ড. মো. আবু হাসান:
প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০২৬ ৮:২১ পিএম

১৪৩৩ বঙ্গাব্দের নববর্ষের আমেজ ও ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদের আনন্দের মাঝেই বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পশুর হাটের ব্যস্ততা, অন্যদিকে সংসদে সংস্কারের বিতর্ক। এর মধ্যেই আসছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ‘অগ্নিপরীক্ষার’ বাজেট, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই দলিল বলে দেবে আমরা কি কেবল বণ্টনমুখী রাষ্ট্র হব, নাকি স্বনির্ভর শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াব। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল সরকার বদল নয়; এটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রের ভিত্তি পুনর্র্নিমাণের সুযোগ। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ার বদলালেও শোষণের পুরোনো কাঠামো সহজে বিদায় নেয় না। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করবেন, যা হবে নতুন বাংলাদেশের জন্য চূড়ান্ত ‘লিটমাস টেস্ট’।

সংস্কারের শোরগোল এবং অলিগার্কিক পক্ষাঘাত
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন বনাম গণভোটের বাস্তবায়ন নিয়ে যে তুমুল আলোচনা চলছে, তা সচল গণতন্ত্রের জন্য আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এই শোরগোলের আড়ালে অর্থনীতির নীরব রক্তক্ষরণ চাপা পড়ে যাচ্ছে। নোবেলজয়ী ডগলাস নর্থের ‘পথ-নির্ভরতা’ তত্ত্বের রূঢ? সত্য হলো: একবার ভুল প্রাতিষ্ঠানিক পথে আটকে গেলে কেবল কাগজের আইন বদলে সেই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। নর্থের আরেকটি মৌলিক অবদান হলো ‘লেনদেন ব্যয়’। রাষ্ট্রযন্ত্রে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অর্থনীতির লেনদেন ব্যয় এতটাই বাড়িয়ে দেয় যে ছোট উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না; বাজার দখল করে নেয় অলিগার্করা। আমাদের রাজস্ব ও আর্থিক কাঠামো আজ মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অদৃশ্য মায়াজালে বন্দি।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক ৩০.৬ শতাংশে। প্রায় ৫.৫ লাখ কোটি টাকার এই পাহাড় প্রমাণ করে, ‘অলিগার্কির সপ্তভুজ লৌহ কাঠামো’ নতুন চেহারায় পুরোনো শোষণ জারি রেখেছে। নোবেলজয়ী জোসেফ স্টিগলিৎজের ‘তথ্যের অপ্রতিসাম্য’ তত্ত্ব এই সংকটের মূল ব্যাখ্যা দেয়। ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে তথ্যের ভারসাম্যহীনতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃত খেলাপি হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। নোবেলজয়ী এসেমোগলুর ভাষায়, এগুলো ‘নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান’ যা জনগণের সম্পদ কুক্ষিগত করে।

রাষ্ট্রের আয়ের মূল উৎস কর-জিডিপি অনুপাত নেমেছে লজ্জাজনক ৬.৬ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় যেখানে ১০ শতাংশ ও বৈশ্বিক গড় ১৫ শতাংশের বেশি, সেখানে এই কঙ্কালসার রাজস্ব কাঠামো আধুনিক রাষ্ট্র চালানোর জন্য অপ্রতুল। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এনবিআরের ঘাটতি ৭১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, বছর শেষে যা ১ লাখ কোটি টাকা স্পর্শ করতে পারে। অথচ বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি ও রেয়াতের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ, এই ‘লুকানো ভর্তুকি’ তুলে দিলে রাজস্ব ঘাটতি অনেকটাই পূরণ সম্ভব। অর্থাৎ, সংসদে আমরা সাম্যের গান গাইলেও রাষ্ট্রের ‘গভর্নমেন্ট ইঞ্জিন’ যে ভেতর থেকে বিকল তা নিয়ে উচ্চকিত হই না। এটি একটি গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট। পর্দার আড়ালে কর ফাঁকিদাতা শক্তিশালী সিন্ডিকেটরাই এখনো অর্থনীতির ‘খেলার নিয়ম’ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই আর্তনাদ না শুনলে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট কেবল কাগুজে দলিল হয়েই থাকবে।

বৈশ্বিক যুদ্ধ অর্থনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির শ্বাসকষ্ট
আমরা সময়ের এক অগ্নিগর্ভ মোহনায় দাঁড়িয়ে আছি। কোভিড ও ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের রেশ না কাটতেই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল তছনছ করেছে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও ডলারের অস্থিরতা আমাদের আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাকে প্রকট করেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে আটকে থাকবে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৩.০৩ শতাংশে, যা গত এক দশকের সর্বনিম্ন। এই প্রতিকূলতার মাঝেই সরকার আগামী বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরছে। অন্যদিকে ৮.৫-৯ শতাংশের অসহনীয় মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাজার সিন্ডিকেট ও সরবরাহ সংকট না কাটিয়ে কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন কতটা বাস্তবসম্মত? শিল্পখাতে গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে যে ধস নেমেছে, তা অর্থনীতিকে স্ট্যাগফ্লেশনের বিষাক্ত চক্রে ফেলেছে।

তবে এই সংকটের মূল দেশের ক্রমহ্রাসমান মোট ফ্যাক্টর প্রোডাক্টিভিটিতে। গত এক দশকে বাংলাদেশের মোট ফ্যাক্টর প্রোডাক্টিভিটি প্রবৃদ্ধি গড়ে ০.৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যেখানে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামে তা ২ শতাংশের উপরে। অর্থাৎ, আমরা একই পরিমাণ শ্রম ও পুঁজি খাটিয়েও আগের চেয়ে কম আউটপুট পাচ্ছি। নোবেলজয়ী পল ক্রুগম্যানের বিখ্যাত উক্তি স্মরণীয়, “প্রোডাক্টিভিটি ইজ নট এভরিথিং, বাট ইন দ্য লং রান, ইট ইজ অলমোস্ট এভরিথিং।” এই উৎপাদনশীলতার পতনই প্রমাণ করে আমাদের উন্নয়ন ব্যয় কেবল ইট-পাথরের স্তূপ তৈরি করছে, জাতির মেধা ও দক্ষতার ভিত গড়তে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের মানব পুঁজি সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট ০.৪৬, যা ভারতের (০.৪৯) কাছাকাছি হলেও ভিয়েতনামের (০.৬৯) তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

এই ঘনঘোর অন্ধকারে একমাত্র ভরসা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো অর্থ। ২০২৬ সালের মার্চে রেকর্ড ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স রিজার্ভকে ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে স্থিতিশীল রাখার ‘অক্সিজেন মাস্ক’ জুগিয়েছে। কিন্তু কেবল সস্তা শ্রম রপ্তানি ও প্রবাসীদের আবেগী অর্থের ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের ভিশন ২০৩০ ও সৌদিকরণ নীতির কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাহিদা ক্রমশ কমছে। সাথে যোগ হয়েছে যুদ্ধ অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাই দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ ভবিষ্যতে ঝুঁকিতে পড়বে। আমাদের সামনে ২০২৬ সালের এলডিসি উত্তরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ। শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ফলে রপ্তানি আয়ে বাৎসরিক প্রায় ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। বর্তমান ভঙ্গুর আর্থিক কাঠামো ও উচ্চ খেলাপি ঋণ নিয়ে সেই বাস্তবতায় টিকে থাকা অসম্ভব, যদি না আমরা ‘অলিগার্কিক পক্ষাঘাত’ কাটিয়ে আমূল সংস্কারের পথে হাঁটি।

কোরবানির অর্থনীতি বনাম প্রাতিষ্ঠানিক বাজেট
২০২৬-২৭ বাজেটের সবচেয়ে নাটকীয় দিক হলো এর সময়কাল। ১১ জুন সংসদে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশের কয়েকদিন আগেই সারা দেশে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। কোরবানিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রায় ১.৫ থেকে ২.৫ লাখ কোটি টাকার একটি বিশাল ‘অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি’ সক্রিয় হয়, যা প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ! অথচ এই বিপুল অর্থপ্রবাহের সিংহভাগ ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা কর-কাঠামোর বাইরে থেকে যায়। বাজেট যখন ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কঠিন শপথ নিচ্ছে, ঠিক তখন কোরবানির মৌসুমি চাহিদা বাজারে মুদ্রার জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।

