জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২৬ ১০:০৪ এএম

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি ও ধীতপুর গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অসহায় একাধিক নারী ও শিশু যাওয়ার জায়গা না পেয়ে ভাঙন এলাকায় মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘেরা জরাজীর্ণ ভাঙা ঘরে বসবাস করছেন এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এসব গ্রামের ভাঙন এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে এলাকাবাসী বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেলে কুরসি বাজার এলাকায় ভাঙনের পাড়ে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।

বিক্ষোভ শেষে ভাঙন রোধে বস্তা ডাম্পিংয়ের দাবি জানিয়ে বক্তব্য দেন জিন্নাহ মন্ডল, আব্দুল মালেক, আব্দুস সামাদ, ফিটার সরদার, লষ্কর আলী, আব্দুল মান্নান, মহির উদ্দিন ও নীল চান প্রামাণিকসহ স্থানীয়রা।

তিন মাসে বিলীন শত শত বাড়িঘর ও জমি

বক্তারা বলেন, এ বছর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি, বারপাখিয়া, গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও হাতকোড়া গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়ে এখনও তা অব্যাহত আছে। এই ভয়াবহ ভাঙনে গত তিন মাসে শত শত বাড়িঘরের পাশাপাশি কৃষকদের শত শত বিঘা আবাদি জমি চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেছে।

বাড়িঘর ও আবাদি জমি হারিয়ে কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। চোখের সামনে সবকিছু যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেলেও চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিল না। ভাঙনের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, কেউ বাড়িঘর ও আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সময় পাচ্ছেন না।

তারা সরকারের কাছে অবিলম্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ভাঙন এলাকায় বালুর বস্তা ডাম্পিং করে ভাঙন রোধের জোর দাবি জানান।

বিক্ষোভকারীরা জানান, গত দুই সপ্তাহে শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি ও ধীতপুর গ্রামের দুই শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় অনেক মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তারা ভাঙনকবলিত এলাকায় পলিথিনের ছাউনিতে অথবা মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘেরা জরাজীর্ণ ভাঙা ঘরে বসবাস করছেন ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

হাট-বাজার বিলীন, বিদ্যুৎহীন ভাঙনকবলিত এলাকা

ধীতপুর-কুরসি গরুর হাট-বাজার যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং গরু-ছাগল বেচাকেনায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলে এখানকার কৃষকেরা চরম অর্থকষ্টে ভুগছেন।

ভাঙনকবলিত বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় কৃষকেরা অন্ধকারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গরু চুরি ঠেকাতে তারা গরুর পাশে চৌকি পেতে শুয়ে থেকে গরু পাহারা দিচ্ছেন। বিদ্যুতের অভাবে এ এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় চরম বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। গরমে গরু-বাছুরের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।

এই ভাঙনের তাণ্ডবে এ পর্যন্ত দুটি মসজিদ-মাদ্রাসা, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি অফিসঘর, দুই শতাধিক বাড়িঘর, দুই হাজার বিঘা আবাদি জমি ও অসংখ্য গাছপালা যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

বিলীন হওয়া জমিতে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, সরিষা, বাদাম, তিল, কাউন, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষ করা হতো। এসব ফসল চাষ করে এ এলাকার শত শত কৃষক আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছিলেন। রাক্ষুসী যমুনায় তাদের জমিজমা সবকিছু বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জীর্ণ ঘরে আশ্রয়, খোলা আকাশের নিচে পরিবার

ধীতপুর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা আন্না খাতুন (রুমা) জানান, তার স্বামী তাকে ত্যাগ করার পর গত এক বছর ধরে তিনি এক শিশু কন্যাকে নিয়ে কৃষি দিনমজুর বাবা আব্দুল লতিফ ও মা রেহানা খাতুনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন।

গত চার-পাঁচ দিন আগে তার বাবার বাড়িটি যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ায় তাদের বসতঘরটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে শূন্য ভিটায় অপর একটি পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ ভাঙা ঘরে মা রেহানা খাতুন ও কোলের শিশুকন্যাকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।

ঘরটির এক পাশে বেড়া না থাকায় কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাছ ধরার ঝাঁকিজাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। অন্য পাশের পাটকাঠির বেড়া পচে খসে পড়ছে। ঘরের চাল নুইয়ে পড়েছে। তারপরও যাওয়ার কোনো জায়গা না পেয়ে তারা এই জীর্ণ ঘরের মধ্যে বসবাস করছেন ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত কয়েক দিনে তাদের কেউ খোঁজখবর নেয়নি। সরকারি এক কেজি চাল পেয়ে তা দিয়ে তাদের কোনো মতে জীবন চলছে।

ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও জিন্নাহ মন্ডল জানান, এ এলাকার ভাঙন রোধে দ্রুত বালুভর্তি জিওটিউব বস্তা ফেলা জরুরি। কিন্তু সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এ চরবাসীদের মূল্যায়ন না করায় এখানে বালুর বস্তা ফেলার উদ্যোগ নেয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম অবহেলায় তাদের গ্রামগুলো যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

তারা আরও বলেন, এখানকার ১০ থেকে ১২টি স্থানে বাঁশের ছটকা তৈরি করে বালুর বস্তা ডাম্পিং করা হলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে। তাই অবিলম্বে এখানে এ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছেন তারা।

জমি হারিয়ে পথে বসেছেন কৃষক

কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে তার আট বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমিতে তিনি ভুট্টা, ধান, সরিষা, বেগুন, টমেটোসহ নানা জাতের সবজি চাষ করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতেন। এখন তার সব শেষ হয়ে গেছে। সব হারিয়ে তিনি এখন পথে বসেছেন।

তিনি জানান, তার গোষ্ঠীর সবার মিলে প্রায় ৬০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে এসব জমিজমা হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এখন কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

ধীতপুর গ্রামের আছিয়া খাতুন জানান, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় শূন্য ভিটায় খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে আছেন। বৃষ্টি এলে সবকিছু ভিজে যায়। কোথায় যাবেন, তা এখনও ঠিক হয়নি। ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছেন তিনি।

এ গ্রামের শামছুল হক জানান, যমুনা নদীতে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় পাশের শ্রীপুর গ্রামে অন্যের জমিতে বছরে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। বছর শেষে এত টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন জানান, তিনি ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এছাড়া ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান জানান, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নটি যমুনা নদীর চরাঞ্চল এলাকা হওয়ায় সেখানে তাদের কোনো প্রকল্প নেই। ফলে সেখানে কোনো কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নতুন প্রকল্প পাওয়া গেলে সেখানে অবশ্যই কাজ করা হবে।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত