প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৫ ৮:২৬ পিএম , আপডেট: জুলাই ২৫, ২০২৫ ৮:৪৩ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই মাস, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যেও ছিল প্রতিবাদ আর আন্দোলনের এক উত্তাল সময়। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে তাদের ধারাবাহিক আন্দোলন শুধু কুমিল্লা নয়, সারা দেশের নজর কেড়ে নেয়। এই প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ন্যায্যতার দাবি আর শিক্ষার্থীদের একজোট হয়ে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। এই আন্দোলন শুধু কোটা আন্দোলনে সীমাবদ্ধ ছিল না, পরে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়।

জুলাইয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো যেমন ছিল:

৪ জুলাই: শুরুটা সড়ক অবরোধ দিয়ে

৪ জুলাই ২০২৪, বৃহস্পতিবার, বেলা সাড়ে ১২টা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ শিরোনামে ব্যানার হাতে নেমে আসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। টানা তিন ঘণ্টার এই অবরোধ কর্মসূচিতে মহাসড়কজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কোটাব্যবস্থা সংস্কার।

সেদিন জেলা প্রশাসক বরাবর ৪ দফা দাবি জানান তারা। তবে তারা জানান, দাবি আদায় না হলে আন্দোলন আরও ব্যাপক হবে।

৬ জুলাই: মশাল মিছিলের আহ্বান

দাবি আদায়ে এদিন বেলা ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দ্বিতীয়বারের মতো কোটবাড়ি বিশ্বরোড (ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক) অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। আবার রাত পোনে ৯টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মশাল মিছিল শুরু করেন। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবি আদায় না হলে মহাসড়ক এবং রেললাইন অবরোধ করার হুঁশিয়ারি দেন।

৭ জুলাই: আবারও মহাসড়ক অবরোধ

কোটা সংস্কার না হওয়ায় ৭ জুলাই, রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে রাত পৌনে ৮টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা আবারও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। কয়েক ঘণ্টার এই অবরোধের ফলে প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

৮ জুলাই: বাংলা ব্লকড, ৪র্থ দিনের অবরোধ

৮ জুলাই, সোমবার, আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে শিক্ষার্থীরা আবার মহাসড়ক অবরোধ করে। তবে এই দিনটি ছিল অন্যরকম। শিক্ষার্থীরা অবরোধের সময় ক্রিকেট-ফুটবলে মেতে উঠে আন্দোলনটিকে এক ধরণের উৎসবমুখী রূপ দেয়। তবুও তাদের কণ্ঠে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়: “অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম কোটা নিশ্চিত করতে হবে এবং সংসদে আইন পাস করতে হবে।”

১০ জুলাই: ৫ম বারের মতো অবরোধ

১০ জুলাই বুধবার সকাল থেকেই তারা ফের মাঠে নামে। সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেয়। দিনব্যাপী এই অবরোধে রাস্তার দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

১১ জুলাই: সংঘর্ষ ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা

১১ জুলাই, বৃহস্পতিবার, আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উদ্দেশে রওনা দিলে আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন রাস্তায় (বর্তমান ছাত্র আন্দোলন চত্বর) পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়। ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর কাজী ওমর সিদ্দিকীসহ প্রক্টরিয়ার বডির অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রথমে ধস্তাধস্তি, তারপর লাঠিচার্জ এবং শর্টগান ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে এটি তুমুল সংঘর্ষে রূপ নেয়।

পুলিশের হামলায় ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়, যাদের মধ্যে ৪ জন ছিলেন সাংবাদিক। পুলিশের আঘাতে বেশ কয়েকজন গুরুতরভাবে শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। শিক্ষার্থীদের পাল্টা প্রতিরোধে ইট-পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।

সন্ধ্যার দিকে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে ‘অবাঞ্চিত’ ঘোষণা করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করে। তাদের দাবি, পুলিশের এই হামলায় প্রশাসনের মদদ ছিল। পুলিশের বাঁধা পেরিয়ে রাত ১১টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যায়।

১২ জুলাই: ছাত্র আন্দোলন চত্বরের ঘোষণা

১২ জুলাই শুক্রবার বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আনসার ক্যাম্পের সামনে পুলিশের হামলার স্থানটিকে ‘ছাত্র আন্দোলন চত্বর’ নামে ঘোষণা করে। এই নামকরণের পাশাপাশি সেখানে একটি বৃক্ষরোপণও করা হয়।

এই দিনই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে প্রক্টরের অপসারণ এবং হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানায়।

১৪ জুলাই: গণপদযাত্রা ও স্লোগানে উত্তাল কুবি ক্যাম্পাস

কোটা বৈষম্য নিরসন এবং পুলিশি হামলার বিচার দাবিতে কুবির শিক্ষার্থীরা ১৪ জুলাই একটি গণপদযাত্রার আয়োজন করেন। বেলা ১১টায় কুমিল্লা শহরের পুলিশ লাইন থেকে পদযাত্রাটি শুরু হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে। শিক্ষার্থীদের এই পদক্ষেপে কুমিল্লার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও একাত্মতা প্রকাশ করেন।

এই দিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য—“মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা কোটা পাবে না, তো কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে”—শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। মধ্যরাতে “রাজাকার, রাজাকার” ধ্বনিতে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হয়। হলগুলো থেকে মিছিল বেরিয়ে মূল ফটকে এসে একত্রিত হয়। এই বিক্ষোভের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ন্যায্য দাবি ও আত্মসম্মান রক্ষায় দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেন।

১৫ জুলাই: “চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার”

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে কুবির শিক্ষার্থীরা বিকেলে আবারও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। “চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার” এবং “লাখো শহীদের রক্তে কেনা দেশটা কারো বাবার না”—এমন প্রতিবাদী স্লোগানগুলো শিক্ষার্থীদের হতাশা ও ক্ষোভের প্রতিফলন ছিল।

এদিন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাবি, চবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে কুবির প্রায় ৪০ জন ছাত্রলীগ কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এমন গণপদত্যাগ আন্দোলনের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়।

১৬ জুলাই: বিক্ষোভ, পুলিশের গুলি এবং উত্তাল মহাসড়ক

কোটা আন্দোলনকারীদের দমনে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে তালা লাগিয়ে তাদের আটকানোর চেষ্টা করে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সেই তালা ভেঙে বেরিয়ে মিছিল করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধের সময় পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে দুইজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। শিক্ষার্থীদের হাতে পুলিশের একটি গাড়িও ভাঙচুর হয়।

এদিন কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজসহ কুমিল্লার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কুবির আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। হাজারো শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মহাসড়কে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে।

১৭ জুলাই: প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আল্টিমেটাম

সরকারের নির্দেশে কুবি প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়। শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করে এবং চার দফা দাবিতে প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দেন। দাবিগুলো ছিল হল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, হলের সকল সুবিধা অব্যাহত রাখা, পরিবহণ সেবা চালু রাখা, ছাত্র রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস ও হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা।

১৮ জুলাই: কুমিল্লায় শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষ

১৮ জুলাই কুমিল্লায় কোটা সংস্কার আন্দোলন এক নতুন মাত্রা পায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিলে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। প্রধান ফটক থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের মধ্যেই পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে শুরু করে। এর জবাবে শিক্ষার্থীরা ইট-পাথর নিক্ষেপ করে। প্রায় ৬ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বাধা এবং শহরজুড়ে উত্তেজনা

১৮ জুলাই, শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কোটবাড়ি অভিমুখে মিছিলে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যরা তাদের বাধা দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বাঁশ, রড, লাঠি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে স্লোগান দিচ্ছিলেন “লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।” “বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।” “ঢাবিতে হামলা কেন? প্রশাসন জবাব চাই।” “ছাত্রলীগের কালো হাত ভেঙে দাও, ঘুরিয়ে দাও।”

শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, কোটা সংস্কারের যৌক্তিক সমাধান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিতর্কিত মন্তব্য প্রত্যাহার।

ইন্টারনেট বন্ধ: আন্দোলন দমনের আরেকটি পদক্ষেপ

১৭ জুলাই রাত থেকে প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট এবং ১৮ জুলাই রাত ৯টা থেকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই নিষেধাজ্ঞা পাঁচ দিন ধরে চলতে থাকে। মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ ছিল ১০ দিন, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ ছিল ১৩ দিন। ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সংগঠিত হওয়া এবং তাদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়।

১৯ জুলাই: বিক্ষোভ মিছিল

শিক্ষার্থীদেরকে হল ছেড়ে দিতে বাধ্য করায় এদিন ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে। ১৮ জুলাই রাত থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। এরমধ্যেই সারাদেশে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ও হামলার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে জুম্মার নামাজের পরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে মেসে অবস্থান করা কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে প্রায় এক ঘন্টা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।