নোবেলজয়ী এলিনর অস্ট্রমের ‘কমনসের শাসন’ তত্ত্ব আমাদের শেখায়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী যদি কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বায়ত্তশাসন পায়, তবে সেই সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত হয়। কোরবানির হাট, গ্রামীণ বাজার ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্ব প্রযোজ্য। প্রান্তিক খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত বাজার ব্যবস্থাপনা জরুরি। এনবিআর এবার ‘এআই-চালিত ডিজিটাল ট্যাক্সেশন’ ও ‘স্মার্ট ক্যামেরা নেটওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক বাজারকে আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রস্তাব দিচ্ছে। এটি কেবল রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নয়; এটি ‘রেন্ট-সিকিং’ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই। সফল হলে প্রান্তিক খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ থেকে মুক্তি পাবে। অধিকন্তু, বাজেটের সমাজ-কল্যাণ বরাদ্দকে ‘যাকাত’ ভিত্তিক সনাতন অর্থব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করে একটি ‘হাইব্রিড’ বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, এটি কেবল অর্থ বিলানো নয়; বরং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ন্যায়ভিত্তিক ভিত তৈরি।

উন্নয়ন ব্যয়ের শবযাত্রা ও চলতি ব্যয়ের স্ফীত পেট
নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বাজেটের ‘চলতি ব্যয়ের’ খাতকে নিয়ন্ত্রণহীন চাপের মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘বণ্টনমূলক রাষ্ট্র’ বনাম ‘সক্ষম রাষ্ট্রের’ দ্বন্দ্ব। সরকারি বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চাপ, কার্ডভিত্তিক প্রকল্পের সম্ভাব্য সংস্থান এবং পূর্ববর্তী ঋণের সুদ পরিশোধের দায় মিলে চলতি ব্যয় আকাশছোঁয়া। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামগ্রিক চলতি ব্যয় জিডিপির ৮.৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আসন্ন বাজেটে ৯.৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। চলতি ব্যয়ের এই ‘স্ফীত পেট’ উন্নয়নের সবুজ ঘাস চিবিয়ে নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রাস করছে। বাজেটের এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) ব্যয় হয় কেবল পূর্ববর্তী ঋণের সুদ মেটাতে, যা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়ার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে হোঁচট খাওয়াচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, কাগজে উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ৬ শতাংশ দেখালেও সিংহভাগ খরচ হয় পরামর্শক ফি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে। প্রকৃত মূলধনী ব্যয় নেমে এসেছে জিডিপির মাত্র ১.৯ শতাংশে। নোবেলজয়ী থমাস পিকেটির ‘পুঁজির আয়ের হার

> প্রবৃদ্ধির হার’ সূত্র এখানে প্রাসঙ্গিক। যখন পুঁজির আয়ের হার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সম্পদ কুক্ষিগতকারী শ্রেণির হাতে আরও কেন্দ্রীভূত হয় এবং বৈষম্য বাড়ে। বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধি এই সূত্রকে সত্য প্রমাণ করছে। ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা ইস্যু ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষায় ব্যয়ের পরিকল্পনা থাকলেও, এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতি-নির্ভরশীলতা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে। ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঋণের অভাবে পড়বেন, একে বলে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব। এর ফলে নতুন কলকারখানা স্থাপন বাধাগ্রস্ত হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যও ভেস্তে যাবে। তাই অর্থমন্ত্রীকে সস্তা ব্যাংক ঋণের বদলে দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক অর্থায়ন, অবকাঠামো বন্ড ইস্যু এবং সৃজনশীল রাজস্ব সংগ্রহের পথে হাঁটতে হবে। আমরা যদি এই চলতি ব্যয়ের লাগাম টেনে না ধরি, তবে কেবল টিকে থাকার তাগিদে একটি অবসন্ন ‘পেনশন-স্টেট’ হয়েই থেকে যাব।

