প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৫ ৪:০৯ পিএম

ব্যাংক খাতের মতো উচ্চ খেলাপি ঋণের ভারে খুড়িয়ে চলছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও (এনবিএফআই)। অনিয়ম আর নানা অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে বেশিরভাগ ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই। এসব প্রতিষ্ঠান যাচাই-বাছাই ছাড়াই নামে-বেনামে ঋণ দিয়েছে। কিন্তু এখন আর আদায় করতে পারছে না। ফলে এ খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। এমনকি তিন মাসের ব্যবধানে অর্থাৎ চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এতে করে মার্চ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিলো ৭৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। সে হিসেবে মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে খাতটিতে নতুন ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা।

আর ২০২৪ সালের মার্চ শেষে ঋণের পরিমাণ ছিলো ৭৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি বেড়েছে ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা।

একই সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।

গত ডিসেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিলো ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি বেড়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালের মার্চে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৩ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছেন প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি পি কে হালদার নামে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এখনো এ কেলেঙ্কারির সম্পূর্ণ টাকা উদ্ধার হয়নি এবং এর প্রভাব পড়েছে দেশের পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর। এই খাতের সমস্যা দূর করতে হলে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, আদায়ে আইনি কার্যক্রম ও নীতি জোরদার, পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো ব্যবসা করছে, তাদের ঋণ আদায়ও ভালো হচ্ছে। তবে এখনো ৩৫ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি—এটি কোনোভাবে ইতিবাচক নয়। তাই এই খাতও পুনর্গঠন করতে হবে। ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট ও প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) ফ্রেমওয়ার্ক শুধু ব্যাংকের জন্য নয়, এনবিএফআই খাতেও কার্যকর করতে হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে, এই কারণে ঋণ পরিশোধ কমে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ব্যাংকগুলোতে নানা ধরনের ঋণ রয়েছে, তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এত সুযোগ নেই। এ কারণেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্পেটের নিচে খেলাপি ঋণ খুঁজে বের করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিছু ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সূচক সাময়িক অবনতি হলেও ভালো পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সামনে ভালো করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের এখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম দেখাতে পারেনি। তারা নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আসতে পারেনি। শেয়ারবাজারেও তাদের অবদান নেই বললেই চলে। এ জন্যই একটা বড় ব্যাংকের বড় শাখা দেশের অর্থনীতিতে যে ধরনের অবদান রাখছে, পুরো খাত মিলেও সেই অবদান রাখতে পারছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে পিপলস লিজিং, বিআইএফসি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, সিভিসি ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি, হজ ফাইন্যান্স, ফনিক্স ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, বে লিজিং, উত্তরা ফাইন্যান্স এবং ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।

এদিকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর আগে তিন মাস আগে অর্থাৎ ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৪ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর লুকানো খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। অবলোপন, পুনঃতফসিল ও মামলার অন্তর্ভুক্ত ঋণ ধরলে খেলাপি আরও বাড়বে। আগের সরকারের আমলে অনেকে একটি কোম্পানি দেখিয়ে ঋণ নিয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে ঋণকে খেলাপি করতে দেননি। এজন্য এখন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এছাড়া অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন এসব প্রভাবশালী। দুর্বল ব্যাংকে ব্যাপক দুর্নীতিও হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকশনে যাওয়ার সময় চলছে। খেলাপিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে আরও কঠোর হতে হবে।

এম জি

শেয়ার

পাঠকের মতামত

এফবিসিসিআই’র রিপোর্ট গত বছরের তুলনায় এবার খাদ্যপণ্যের দামে বাড়তি চাপ

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি আর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে টালমাটাল দেশের নিত্যপণ্যের বাজার। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার রেশ ধরে ...

আইপিও তহবিলে অনিয়ম একমি পেস্টিসাইডসের, ব্যবসায় লোকসান হলেও লাগামহীন শেয়ারদর

আইপিও তহবিলের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, প্রসপেক্টাসে ঘোষিত সমসূচি না মানা, তহবিল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা ...

বিএসইসির নির্দেশনা উপেক্ষিত অদাবিকৃত লভ্যাংশ নিয়ে কোম্পানিগুলোর গড়িমসি

অদাবিকৃত লভ্যাংশ বিতরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্দেশনা মানছে না পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলো অদাবিকৃত লভ্যাংশ ...