ড. মো. আবু হাসান:
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২৬ ৭:২৯ এএম

শেকড়ের সন্ধানে: বাংলাদেশ ও কৃষি একে অপরের অবিচ্ছেদ্য পরিপূরক। হাজার বছর ধরে এ দেশের মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষিই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে এসেছে; জাতীয় সংগীত থেকে নবান্ন, সবখানেই কৃষির জয়গান। স্বাধীনতার উষালগ্নে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, যা কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে আজ কমে ১১ শতাংশের কোঠায় নেমে এলেও গ্রামীণ কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষির গুরুত্ব আজও অপরিসীম। কৃষিতে প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত মানুষের অংশ কমে প্রায় ৩৫ শতাংশে নেমে এলেও, কৃষি–উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন, পরিবহন ও অন্যান্য সহায়ক কর্মকাণ্ডসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষিনির্ভর জীবিকার অংশ এখনো মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, কর্মসংস্থানের দৃষ্টিতে কৃষিই এখনো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ভিত্তি।

একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ এক বিস্ময়কর সাফল্যের গল্পও রচনা করেছে। এফএও–ভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে ধান উৎপাদনে বিশ্বে ৩য়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে ২য়, ইলিশে ১ম, পাটে ২য় এবং কাঁঠাল ও ছাগলের দুধে প্রায় ২য় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া আলু, সবজি, উষ্ণমণ্ডলীয় ফল, ডাল, পেঁয়াজ ও চা–সহ ২০–এর বেশি কৃষিপণ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশ উৎপাদক দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। এই সাফল্য কৃষক, কৃষি বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সম্মিলিত উদ্ভাবনশীলতার প্রতিফলন। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে জমির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির অবক্ষয়, দক্ষতার ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার মতো গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ জমে উঠেছে, যা টেকসই কৃষি ও শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এখন জরুরি প্রশ্ন হলো, এই সাফল্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা জমি–সংকট, দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষিত বেকারত্ব ও জলবায়ু ঝুঁকিকে আমরা কীভাবে একীভূতভাবে বুঝব এবং সমাধানের নতুন পথ কল্পনা করব। তাই এই নিবন্ধে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বাংলাদেশ প্যারাডক্স থেকে শুরু করে অলিগার্কিক পক্ষাঘাত, মানবপুঁজির অপচয় এবং এআই–নির্ভর স্মার্ট কৃষিকে সম্ভাব্য সবুজ সিঁড়ি হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ প্যারাডক্স ও এইচআরডি ব্ল্যাক বক্স
বাংলাদেশ আজ এক দ্বিমুখী বৈপরীত্যের মুখোমুখি, যেখানে সামষ্টিক পর্যায়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের বাস্তব জীবনে সীমিত সুযোগ একসঙ্গে সহাবস্থান করছে। গত এক দশকে অর্থনীতি যেখানে বার্ষিক গড়ে ৬–৭ শতাংশ হারে বেড়েছে, সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি আটকে আছে বছরে আনুমানিক ২ শতাংশের আশেপাশে। কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা শুন্য দশকের প্রায় ১.০ থেকে নেমে এসে ০.১–এ আশেপাশে স্থির রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা একে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হিসেবে বর্ণনা করছেন। ২০১৩–২০২৩ সময়কালে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বার্ষিক ১০ শতাংশের বেশি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও আনুমানিক ১০ লক্ষের বেশি কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি তিন গুণ বাড়লেও কর্মসংস্থান প্রায় ৪ মিলিয়নে স্থির হয়ে আছে; যা অকাল–শিল্পবিমুখতা ও শ্রম–মিতব্যয়ী প্রযুক্তি বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

