ ব্যবহার শেখাতে হবে : ববি হাজ্জাজ

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ভয় নয়, বরং নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও ...