ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: নভেম্বর ৯, ২০২৫ ২:৩৭ পিএম

ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই আর্থিক লেনদেনের সুবিধা—এ যেন এক নতুন আর্থিক বিপ্লব। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে এসেছে নতুন ধরনের ঝুঁকিও—আর্থিক প্রতারণা বা ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রতারক চক্র নানা কৌশলে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। ফোন কল, এসএমএস, ই-মেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ব্যাংক কর্মকর্তা বা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি পরিচয়ে যোগাযোগ করে তারা গ্রাহকের কাছ থেকে ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা কার্ড তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। একবার এই তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে প্রতারকরা মুহূর্তেই একাউন্ট থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়।

ডিজিটাল প্রতারণা নানা রূপে ঘটতে পারে। নিচে কিছু প্রচলিত ধরন উল্লেখ করা হলো—

ফিশিং (Phishing): ফিশিং হলো এক ধরনের সাইবার প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা ভুয়া ইমেইল, এসএমএস, ফোন কল বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য, যেমন—ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ড তথ্য ইত্যাদি সংগ্রহ করে। সাধারণত এই ধরনের বার্তাগুলো দেখতে একদম আসল ব্যাংক, কোম্পানি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো হয়, যাতে ব্যবহারকারী বিশ্বাস করে নিজের তথ্য প্রদান করে ফেলে। এইভাবে প্রতারকরা ভুক্তভোগীর অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে অর্থ চুরি করতে পারে। ফিশিং থেকে বাঁচতে অজানা লিংক বা ইমেইলে ক্লিক না করা, সন্দেহজনক ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়া এবং সবসময় অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত।

ভিশিং (Vishing): ভিশিং হলো এক ধরনের ফোনভিত্তিক প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা ফোন কল বা ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে নিজেকে ব্যাংকের কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী বা কোনো বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে গ্রাহকের গোপন তথ্য যেমন—ওটিপি, পিন, অ্যাকাউন্ট নম্বর বা কার্ড তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। সাধারণত তারা জরুরি বা ভয়ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে, যেমন “আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে” বা “অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে”—এই ধরনের কথাবার্তা বলে গ্রাহককে বিভ্রান্ত করে। ভিশিং থেকে রক্ষা পেতে কোনো অচেনা নম্বর থেকে প্রাপ্ত ফোনে ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য না দেওয়া এবং সন্দেহ হলে ব্যাংকের অফিসিয়াল হেল্পলাইন নম্বরে সরাসরি যোগাযোগ করা উচিত।

স্মিশিং (Smishing): স্মিশিং হলো এক ধরনের প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা এসএমএস বা মেসেজের মাধ্যমে ভুয়া লিংক পাঠিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। সাধারণত এই মেসেজগুলো ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো হয়, যেমন—“আপনার অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়েছে, নিচের লিংকে ক্লিক করে যাচাই করুন” ইত্যাদি। গ্রাহক সেই লিংকে ক্লিক করলে তার ফোনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ইনস্টল হতে পারে বা সে ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নিজের গোপন তথ্য দিয়ে ফেলে। স্মিশিং থেকে বাঁচতে অচেনা বা সন্দেহজনক লিংকে কখনো ক্লিক না করা, এমন মেসেজ উপেক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগ করা উচিত।

কিউশিং (Qshing): কিউশিং হলো এক ধরনের প্রতারণা যেখানে ভুয়া QR কোড স্ক্যান করিয়ে গ্রাহকের ফোনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার (ম্যালওয়্যার) ইনস্টল করা হয়, যা ব্যাংকিং তথ্য, লগইন, ওটিপি বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে। সাধারণত প্রতারকরা দোকান, পোস্টার বা অনলাইনে ভুয়া QR কোড বসায়, যা স্ক্যান করলে ব্যবহারকারীকে একটি ম্যালিশিয়াস ওয়েবসাইট বা ভুয়া অ্যাপে নিয়ে যায়। ব্যবহারকারী অজান্তেই অ্যাপটি ইনস্টল করলে সেটি ফোনে অনুমতি নিয়ে ব্যাংক অ্যাপের ওপর ভুয়া লগইন উইন্ডো দেখিয়ে তথ্য চুরি করে বা ওটিপি পড়ে নেয়। এই ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে অপরিচিত QR কোড স্ক্যান না করা, স্ক্যানের পর লিংক যাচাই করা, শুধুমাত্র অফিসিয়াল Play Store বা App Store থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা, অপ্রয়োজনীয় পারমিশন না দেওয়া, ব্যাংকিং অ্যাপ ও ফোন আপডেট রাখা, এবং সন্দেহজনক কিছু ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের হটলাইনে যোগাযোগ করা উচিত।

সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্যাম: সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্যাম হলো এক ধরনের অনলাইন প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের কাছ থেকে টাকা বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয়। তারা ভুয়া প্রোফাইল খুলে নিজেকে ব্যাংক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, পুরস্কার বিজয়ী বা বিদেশে থাকা বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেয় এবং বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে। এরপর তারা টাকা পাঠাতে, লিংকে ক্লিক করতে বা তথ্য দিতে বলে, যার মাধ্যমে প্রতারণা সংঘটিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্যাম থেকে রক্ষা পেতে অচেনা প্রোফাইলের সঙ্গে যোগাযোগ না করা, কোনো লিংক বা অফারে সহজে বিশ্বাস না করা এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ রিপোর্ট বা ব্লক করা উচিত।

ডিজিটাল প্রতারণা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি মানুষের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবোধেও আঘাত হানে। তাই ব্যাংক গ্রাহকের উচিত নিজের তথ্যের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করা।

কিছু জরুরি সতর্কতা:

১. কোনো অবস্থাতেই ব্যাংক কখনো ফোন, এসএমএস বা ই-মেইলে ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড জানতে চায় না। কেউ এই তথ্য চাইলে বুঝে নিন এটি প্রতারণা।
২. অজানা লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন।
৩. সন্দেহজনক লেনদেন বা ফোনকল পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করুন এবং নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন।
৪. সর্বদা ব্যাংকের অফিসিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন।
৫. একাউন্টের ব্যালেন্স ও ট্রানজাকশন নিয়মিত যাচাই করুন।
৬. পাসওয়ার্ড কিছুদিন পর পর পরিবর্তন করুন, কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না।
৭. সন্দেহজনক বার্তা পেলে যাচাই না করে কোনো পদক্ষেপ নেবেন না।

ডিজিটাল ব্যাংকিং আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তবে অসচেতনতা এটিকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। মনে রাখবেন—সচেতনতা হলো নিরাপত্তার প্রথম ধাপ।

নিজে সচেতন থাকুন, পরিবার ও সমাজকেও সচেতন করুন। কারণ নিরাপদ ব্যাংকিং মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘোষণায় সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক পাচ্ছে বাংলাদেশ

নতুন শুল্কনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে ...

বাজেটের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করছে সফল বাস্তবানের ওপর: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, গত দেড়-দুই মাসের পরিশ্রমে প্রণীত সাম্প্রতিক বাজেটটি দেশের সর্বস্তরের ...

অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ৪৭ লাখ

২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রেকর্ড প্রায় ৪৭ লাখ করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। ...

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এআইর ব্যবহার সম্ভাবনাময়

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ব্লকচেইনের ব্যবহার সম্ভাবনাময় বলে জানিয়েছেন আলোচকরা। শনিবার (১৯ জুলাই) ...

এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ ও ক্রয়ব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে টিসিবি

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)ভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ এবং সরকারি ...