এই প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারের সম্পর্ক বোঝার জন্য এইচআরডি ব্ল্যাক বক্স ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত সরকারি ও বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান পারিবারিক ব্যয় ও সময় এই মানবসম্পদ উন্নয়নে ঢুকলেও আউটপুট হিসেবে পর্যাপ্ত দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি বের হচ্ছে না; এই অদৃশ্য পরতই ব্ল্যাক বক্স। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো সমগ্র উচ্চশিক্ষার প্রায় তিন–চতুর্থাংশ বহন করলেও, তাদের স্নাতকদের বেকারত্বের হার অতীতে ৬০ শতাংশের ওপরে ছিল এবং সাম্প্রতিক বছরেও তা জাতীয় গড়ের বহু গুণ বেশি। শিক্ষাব্যবস্থা যখন দক্ষতা তৈরির উৎস না হয়ে সনদ–উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়, তখন মাইক্রো স্তরে শিক্ষিত বেকারত্ব, হতাশা, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতা; সবই একই সমীকরণে বাঁধা পড়ে।

প্রকিউরমেন্টের অস্বচ্ছতা, কাঠামোগত ফাঁদ ও সময়ের অপচয়
এই ব্ল্যাক বক্স কেবল পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষাব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়; শাসন ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত রয়েছে প্রকিউরমেন্ট–অস্বচ্ছতা, রেন্ট–সিকিং ও তথ্যের অসমতা। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের অনেক স্মার্ট–ফার্ম, আধুনিকায়ন বা প্রশিক্ষণ প্রকল্পে যন্ত্রপাতি ক্রয়, অবকাঠামো নির্মাণ, সফটওয়্যার–সার্ভিস ইত্যাদিতে অস্বচ্ছ টেন্ডার ও বাড়তি মূল্য দেখিয়ে লুটপাটের সংস্কৃতি এমন এক অনৈতিক ও কাঠামোগত ফাঁদ তৈরি করেছে, যেখানে প্রকৃত দক্ষতা ও উদ্ভাবনের চেয়ে ঠিকাদারি–নির্ভর লাভ বেশি অগ্রাধিকার পায়। ফলে দেশে বিপুল মানবসম্পদ ও মেধা থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও নীতিগত অস্পষ্টতায় তারা আটকে যায়। ছোটখাটো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বা প্রকল্পভিত্তিক ওয়ার্কশপগুলো তাই দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা–রূপান্তর আনতে ব্যর্থ হয়, কারণ এগুলো একই অস্বচ্ছ শাসন কাঠামোর ভেতরে ঘুরপাক খায়।

এই কাঠামোগত ফাঁদের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেও তৈরি হচ্ছে এক ধরনের নীরব প্রতারণা। শিক্ষার্থীরা এক ভয়াবহ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে আছে এবং প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ‘অতিমূল্যায়ন’ তাদের মধ্যে এক ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। যার নিষ্ঠুর ভাঙন ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়; বিপুল অংশ সেখানে ন্যূনতম পাস নম্বরও অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে আগ্রহ-বেমানান বিষয়ে ভর্তি হয়ে শুরু থেকেই নিজের ডিগ্রিকে অর্থ, সময় ও মানসিক শ্রমের অপচয় বলে মনে করতে থাকে। অভিভাবকেরাও সমাজপ্রসূত উচ্চাশার চাপে সন্তানের প্রকৃত আগ্রহ উপেক্ষা করে সন্তানদের গতানুগতিক উচ্চশিক্ষার পথে ঠেলে দেন, যার শেষে অনেক ক্ষেত্রে নেই উপযুক্ত কর্মসংস্থান, নেই জীবনদক্ষতা।
ফলে তরুণরা বছরের পর বছর সরকারি চাকরি বা সীমিত কিছু মর্যাদাকাঙ্ক্ষিত পদের পেছনে সময় ব্যয় করে জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল বয়সে বিকল্প পথ, টেকনিক্যাল স্কিল বা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ হারায়। উচ্চশিক্ষিত এক বড় অংশের এই দীর্ঘমেয়াদি অপেক্ষা ও সুযোগ হারানোর অবস্থাকেই এখানে ‘টেম্পোরাল প্যারালাইসিস’ বা সময়ের পক্ষাঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এখানে মানুষ ব্যস্ত থাকলেও বাস্তব মানবপুঁজি গঠনের প্রক্রিয়া থেমে থাকে এবং দীর্ঘস্থায়ী সময়–অপচয় ও দক্ষতা–অব্যবহারের ফলে পদ্ধতিগত মানবপুঁজির অপচয় আরও ত্বরান্বিত হয়। অথচ, এই শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক অবস্থান হওয়া উচিত ছিল সরাসরি উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভেতরে, বিশেষ করে স্মার্ট কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। কিন্তু প্রকিউরমেন্টের অস্বচ্ছতা ও অতিরঞ্জিত হিসাব শিক্ষার্থী ও পরিবারকে এই ধারণায় আচ্ছন্ন করে রাখে যে স্মার্ট কৃষিতে নামতে গেলে বিপুল পুঁজি দরকার, ফলে তারা শুরুতেই পিছিয়ে যায়। অথচ, বিদ্যমান উৎপাদন উপকরণের ন্যায্য মূল্য পরিশোধ করে শিক্ষার্থী, পরিবার ও এনজিও–সমন্বিত সামাজিক স্মার্ট কৃষি মডেল কার্যকর করা গেলে জমি, শ্রম, পুঁজি ও প্রযুক্তি; সব উপকরণেরই উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব।