২৯ জুলাই: অস্ত্রের ছায়ায় প্রতিবাদ দমন

২৯ জুলাই দুপুরে কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন মোড়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ছাত্র আন্দোলন চত্বর থেকে কোটবাড়ি মোড় পর্যন্ত এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনে অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থীদের সিএনজি থেকে নামিয়ে মারধর করা হয়। এদিন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন আনসার ক্যাম্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা রেজা, ইকবাল খান ও সায়েমের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে জানা যায়। তবে সাংবাদিকরা এলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।”

১ আগস্ট: শিক্ষকদের পথে পথে বাঁধা

শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। পূর্বঘোষিত মানববন্ধনে অংশ নিতে চাইলেও কোটবাড়ি মোড় ও ক্যাডেট কলেজের সামনে তাদের বাধা দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা।

২ আগস্ট: রাজনৈতিক দল নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল শিক্ষার্থীদের

২৯ তারিখ ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের উপর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো হামলা করলে আন্দোলনের স্থান পরিবর্তন করে কুমিল্লা শহরে নেওয়া হয়া। এরই ধারাবাহিকতায় ২রা আগস্ট জুম্মার নামাজের পর পুলিশ লাইনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা।

৩ আগস্ট: গুলির শব্দ ও রক্তাক্ত দিন

এদিন টাউনহল, পুলিশ লাইনে আন্দোলন চালিয়ে যায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তবে এদিন শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী ও তার অঙ্গসংগঠনের লোকজন ন্যাক্কারজনকভাবে হামলা চালাদে অনেক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এদিন কান্দিরপাড়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিক সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাঈদ হাসানও সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হন। এদিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামিলীগ কুমিল্লা শহরজুড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণসহ বর্বরোচিত হামলা চালায়। এদিন কুবির কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী শেখ হাসিনা হলের হলের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম বিপ্লবী সুনীতি-শান্তি হল নামকরণ করেন।

৪ আগস্ট: আওয়ামী সন্তাসীদের গুলিবর্ষণ

৪ আগস্ট পুনরায় কোটবাড়ি বিশ্বরোড অবরোধের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। সেদিন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও বিশ্বরোড অবস্থান নিয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এদিন তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে আলেখারচর পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্ট দখল করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। তবে দুপুরের দিকেই আন্দোলনের স্থান কোটবাড়ি বিশ্বরোড দখল করে নেন শিক্ষার্থীরা।

৫ আগস্ট: শেখ হাসিনার পতন

৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে, এইদিন বৈধম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষণা অনুযায়ী লং মার্চ টু ঢাকা বাস্তবায়নের জন্য দেশের জনগণ ঢাকায় জড়ো হন। এদিন কুমিল্লা থেকে অনেকে ঢাকায় যান। শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকালে সরকারের বিরুদ্ধে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহিংসতার ফলে জনরোষ বৃদ্ধি পায়। ছাত্রদের প্রতিবাদে গুলি চালানোর পর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেখ হাসিনা দুপুরে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং পরে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারত পালিয়ে যান।

শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে গেলে কুমিল্লার জনগণ আনন্দ উল্লাস করতে রাস্তায় নেমে আসে। এছাড়া ক্ষোভে আওয়ামী লীগের বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীরা আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন। ভেঙ্গে ফেলা হয় শেখ মুজিবের ভাস্কর্য। সকল চিহ্ন কাসে করতে থাকে। শহরে আওয়ামী লীগের অফিস, কুমিল্লা ক্লাব, কুমিল্লা সিটির মেয়রের

শোক ও প্রতিবাদে ক্যাম্পাসের নতুন নামকরণ

৫ আগস্ট, শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘বিজয় ২৪ হল’ রাখা হবে। শেখ হাসিনা হলের নাম পরিবর্তন করে ‘সুনীতি-শান্তি হল’ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা।

৬ আগস্ট: কুবি শিক্ষার্থী কাইয়ুমের আত্মত্যাগ

৫ আগস্ট ঐতিহাসিক লং মার্চে অংশ নিতে গিয়ে সাভারে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল কাইয়ূম। (৬ আগস্ট) সকাল ৯টায় মেডিক্যালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যু শিক্ষার্থীদের মনোবলে নতুন উদ্দীপনা যোগায়।

লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, লোক প্রশাসন বিভাগ (২০২১-২২)

শেয়ার

পাঠকের মতামত

নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি: সমর্থন-বিরোধিতায় বিভক্ত রাজনৈতিক অঙ্গন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতি (পিআর) চালুর প্রস্তাব রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বর্তমানে প্রচলিত ...