ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬ ৭:১২ পিএম

বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আর্থিক খাতের অনিয়মের পর নবনির্বাচিত সরকার যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা। কারণ, একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ব্যাংক দুর্বল হলে বিনিয়োগ কমে যায়, শিল্পখাত সংকুচিত হয়, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি আস্থাহীনতায় ভুগতে থাকে।

বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ ঠিক এমন একটি সংকটের মধ্য দিয়েই অতিক্রম করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগে হ্রাস, রাজস্ব ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের স্থবিরতার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সরকারের প্রস্তাবিত প্রায় ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের জন্যও একটি কার্যকর ও আস্থাশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের অনেক ব্যাংক আজ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং মূলধন ঘাটতির চাপে নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।

গত দেড় দশকে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং বেনামি ঋণের সংস্কৃতি ব্যাংকিং খাতকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা কাগজে-কলমে যতটা শক্তিশালী দেখানো হয়, বাস্তবে তা নয়।

এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো গ্রাহকদের আস্থার ঘাটতি। সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—তাদের সঞ্চয় কতটা নিরাপদ? সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাপ এবং তারল্য সংকট সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। কারণ, ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমে গেলে মানুষ ব্যাংকমুখী না হয়ে নগদ অর্থ বা বিকল্প অনিরাপদ খাতে ঝুঁকতে শুরু করে, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।

এই বাস্তবতায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ)’ কাঠামো চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের অডিটের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ও আত্মসাৎকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনও ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বিশেষ করে কয়েকটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কারণ, শুধুমাত্র নগদ সহায়তা দিয়ে দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়। এতে সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা করা গেলেও মূল সমস্যা থেকে যায়। অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিতে গিয়ে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করেছে, যার প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়েছে। অর্থাৎ, জনগণের টাকায় দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে।

এ কারণেই আসন্ন বাজেটে সরাসরি নগদ সহায়তার পরিবর্তে বিকল্প পুনর্মূলধনায়ন কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ‘রিক্যাপিটালাইজেশন বন্ড’ ইস্যু। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। সরকার যদি ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি বিশেষ বন্ড ইস্যু করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করে, তাহলে একদিকে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে বাজারে নতুন টাকা ছাপানোর প্রয়োজন হবে না। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপও তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তায় একটি স্বাধীন ‘ব্যাংক রিক্যাপিটালাইজেশন ফান্ড’ গঠন করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো এই তহবিলে অংশ নিতে পারে। এই ফান্ড দুর্বল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে নিয়ে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে সহায়তা করবে।
বিদেশি কৌশলগত বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশ সংকটাপন্ন ব্যাংক পুনর্গঠনে বিদেশি ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করেছে। বাংলাদেশেও নীতিগত ও কর-সুবিধা দিয়ে ব্যাংক খাতে বিদেশি অংশীদারিত্ব বাড়ানো যেতে পারে। এতে শুধু মূলধনই আসবে না, বরং সুশাসন, প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ব্যাংক খাতের সংকটের দায় যাদের, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে যারা ব্যাংক লুটপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার করে তা দুর্বল ব্যাংকের মূলধনে রূপান্তর করা গেলে জনগণের করের অর্থের ওপর চাপ কমবে এবং এটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান হিসেবেও বিবেচিত হবে।

অন্যদিকে, সাধারণ আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়ানোও জরুরি। ছোট আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের সীমা বৃদ্ধি এবং আমানত বিমা কভারেজ বাড়ানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। এর ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে অর্থ রাখতে আরও উৎসাহিত হবে।

ব্যাংকিং খাতের সংকট মূলত সুশাসনের সংকট। শুধু নতুন আইন বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা আনা ছাড়া টেকসই সমাধান আসবে না।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তাই শুধু একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের আর্থিক খাত পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ। সরকার যদি বাস্তবভিত্তিক সংস্কার, কার্যকর পুনর্মূলধনায়ন এবং কঠোর সুশাসনের পথে এগোতে পারে, তবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আবারও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

লেখক: মোঃ খায়রুল হাসান, সিএসএএ
ব্যাংকার ও আর্থিকখাত বিশ্লেষক।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...