অলিগার্কিক পক্ষাঘাত, মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও উন্নয়নগত নৈরাশ্য
বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের বর্তমান সংকট তাই কেবল চাকরির সংখ্যাগত স্বল্পতার সংকট নয়; এটি এক গভীর রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক পক্ষাঘাতের ফল। ‘অলিগার্কিক প্যারালাইসিস’ বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে নীতি–নির্ধারণ, তথ্যপ্রবাহ, সুযোগ ও রিসোর্স–অ্যাক্সেস অল্পসংখ্যক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে এবং তারা নিজেদের স্বার্থে সুযোগের চ্যানেলগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে সংকুচিত ও অস্বচ্ছ রাখে। এর ফলে সাধারণ বা নিম্ন–মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণরা ‘চ্যানেল ক্যাপচার’-এর শিকার হয় এবং শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদার তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়।
ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা এই কাঠামোর কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যখন তা তরুণদের ডিজিটাল লিটারেসি, সমস্যা সমাধান বা কারিগরি জ্ঞান না শিখিয়ে কেবল তাত্ত্বিক ডিগ্রি ও পরীক্ষামুখী সনদের পেছনে দৌড়াতে বাধ্য করে। উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও যখন তারা দেখেন শ্রমবাজারে এ ডিগ্রির সঙ্গতিপূর্ণ জায়গা কম, তখন অধিকাংশই ‘ওয়েটিং মোড’–এ চলে যায়। ধীরে ধীরে এই বঞ্চনা ও বাধার সমন্বয়ে তরুণদের মধ্যে জন্ম নেয় এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যাকে এখানে ‘স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য’ বলা হয়েছে। এটি এমন এক স্থায়ী বিশ্বাস যে, শুধু মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এই ব্যবস্থায় এগোনো সম্ভব নয়; প্রয়োজন কেবল নেটওয়ার্ক বা অনৈতিক লেনদেন। এই নৈরাশ্যই সম্ভবত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টারের দিকে ঠেলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড: লভ্যাংশ, না বোঝা?
বাংলাদেশ ২০০৭ সালে জনমিতিগত লভ্যাংশে প্রবেশ করেছে, যা ২০৩৯ সাল পর্যন্ত চলার কথা। কিন্তু কর্মক্ষম তরুণদের অলস বসিয়ে রেখে এই ‘লভ্যাংশ’ এখন ‘বোঝা’ বা অভিশাপে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশে গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১১–১২ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের তিনগুণ। একজন নতুন স্নাতকের চাকরি পেতে গড়ে প্রায় ২.৫ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘায়িত বেকারত্ব গভীর মানসিক ও পারিবারিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বেকার স্নাতকদের ৪৯–৮১ শতাংশ বিষণ্নতা ও ৫৩–৬১ শতাংশ উদ্বেগে ভোগেন। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও ২০২৪ সালের কোটা–সংস্কার আন্দোলনের পেছনেও এই পুঞ্জীভূত অসন্তোষের ছাপ স্পষ্ট। যুব জনসংখ্যা যদি কেবল পরিসংখ্যানগত লভ্যাংশ হয়ে থাকে কিন্তু তাদের কাজের সুযোগ না থাকে, তবে এই ‘যুব স্ফীতি’ বুমেরাং হয়ে ওঠার ঝুঁকি খুবই বাস্তব।

