ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২৬ ৪:২৪ পিএম , আপডেট: মার্চ ১৬, ২০২৬ ৪:৪০ পিএম

দিনাজপুরের সাহাপাড়া খাল থেকে দেশের সর্ববৃহৎ খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। যা একসঙ্গে নদী-নালা ও জলাধারের প্রবাহ সচল রাখা, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং কৃষি উৎপাদন ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান -এর স্বপ্ন আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মাত্রায় পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা ও খাল পুনঃখনন হবে, যা দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলবে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে নদী-নালা-খাল ও জলাধারের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এই প্রাকৃতিক জলধারাগুলো কেবল সেচ বা পানিপ্রবাহের মাধ্যম নয়; বরং এগুলো দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতার অন্যতম ভিত্তি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঐতিহ্য মূলত জলপথনির্ভর জীবনব্যবস্থা, যেখানে নদী-খালগুলো শুধু পানি বহনের মাধ্যম নয়, গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্বতঃসিদ্ধ অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য নদী, খাল ও জলাধার ভরাট বা দখলের শিকার হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক জলপ্রবাহের নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, কোথাও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট সবই গ্রামীণ জীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতায় খাল পুনরুদ্ধার বা পুনঃখননের প্রশ্নটি এখন কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয় বরং এটি পরিবেশ, কৃষি ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’ শুরু করেছিলেন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বেচ্ছাশ্রমের সমন্বয় ছিল এই কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে জলাধার সংস্কার, অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল। দিনাজপুর, রংপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, যশোর, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল সংস্কার ও নতুন খাল খননের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বহু এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর হয়েছিল, আবার কোথাও কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৭৯-১৯৮১ সালের মধ্যে এক হাজার পাঁচশর বেশি খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল। একই সময়ের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২৭৯টি প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার ছয়শ মাইলের বেশি খাল খনন করা হয়েছিল। শুধু কৃষি উৎপাদনই নয়, গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতির গতিশীলতা এবং জলজ সম্পদের উন্নয়নও ঘটেছিল। সময়ের পরিক্রমায় সেই সময়ের অনেক খাল আবার ভরাট বা বেদখল হয়ে গেছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, হঠাৎ অতিবৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে এই প্রভাব আরও প্রকট। ফলে প্রাকৃতিক জলপথ পুনরুদ্ধার এখন কেবল উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং জলবায়ু অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন-পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। দিনাজপুরের সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ অনেকের কাছে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন করা হবে, যা দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।

এই আধুনিক খাল খনন কর্মসূচির সম্ভাব্য প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, আধুনিক সেচ প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে সেচ ব্যবস্থা উন্নত করা হলে কৃষকের খরচ কমবে এবং ফলন বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়ত, খালগুলো সারা বছর পানি ধরে রাখলে মাছচাষ ও হাঁস পালনসহ বহুমাত্রিক গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে গ্রামীণ যুবকদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। তৃতীয়ত, খাল পুনঃখনন বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। উদাহরণস্বরূপ, দিনাজপুরের সাহাপাড়া এলাকায় ১২ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের ফলে আশপাশের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বর্ষাকালের অতিরিক্ত বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে। খালপাড় সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পানি ব্যবস্থাপনায় খালভিত্তিক পরিকল্পনার গুরুত্ব বিশ্বের অনেক দেশেই স্বীকৃত। উদাহরণ হিসেবে নেদারল্যান্ডের কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খাল, বাঁধ ও পোল্ডার ব্যবস্থার সমন্বয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করে কৃষি ও জনপদ রক্ষা করা হয়েছে। একইভাবে চীনে প্রাচীনকাল থেকেই বৃহৎ খাল ব্যবস্থার ঐতিহ্য রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ গ্র্যান্ড ক্যানাল, যা বিশ্বের দীর্ঘতম মানবসৃষ্ট জলপথগুলোর একটি এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষি, পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আবার ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে পানি সংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় খাল পুনঃখননের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন, শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানি সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদের বিকাশ এবং জলজ বাস্তুতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, খাল খননের সফলতা নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। সব মিলিয়ে দিনাজপুরের সাহাপাড়া খাল থেকে শুরু হওয়া নতুন কর্মসূচি যদি পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে দর্শন থেকে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, কৃষিকে টেকসই করা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, বর্তমান উদ্যোগ সেই দর্শনেরই নবায়িত প্রতিফলন। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, প্রয়োজনীয় এবং দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি দিক নির্দেশনা।

লেখক:  কামাল হোসাইন সৈকত
জাতীয় পরামর্শক
এটুআই, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...