সাইদুর রহমান নোমান, নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২৫ ৫:০৮ পিএম , আপডেট: নভেম্বর ১৯, ২০২৫ ৫:০৮ পিএম
  • দেশে ই-কমার্স ও এফ-কর্মাস প্রতিষ্ঠান ৩ লাখের বেশি
  • নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৪৮৬টি।
  • ই-কমার্সের সম্ভাব বাজার ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা
  • যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ২৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে

বাংলাদেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স ভিত্তিক কেনা-কাটা বা সেবা গ্রহণ দিনদিন বাড়ছে। অনলাইন ভিত্তিক এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। এতে সহজে ঘরে বসে সেবা ফেলেও নীতিমালা যথাযথ বাস্তবায়ন না থাকায় গ্রাহকরাও বিভিন্নভাবে প্রতারিত হচ্ছে। তাই এই খাতে সম্ভাবনা যেমন তৈরি হয়েছে তেমনি ঝুঁকিও অনেক বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ ৯৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই কোন ধরনের নিবন্ধন। এসব অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরকার কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। কারণ এর ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। এতে সম্ভাবনাময় একটি খাত মানুষের বিশ্বাস হারাচ্ছে। এই খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভ্যাট হারাচ্ছে সরকার।

অর্থ শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, ই-কমার্স মোট প্রতিষ্ঠান আছে ১ লাখ ১৭ হাজার। বেসরকারি সংস্থার অনুযায়ী তথ্য অনুযায়ী, দেশে ই-কমার্স ও এফ-কর্মাস প্রতিষ্ঠান আছে ৩ লাখের বেশি। ডিজিটাল-কমার্স বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ডিবিআইডির নিবন্ধনভুক্ত আছে মাত্র ১৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান। বাকি অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরকার কোন রাজস্ব পাচ্ছে না।

সূত্রে জানা যায়, ডিজিটাল-কমার্স বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ডিবিআইডির নিবন্ধন করার ক্ষেত্রে অনেক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। লিংক-লগিং ছাড়া ডিবিআইডির নিবন্ধন নেয়া যায় না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ই-কমার্সের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার থেকে প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণ লুকাতে বিভিন্ন অসদুপায় অবলম্বন করে। প্রতিষ্ঠানগুলো ৮০ শতাংশের ওপরে লেনদেন ক্যাশ হ্যান্ডের মাধ্যমে করে। এই ক্ষেত্রে সরকার থেকে লেনদেন লুকানো সহজ হয়। এভাবে লেনদেন করা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয় না। এছাড়া অনলাইনের প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকে ভ্যাটফাঁকির উদ্দেশ্যে যে দেশগুলোতে এই খাতে ভ্যাট নেই, সেই দেশগুলো থেকে একাউন্ট খুলে বাংলাদেশে বিজনেস পরিচালনা করে। এতে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাটের আওতায় থাকে না। কারণ এই দেশেগুলোতে ভ্যাট ছাড়া বিজনেস করা যায়। গ্রাহকরা যাতে না বুঝতে পারে তাই তারা শুধু বাংলাদেশি একটা নাম্বার ব্যবহার করে।

ভ্যাট আইন অনুযায়ী , ই-কমার্স বার্ষিক টার্নওভার ৩০ লাখের কম হলে ভ্যাটের দায় নেই। ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টার্নওভার ট্যাক্স প্রযোজ্য। ৫০ লাখের উপরে লেনদেন হলে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে।

রিচার্স অ্যান্ড মার্কেট ডট কমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে অনলাইন ভিত্তিক বিজনেসের মার্কেটের আকার হবে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি যথাযথ ব্যবস্থা না নেন তাহলে ভবিষ্যৎতে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে।