জমি, খামার ও উৎপাদনক্ষমতার সংকট
অর্থনীতির এই রাজনৈতিক–মানবিক সমীকরণের পাশাপাশি কৃষির ভৌত ভিত্তিতেও চলছে নীরব সংকট। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে নগরায়ন ও শিল্পায়ন কৃষিজমিতে আঘাত হানছে। ১৯৬১ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ০.১৬৬ হেক্টর; ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.০৪৮ হেক্টরে; অর্থাৎ গত কয়েক দশকে মাথাপিছু আবাদি জমি প্রায় ৭১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মালিকানা বিভাজনের সংকট। তবে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বড় খামারগুলো এখন ছোট খামারকে অতিক্রম করছে। টিকে থাকতে হলে ছোট কৃষকদের সামনে সমবায় বা ব্লক–ফার্মিং–কেন্দ্রিক কাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। কেবল জমির পরিমাণ নয়, ব্যবহার দক্ষতাও এখানে বড় প্রশ্ন। ধান–গমসহ প্রধান শস্যে বাংলাদেশের কৃষকরা এখনো তাদের পূর্ণ উৎপাদন–সম্ভাবনার অনেক নিচে অবস্থান করছেন; বোরো ধানে টেকনিক্যাল এফিসিয়েন্সি ৭০–৯০ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। আধুনিক ধান চাষিদের গড় মুনাফা দক্ষতা মাত্র ০.৭৭। অর্থাৎ, জমির স্বল্পতার চেয়ে জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিই এখন বড় সংকট।

মাটির কান্না, পানির হাহাকার ও জলবায়ু ঝুঁকি
ক্ষুদ্র কৃষকের বাস্তবতায় ‘বেশি সার–বেশি ফলন’–ধারণা এখনো গভীরভাবে প্রোথিত। মাটি পরীক্ষা ছাড়া অতি মাত্রায় ইউরিয়া ও ফসফেট প্রয়োগের ফলে মাটির জৈব পদার্থ কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফলন স্থবির হয়ে পড়ছে। সিজিআইএআর-এর তথ্য অনুযায়ী, এক ফসলি জমিতে ক্রমাগত চাষে মাটির পুষ্টি–চক্র ভেঙে যাচ্ছে। একইসাথে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল সেচব্যবস্থা টেকসই কৃষির আরেক বড় বাধা। সেচের ৮০ শতাংশই টিউবওয়েল–নির্ভর হওয়ায় পানিস্তর নিচে নামছে এবং উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের ঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এই সব সংকটের ওপর এক ধরনের ‘অ্যাক্সিলারেটর’ হিসেবে কাজ করছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ শতাংশ জমি লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অভিযোজন না বাড়ালে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রধান ফসলের ফলন ১০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমার আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রম সংকট, দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর অবদান
অভিবাসন ও পেশা পরিবর্তনের ফলে কৃষিতে শ্রম-ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অথচ, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, কৃষিক্ষেত্রে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচনে অকৃষি খাতের তুলনায় গড়ে ৩.১ গুণ বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, কৃষিশ্রমিকের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা আজও প্রান্তিক। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের পুরুষদের সমপর্যায়ের সুযোগ, ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিলে কৃষিজ উৎপাদন ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব; যা জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও লিঙ্গসমতা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সমাধানের রূপরেখা: গ্রিন এআইগ্রোনমিক্স ও নিউরাল ল্যাডার মডেল
এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় গতানুগতিক সমাধানের বদলে প্রয়োজন আমার প্রস্তাবিত গ্রিন এআইগ্রোনমিক্স ও নিউরাল ল্যাডার মডেলের মতো সমন্বিত ফ্রেমওয়ার্ক। নিউরাল ল্যাডার মডেল মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অটোমেশন টুল হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত-সহকারী হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব করে। এর চারটি স্তম্ভ: (১) সময়ই চূড়ান্ত সম্পদ—সময়ের অপচয় রোধই উন্নতির চাবিকাঠি; (২) নিখুঁত জ্ঞানের অভাব—তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রধান বাধা; (৩) এআই কারেক্টিভ সিগন্যাল—সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য দিয়ে অনুমানের ব্যয় কমায়; এবং (৪) বটম-আপ ইন্টেলিজেন্স—তৃণমূল থেকে তথ্যের স্বচ্ছ প্রবাহ নিশ্চিত করে উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করে।

