বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৫ ২:৫৯ পিএম

# পাথর লুটে অভিযুক্ত জামায়াতের ২ নেতা
# সমবায়ের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ
# নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি উত্থান পতনের সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বিতর্কে জড়িয়েছে দলটি। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান বিভক্তি থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান জামায়াতে ইসলামীকে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হতে হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতি থেকে বাইরে থাকা দলটি জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের সুবাদে দেশের রাজনীতিতে ফের সুযোগ পেলেও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি দলটি। তবে, বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনে জামায়াতের যারা এমপি মন্ত্রী হয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগ থাকলেও অর্থ কেলেঙ্কারীর তেমন প্রমাণ পায়নি কেউ। শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনামলে জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিপীড়ন, নির্যাতন চালালেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে দলটি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নানা অপরাধ ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়লেও জামায়াত নেতাদের কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। সৎ মানুষদের রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারকের বাসায় টাকা পাঠানো থেকে শুরু করে নারীকে কুপ্রস্তাব, চাঁদাবাজি, হত্যা, অপহরণ, মাদকবিরোধী অভিযানে হামলা, জমি দখল, এমনকি ধর্মীয় স্থাপনা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

পাথর লুটে অভিযুক্ত জামায়াতের ২ নেতা

সম্প্রতি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ‘সাদাপাথর’ এলাকা থেকে পাথর লুটে জড়িত ৪২ জনের মধ্যে জামায়াতের ২ নেতা ছিলো বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। যদিও জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি অস্বীকার করে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

অভিযুক্ত ২ নেতা হলেন- সিলেট মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. ফখরুল ইসলাম ও সিলেট জেলার সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন।

বিচারকের বাসায় টাকা পাঠানোর অভিযোগ

পটুয়াখালীতে এক বিচারকের বাসায় টাকা পাঠানোর অভিযোগে দলটির প্রভাবশালী নেতা ও আইনজীবী রুহুল আমিন সিকদারের আইনজীবী সনদ এবং দলীয় পদ স্থগিত করা হয়। একইভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে জামায়াত।

সমবায়ের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ

জামালপুরে সমবায় সমিতির নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আটক করা হয়েছে আল আকাবা সমবায় সমিতি লি: এর অন্যতম পরিচালক ও জামায়াতের মাদারগঞ্জ উপজেলার নেতা মাহবুবুর রহমানকে।

গত ২৩ এপ্রিল জামালপুর জেলা শহরের নয়াপাড়ার আলফা গার্ডেন বাসার সামনে থেকে গ্রাহকরা তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।

আটকের পর ওই পরিচালককে গণপিটুনি ও গলায় জুতার মালা দিয়ে ঘোরানো হয়। পরে গলায় জুতার মালা পরিহিত ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।

আটক মাহাবুবুর রহমান জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ মাদারগঞ্জ উপজেলার শীর্ষ স্থানীয় নেতা এবং আল আকাবা সমবায় সমিতির লি: এর একজন পরিচালক।

নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. সিরাজুল ইসলাম সিরাজের বিরুদ্ধে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামে একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযুক্তের দাবি, রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

এদিকে প্রতারণার শিকার দুই ভুক্তভোগী এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গত ২ আগস্ট উপজেলা ও জেলা আমির বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এতে দলীয় নেতাদের তোপের মুখে পড়েন সিরাজুল ইসলাম। পরবর্তীতে সিনিয়র নেতাদের মধ্যস্থতায় টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন সিরাজুল।

এক চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে প্রায় ১৭ লাখ টাকা নেওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে ভুক্তভোগী ও তার পক্ষের লোকজন তাজুল নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে সিরাজুলের সঙ্গে বৈঠক করেন। যেখানে কয়েকজন দলীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিরাজুল টাকা লেনদেন ও ব্যাংকের চেক নেওয়ার বিষয় স্বীকার করেন। প্রমাণ হিসেবে একজন ৩ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করেন। যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

পাবনায় এক নারীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অডিও ভাইরাল হয়ে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কুড়িগ্রাম, নাটোর, ফেনী, সুনামগঞ্জসহ একাধিক জেলায় চাঁদা দাবি ও ব্যবসায়ী হয়রানির অভিযোগে জামায়াত নেতারা আটক ও মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। কক্সবাজার ও ঝিনাইদহে বিএনপি নেতাদের হত্যার অভিযোগেও জামায়াত নেতাদের জড়িত করা হয়েছে। এছাড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, চট্টগ্রাম ও হাতিয়া, পবনায় হামলা, জমি দখল, লুটপাট এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শুধু তাই নয়, পাবনায় ইউনিয়ন জামায়াত সভাপতি আকরাম হোসেন মন্ডলের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও ইজারাদারের নিকট থেকে জোরপূর্বক হাটের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লালমনিরহাটে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে কৌশলে দলে ভেড়ানোর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ছাড়া মসজিদ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার, অবৈধ বালু উত্তোলন থেকে অর্থ গ্রহণ, এমনকি শিবিরের জনশক্তি দ্বারা সহপাঠী নির্যাতনের ঘটনাও জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অপকর্মে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তা যথেষ্ট না। জামায়াতে ইসলামী যেহেতু ধর্মভিত্তিক দল তাই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে সেটি সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে। একের পর এক এ ধরনের অপরাধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড দলটির ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করছে। জামায়াতের নীতিনির্ধারণী ফোরাম এসব বিষয়ে আরো কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দলটির ভিতরে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। ধর্মভিত্তিক দল হওয়ায় নেতাকর্মীদের ব্যাপারে জামায়াতকে আরো সতর্ক হতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, প্রথমত, আমরা যে সমাজে বসবাস করছি সেই সমাজে তো ভালো-মন্দ মিলেই হয়। সবাই ভালো হয় না, সবাই খারাপ হয় না। আর সমাজে ভালো করার জন্য সরকারের বা রাষ্ট্রের অথবা রাজনৈতিক দলগুলোর বা সমাজের যারা আছে, ব্যক্তিদের যে ভূমিকা সেই ভূমিকা পালনেও অনেকগুলো দুর্বলতা সীমাবদ্ধতা তো আছেই। এগুলো নিয়েই আমাদের সমাজ চলছে। সৎ এবং সুস্থ সমাজ করার জন্য গত ১৫/১৬ বছর ভালো কিছু করা হয় নাই। সরকারে যারা ছিলেন তারাই বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করেছেন, লুটপাট করেছেন, সন্ত্রাস করেছেন, গুম করেছেন, মানুষকে হত্যা করেছেন। পরে একটা বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত মানসিক ট্রমা সমাজ পেয়েছি। আর এই সমাজকে ভালো করার জন্য আমাদের সবাইকে চেষ্টা করতে হবে।

তিনি বলেন, যে নিউজগুলো আসছে এইগুলোতে আমরা আমাদের বক্তব্য দিয়েছি, প্রতিবাদ করেছি। যাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে আমরা তাদের বিষয়টা ক্লিয়ার করেছি। জামায়াত ইসলামী একটি আদর্শবাদী নৈতিক সংগঠনের দল। আমরা চেষ্টা করি, আমাদের দলের লোক যারা আছে, যারা আমাদের সাথে সম্পৃক্ত তাদেরকে নৈতিক ,আদর্শিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার। তাদেরকে একজন ভালো মানের রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার জন্য দেশপ্রেমী হওয়ার জন্য সৎ নীতিবান হওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা করি। এই প্রচেষ্টা আমাদের অব্যাহত আছে এবং যেখানে আমাদের দলীয় অনুসন্ধানে কোন ত্রুটি পাই, বিচ্যুতি পাই সেখানে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এটা আমাদের একটি নিয়মিত কর্মসূচি। আমরা এটা মনিটরিং করি। এজন্য পত্রিকা বা মিডিয়াতে যখন কোনো অভিযোগ আসে তখন আমরা খোঁজখবর নিই। যার কোন সংশ্লিষ্টতা পাই আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিই। পত্রিকায় দেই তাকে বহিষ্কার করি অথবা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত আমরা দিয়ে থাকি। যেখানে যতটুকু ব্যবস্থা নেওয়া উচিত আমরা খোঁজখবর নিয়ে এই সমস্ত বিষয়ে আমাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

অভ্যুত্থানের পর থেকে দখল, চাঁদাবাজির বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ আমাদের ডিএনএর মধ্যে ঢুকে গেছে। আমাদের ইয়াং জেনারেশনের অনেকে সৎ জীবনে বিশ্বাস করে না। জামায়াত মুখে যতই বলুক তাদের সবাই একেবারে ফেরেস্তা হয়ে গেছে তা তো না। তাছাড়া দুর্নীতি আমাদের কালচারের মধ্যেও ঢুকে গেছে। আপনি কাকে বাদ দেবেন। কোনো দেশে যখন আইনের শাসন থাকে না, যেখানে কোন বিচার থাকে না। যেখানে লুটতরাজ করলে বিচার হয় না। সেখানে আস্তে আস্তে সবাই সেই পথেই চলে যায়। আদর্শের কথা বললেও সবাই তো সেই আদর্শ মেনে চলবে তা তো নয়। বিএনপিও তো বলছে যে তারা চাঁন্দাবাজি করে না। তৃণমূলের নেতারা তো করেই চলেছে।

তিনি বলেন, অনেক সময় তো পার্টির নাম ভাঙিয়ে অনেকে অনেক কিছু করে। বাংলাদেশে আসলে কোন সিস্টেম নাই তো, মানে যে যা করছে তা বের করাই তো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। কোথায় কে কি করছে বুঝতে পারা যায় না। একটা তালমাতাল অবস্থায় থাকলে যা হয় আর কী। সবাই সেই সুযোগটাই নেয়।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

এফবিসিসিআই’র রিপোর্ট গত বছরের তুলনায় এবার খাদ্যপণ্যের দামে বাড়তি চাপ

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি আর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে টালমাটাল দেশের নিত্যপণ্যের বাজার। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার রেশ ধরে ...

আইপিও তহবিলে অনিয়ম একমি পেস্টিসাইডসের, ব্যবসায় লোকসান হলেও লাগামহীন শেয়ারদর

আইপিও তহবিলের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, প্রসপেক্টাসে ঘোষিত সমসূচি না মানা, তহবিল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা ...

বিএসইসির নির্দেশনা উপেক্ষিত অদাবিকৃত লভ্যাংশ নিয়ে কোম্পানিগুলোর গড়িমসি

অদাবিকৃত লভ্যাংশ বিতরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্দেশনা মানছে না পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলো অদাবিকৃত লভ্যাংশ ...