উত্তরণের রূপরেখা ও সৃজনশীল ধ্বংস
এই স্থবিরতা থেকে মুক্তি পেতে ২০২৪ সালের নোবেলজয়ী এসেমোগলু ও রবিনসনের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বনাম ‘নিষ্কাশনমূলক’ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্ব স্মরণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে, ২০২৫ সালের নোবেলজয়ী ফিলিপ অ্যাগিওন ও পিটার হাউইটের ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ অনুযায়ী, পুরোনো অদক্ষ কাঠামো ভেঙে উদ্ভাবনকে জায়গা দিতে হবে। কিন্তু গবেষণা খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.১৫-০.২০ শতাংশ। আধুনিক গবেষণাগার না গড়ে আমরা যেন পুরোনো সেতুর ফাটলে ঢালাই দিয়ে টিকে থাকতে চাইছি। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ মোশতাক খানের ‘পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট’ তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নিষ্পত্তি এমন এক শ্রেণিকে ক্ষমতা দিয়েছে যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের নামে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করছে।

এই ‘স্টেট ক্যাপচার’ ভাঙতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন জরুরি। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পাঁচটি মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন

প্রথমত, মেগা প্রজেক্ট স্থগিত করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যথাক্রমে জিডিপির ৩ ও ২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এনবিআর সংস্কার করে সম্পদের ওপর ১% সারচার্জ আরোপ, কৃষি আয়ের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ এবং ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্সের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। কর ফাঁকি রোধে আচরণগত অর্থনীতির ‘নাজ নীতি’ প্রয়োগ করে করদাতাদের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, অনুৎপাদনশীল প্রকল্প বাদ দিয়ে সেই অর্থ গবেষণা, উদ্ভাবন ও কারিগরি প্রশিক্ষণে স্থানান্তর করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় একটি ‘ন্যাশনাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠন করে খেলাপি ঋণ আলাদা করতে হবে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন ও ব্যাংক রেজুলেশন আইনের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

চতুর্থত, পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জোর দিয়ে জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্ডভিত্তিক সুরক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে ধীরে ধীরে একটি স্বচ্ছ লক্ষ্যভিত্তিক নগদ স্থানান্তর ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে হবে।

পঞ্চমত, প্রশাসনে দলীয়করণের আত্মঘাতী পথ পরিহার করতে হবে এবং জেনারেশন-জেড-এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া ওয়াচডগদের বাজেট বাস্তবায়ন ও নজরদারির অংশীদার করতে হবে। একইসাথে, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শ্রমঘন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে ট্রানজিট ফি ও বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য প্রাপ্য আদায়ে সক্রিয় কূটনীতি চালাতে হবে। সর্বোপরি, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণই হবে এই সকল সংস্কারের সফল বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত; যেখানে নাগরিকের অংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা যায়।

সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা
আমরা কি ঋণের সুদ, ভর্তুকি আর বেতন-ভাতা মেটানো এক অবসন্ন ‘পেনশন স্টেটে’ পরিণত হব, নাকি অমর্ত্য সেনের ‘সক্ষমতার রাষ্ট্র’ গড়ব? ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারিত নয়।
সংকটময় মুহূর্তে সাহসী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই নিষ্কাশনের ফাঁদ ভাঙতে পারে। নতুন সরকারের এই বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনের চূড়ান্ত পরীক্ষা। সংবিধান সংস্কারের কোলাহল থামলেও অর্থনীতির ভিত যদি শক্ত না হয়, দুর্বলতার চরম মূল্য পুরো সমাজকেই চোকাতে হবে। নববর্ষের হালখাতা ও কোরবানির আত্মত্যাগের এই প্রহরে আমাদের লক্ষ্য হোক: নিস্তরঙ্গ স্থবিরতা নয়, অতীতের ‘হাসিনা সিন্ড্রোম’ ভেঙে আমরা গড়ব এক সক্ষম, স্বনির্ভর ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ; যেখানে উন্নয়ন কোনো বিলাসিতা নয়, মেধাভিত্তিক জাতি গঠনের মূল শর্ত।

মতামত লেখকের নিজস্ব

লেখক: ড. মো. আবু হাসান,সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: hhafij@yahoo.com

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...