গ্রিন এআইগ্রোনমিক্স কৃষিকে একটি ডেটা-নির্ভর ও মানবপুঁজি-কেন্দ্রিক পেশায় রূপান্তর করতে চায়। এআই-এর সহায়তায় কৃষিকে ঝুঁকিপূর্ণ পেশার বদলে স্মার্ট ও ডেটা-ড্রিভেন ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। নিউরাল ল্যাডার মডেল তরুণদের সময় ও তথ্যের ফাঁদ থেকে মুক্ত করে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সিঁড়ি তৈরি করে। জমির সংকট কাটাতে ‘সামাজিক কৃষি’ একটি কার্যকর সমাধান। শহরের হাজার হাজার একর অব্যবহৃত ছাদ এবং গ্রামের পারিবারিক অব্যবহৃত ও কম লাভজনক জমিকে আধুনিক কৃষির ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর করা যায়। শিক্ষিত তরুণরা সেখানে হাইড্রোপনিক বা পলিনেট পদ্ধতিতে উচ্চমূল্যের ফসল ফলাবে; যা কৃষিকে ‘স্মার্ট প্রফেশন’ বা এগ্রিপ্রেনিউরশিপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। একইসাথে, গ্রিন এআইগ্রোনমিক্স ও নিউরাল ল্যাডার মডেল মিলে একটি ‘জলবায়ু-মানবপুঁজি নেক্সাস’ তৈরি কররে। শিক্ষিত তরুণরা এআই-এর সহায়তায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে যুক্ত হলে একদিকে বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে কার্বন-ফুটপ্রিন্ট হ্রাস ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে; যা এসডিজি-৮ ও এসডিজি-১৩ অর্জনে সহায়ক হতে পারে।

প্রযুক্তি–প্রকৃতির সংলাপে নতুন বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আজ এক স্পষ্ট সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে; একদিকে জনসংখ্যা ও বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ কমছে। কৃষির সংকট মানেই এখানে নাগরিক সমাজের সংকট। এই নিবন্ধের আলোচনায় যে ‘নিউরো–পলিটিক্যাল ইকোনমি’–ভিত্তিক পাঠ উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট; সমস্যা তরুণ প্রজন্মের ‘অক্ষমতায়’ নয়; সমস্যা মূলত নিখুঁত জ্ঞানের অভাব, তথ্য–বঞ্চনা, সময়–অপচয় ও কাঠামোগত অস্বচ্ছতায়। প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে এই অচলাবস্থা ভাঙা সম্ভব। এআই–সহায়ক ব্যবস্থা ও গ্রিন এআইগ্রোনমিক্স কৃষিকে কেবল বাঁচিয়ে রাখবে না, বরং উচ্চ–দক্ষতা–নির্ভর নতুন অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবপুঁজি–কেন্দ্রিক কৃষির বাংলাদেশ; যেখানে জমি, পানি ও সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ দেশের ভিত্তি রচিত হবে। সময় এখন পরিবর্তনের; সময় এখন বিজ্ঞানসম্মত ও ন্যায্য কৃষির পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার।

মতামত লেখকের নিজস্ব

লেখক:ড. মো. আবু হাসান, সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: hhafij@yahoo.com

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...