ই-ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ৬-৭ লাখ অনলাইন ভিত্তিক ডেলিভারি হয়। প্রতি লেনদেনে গড়ে ১৪০০ টাকা লেনদেন হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে বৈধভাবে ই-কমার্স খাতে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে লেনদেন দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ১১২ কোটি টাকায়। তবে, অবৈধ লেনদেন হিসাব করলে তা ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এই হিসাবে রাজস্ব হারাচ্ছে সাত কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ই-কমার্স নীতিমালা ২০২১ অনুযায়ী, ই-কসার্সের মাধ্যমে গ্রাহকরা বারবার প্রতারিত হচ্ছিল। এটি বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ই-কমার্সের প্রতিষ্ঠানগুলো এসএসএলের মাধ্যমে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হয়। এসএসএলের সার্ভিস অনুযায়ী, গ্রাহকে দেয়া সেবার রশিদ এসএসএলে জমা দেয়ার পরে প্রতিষ্ঠান টাকা নিতে পারবে। অর্থাৎ এসএসএল হচ্ছে গ্রাহক ও ই-কমার্সের প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্থতাকারী। এই সিস্টেম গ্রাহককে অর্থের ও তথ্যের নিরাপত্তা দেয়। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ৪৮ ঘন্টায় নির্ধারিত সার্ভিস গ্রাহককে না দিতে পারলে সার্ভিস ফি বা পণ্য বিল নিতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ইসক্রো সার্ভিসের মাধ্যম মোটি ফির ১০০ শতাংশই অগ্রিম গ্রহণ করতে পারবে গ্রাহক।

ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী বলেন, এটা ঠিক যে ই-কমার্সের অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দেয়। এই খাতটি বাংলাদেশে উদীয়মান একটি খাত। এই খাতের ফাঁক ফোকরগুলো এখনও অনেক কর্মকর্তা জানেন না।

ভ্যাট সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ই-কর্মাসের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান অনিবন্ধিত। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকেতো আর কর আদায় সম্ভব হচ্ছে না। এদিক থেকে রাজস্ব পাচ্ছে না। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের বিষয়ে দেখেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে ভ্যাট আদায়ে দায়িত্ব এনবিআরের। ভ্যাট আদায়ের আইন অনুযায়ী আমরা অনলাইনবেস প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ভ্যাট আদায় করছি। ই-কর্মাস নিয়ে আলাদা কোন নীতিমালা নেই এবং আদায়ে কোন সিস্টেম উন্নত করা হয়নি।

পলিসি থিংক এন্ড ইকোনোমিক রিচার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, ই-কমার্স খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এ সেক্টর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। ই-কমার্স খাত ফরমাল ও ইনফরমাল—উভয়ভাবেই দ্রুত বড় হচ্ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ভ্যাট বা রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। সরকারের ফিসকাল স্পেস কমে গেছে, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে এ অবস্থায় ই-কমার্সকে সঠিকভাবে মনিটরিংয়ে আনা জরুরি। শুধু নিবন্ধন দিলেই হবে না; এনবিআরের শক্তিশালী তদারকি ও কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন। ব্যাংকের ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ই-কমার্স লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু সেখান থেকে সরকার ভ্যাট পাচ্ছে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। একদিকে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ নেন, অন্যদিকে রেগুলেটরি সংস্থার জনবল ও লজিস্টিক সক্ষমতাও সীমিত। ফলে তদারকির ঘাটতি রয়ে যায়। অথচ ই-কমার্সের ভলিউম যত বাড়বে, ততই এনবিআরের তদারকি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, যাতে রাজস্ব বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের ফিসকাল স্পেস শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম দারাজ,রকমারি,স্টারটেক,চাল ডাল,আজকের ডিল,বিক্রয়,ক্লিক বিডি,বাগডুম ইত্যাদি। সূত্রে জানা গেছে, ই-কমার্সের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট ফাঁকি সংক্রান্ত মামলা রয়েছে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ৪৭ লাখ

২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রেকর্ড প্রায় ৪৭ লাখ করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। ...

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এআইর ব্যবহার সম্ভাবনাময়

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ব্লকচেইনের ব্যবহার সম্ভাবনাময় বলে জানিয়েছেন আলোচকরা। শনিবার (১৯ জুলাই) ...

এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ ও ক্রয়ব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে টিসিবি

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)ভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ এবং সরকারি ...

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান সাড়ে ১৭ শতাংশ

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশের সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাসের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন ...