মো. ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৬ ৫:০১ পিএম
  • জুন শেষে ডিএসইর টিভিআর বেড়ে ৪৫.৫৭%
  • ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ৮৬.৭৬%
  • এক বছরে ডিএসইর লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ
  • জুনে পিই রেশিও বেড়ে ৯.২৬

দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ার লেনদেনের গতি গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বাজারের তারল্য পরিমাপের অন্যতম সূচক টার্নওভার ভেলোসিটি রেশিও (টিভিআর) এক বছরের ব্যবধানে প্রায় চার গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে যেখানে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ, চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৫৭ শতাংশে। অর্থাৎ বাজার মূলধনের তুলনায় শেয়ার লেনদেনের গতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যানালাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে টার্নওভার ভেলোসিটি রেশিও (টিভিআর) ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি, বরং কয়েক দফা ওঠানামার পর চলতি বছরের জুনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। ২০২৫ সালের জুনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) টার্নওভার ভেলোসিটি রেশিও (টিভিআর) ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। জুলাইয়ে তা বেড়ে ২৬ শতাংশে, আগস্টে ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশে ওঠে। এরপর বছরের শেষ দিকে এসে কমতে থাকে, ডিসেম্বরে যা কমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করে। যা জানুয়ারিতে ১৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ২২ দশমিক ৫৪ শতাংশ হয়। মার্চে কিছুটা কমে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও এপ্রিলে বেড়ে ৩০ দশমিক ১২ শতাংশ এবং মে মাসে ২৪ দশমিক ৯১ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ জুনে এটি বেড়ে ৪৫ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ বাজারে শেয়ার লেনদেনের গতি বেড়েছে এবং বাজারের তারল্য তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, কিছু খাতে শেয়ারের লেনদেন বৃদ্ধি এবং বাজারে আস্থার উন্নতির কারণে এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তবে শুধু টার্নওভার ভেলোসিটি রেশিও (টিভিআর) বাড়লেই বাজারের মৌলভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে- এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। লেনদেনের গুণগত মান এবং কোন ধরনের শেয়ারে এই লেনদেন হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বলছে, টিভিআর- এর এই পরিবর্তনের সঙ্গে জুনের লেনদেনের বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) জুনে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের মোট লেনদেনের মূল্য হয়েছে ২৬ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। যা আগের মাসে এই লেনদেন ছিল ১৪ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৮৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

একইভাবে, ২০২৫ সালের জুনে বাজারটিতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের জুনে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জুনে লেনদেন বৃদ্ধির পেছনে বাজারে অংশগ্রহণ বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারটিতে শুধু লেনদেন নয়, বাজারের প্রধান সূচকেরও উত্থান হয়েছে। জুন মাস শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৬২ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে। যা আগের মাসের তুলনায় এটি ৮ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। যা আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে টিভিআর বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাজারে ট্রেডিং কার্যক্রম বৃদ্ধি, তারল্যের উন্নতি এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার কথা উল্লেখ করেছে।

খাতভিত্তিক লেনদেনে আগের মাসের মতো এ মাসেও শীর্ষ অবস্থানে ছিল বীমা খাত। অর্থাৎ ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। এরপর ছিল প্রকৌশল খাত ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ, ওষুধ ও রসায়ন ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ, বস্ত্র ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং ব্যাংক ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ।

অন্যদিকে, জুন শেষে ডিএসইর মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও বেড়ে ৯ দশমিক ২৬ হয়েছে, যা মে মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭২। তবে ২০২৫ সালের জুনে এ অনুপাত ছিল ৯ দশমিক ৩৪। একই সময়ে বাজারের গড় ইয়িল্ড মে মাসের ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিই রেশিও বাড়া এবং ইয়িল্ড কমার পেছনে শেয়ারদর বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা উন্নত হওয়ার প্রতিফলন রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ মো. মাজেদুল হক বলেন, পুঁজিবাজারের বিকাশ অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, সুশাসন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমাসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন অংশে। একটি গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আমরা এর কিছুটা প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি।

তার মতে, এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। সরকার যদি সংস্কারের পথে এগিয়ে আসে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা ও ইতিবাচক বার্তা তৈরি করবে। আর সংস্কার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে পুঁজিবাজারেও এর সুফল পাওয়া যাবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটের কারণে যারা পুঁজিবাজার থেকে দূরে ছিলেন, তারাও ধীরে ধীরে বাজারে ফিরে আসবে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বিদেশি ব্যাংকের কাস্টডিয়ান কার্যক্রমে জটিলতা দূর করল বিএসইসি

বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর বাংলাদেশে স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনা পর্ষদ না থাকলেও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের কাস্টডিয়ান হিসেবে কার্যক্রম ...

ডিএসইর এজিএম নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ, থানায় জিডি

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এজিএম নাসির উদ্দিন রেজার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ...

ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ট্রেডিং ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে বিএসইসি

দেশের বড় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে লেনদেন, স্বার্থের সংঘাত, আর্থিক ...

জীবনবীমা ছাড়া সব খাতে প্রযোজ্য, বাদ পড়ল পিবি রেশিও মার্জিন ঋণে নতুন নিয়ম, শেয়ারের সর্বোচ্চ পিই ৪০

মার্জিন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশোধিত ...

জিএসপি ইনভেস্টমেন্টের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের নির্দেশ বিএসইসির

পুঁজিবাজার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর স্বার্থে মার্চেন্ট ব্যাংক জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে ...

জিবিবি পাওয়ারের শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি, ডিএসইর সতর্কবার্তা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জিবিবি পাওয়ার লিমিটেডের শেয়ারদরের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নজরদারিতে এসেছে। এ ...