বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬ ২:৩৯ এএম , আপডেট: জুন ৩, ২০২৬ ১০:৪১ পিএম
  • ধানমন্ডির ঠিকানায় নেই ঋণ নেওয়া ‘এগ্রোকর্প লিমিটেডে’র অস্তিত্ব
  • এস আলমের ব্যাংকের খেলাপি ঋণের তথ্য গোপনে সহায়তার অভিযোগও আছে খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের পদ হারান খুরশীদ আলম। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো থেকে এস আলম লোনের নামে যে লুটপাট করেছে তাতে খুরশীদ আলম সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়ানোর আরও প্রমাণিত অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার পর বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এমনকি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা তার পদত্যাগের দাবিতে লাগাতার আন্দোলনও করছে।

এদিকে, খুরশীদ আলমকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে তার স্ত্রী আফরোজা আক্তারের এগ্রোকর্প লিমিটেড নামে নামসর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে লোনের নামে ব্যাংক থেকে টাকা নেয়ার তথ্য। আর সেই ব্যাংকও আবার এস আলম নিয়ন্ত্রিত ফার্স্টসিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক। ঋণের ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, খুরশীদ আলমের গৃহিণী স্ত্রী আফরোজা আক্তার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক সাবেক নির্বাহী পরিচালক জামাল মোল্লার স্ত্রী আলিয়া খানম চৌধুরীর নামে এগ্রোকর্প লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক থেকে ২০১৬ সালে ঋণ নেওয়া হয়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ঋণের পুরোটাই এখন মন্দমানে শ্রেণীকৃত। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির নামে মেঘনা ব্যাংকে ৭৭ লাখ টাকা ঋণ ‘এসএমএ’ মানে শ্রেণীকৃত।

আর খুরশীদ আলমের স্ত্রীর খেলাপি ঋণের কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিক খুরশীদ আলমের স্ত্রী। ওই ঋণ পরবর্তীতে খেলাপি হয়েছে। তবে খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ওই ঋণের গ্রহীতা নন এবং তাকে ঋণ খেলাপি হিসেবে অভিহিত করাও সঠিক হবে না।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তার এগ্রোকর্প লিমিটেড নামে যে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়েছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। ঋণ নেয়ার সময় ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কের ২৩/এ, বাসাতে ওই কোম্পানির ঠিকানা ব্যবহার করলেও সেখানে গিয়ে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এছাড়া খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধেও রয়েছে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ। এমনকি তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের শাস্তির মুখোমুখিও হয়েছেন একবার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, রংপুর অফিসে মহাব্যবস্থাপক থাকাকালে খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ একটি অফিস আদেশ জারি করে। ওই আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস-২০০৩-এর ৪৪(১)(বি) ধারা অনুযায়ী তার দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত করা হয়।

এছাড়া, ঘুষ নিয়ে এস আলমের নিয়ন্ত্রিত সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে তথ্য গোপন করার সুযোগ দিয়েছিলেন এমন অভিযোগও রয়েছে খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে। ব্যাংকটির প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৯ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা হলেও দেখানো হয়েছে মাত্র এক হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। এর মানে, গোপন করা হয়েছে ৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকার খেলাপির তথ্য।

এ ছাড়া ৯ হাজার ২৮১ কোটি টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার কথা থাকলেও রেখেছে এক হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে আড়াল করা হয়েছে ৮ হাজার ১২৮ কোটি টাকার প্রভিশন। এভাবে প্রকৃত তথ্য আড়াল করে ব্যাংকটি ২০২৩ সালের জন্য ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে, যার ৫ শতাংশ ছিল নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক।

পরিদর্শন-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা এসআইবিএলের এ ঘটনা তুলে ধরে নিজের ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘পরিদর্শন বিভাগে আসার পর বিরাট এক ধাক্কা খেতে হলো। আমাদের বের করা ৮ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম মাত্র ৫০ কোটিতে নিয়ে আসতে হলো। আমি নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালকদের জানাইু এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তারাও এটা ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। তবে আমাদের পরিদর্শন বিভাগের ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলম আমাদের সবাইকে ডেকে নিয়ে বাধ্য করলেন। বাধ্য করলেন উক্ত অনিয়ম করতে। বললেন, যেভাবেই হোক সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাতে অনিয়মের ফিগারটা মাত্র ৫০ কোটিতে চলে আসে। আমরা বললাম, বিষয়টি গভর্নরকে ইনফর্ম করা দরকার। উনি বললেন, গভর্নরকে তিনি মৌখিকভাবে জানাবেন। পরবর্তী সময়ে শুনলাম, গভর্নরও এতে সায় দিয়েছিলেন। তখন থেকে আমি আর বুক ফুলিয়ে বলতে পারি নাু আমি কোনো অন্যায় নোটে সাইন করি না।’

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের স্ত্রীর খেলাপি ঋণ এবং তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফার্স্টসিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, ২০২০ সাল পর্যন্ত এগ্রোকর্প লিমিটেড এর কার্যক্রম চালু ছিল। এরপর থেকে বন্ধ। এখন তারা আবার চালু করতে ঋণ পুনঃতফসিল করার চেষ্টা করছে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ব্যাংকারদের শৃঙ্খলাভঙ্গের মামলা দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ

ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজের অভিযোগ ও শৃঙ্খলামূলক মামলা দুই মাসের মধ্যে ...

খেলাপি হলে মিলবে না ইডিএফ ঋণের নতুন সুবিধা

রপ্তানিমুখী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার অর্থায়ন আরও সুশৃঙ্খল করতে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ...

ফ্রিল্যান্সার ও সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজে নতুন নির্দেশনা

দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ করতে নতুন নির্দেশনা ...