
নতুন সরকার গঠনের পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাতের মতো আবাসন খাতেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা এই খাতটি সঠিক নীতি সহায়তা পেলে আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে অসাধারণ অবদান রাখতে পারে।
আবাসন শিল্প কেবল ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম। সিমেন্ট, রড, ইট, সিরামিক, কাচ, পেইন্ট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কাঠশিল্প, অ্যালুমিনিয়াম, স্যানিটারি—এমন প্রায় দুই শতাধিক উপখাত সরাসরি ও পরোক্ষভাবে আবাসন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই খাতে গতি এলে তার প্রভাব পড়ে সার্বিক অর্থনীতিতে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব ব্যাপক—দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রকৌশলী, স্থপতি, বিপণনকর্মী—অসংখ্য মানুষের জীবিকা এই খাতনির্ভর।
তবে বাস্তবতা হলো, নীতিগত জটিলতা, কর কাঠামোর চাপ, উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সীমাবদ্ধতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং নগর পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য—এসব কারণে খাতটি দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেনি। নতুন সরকার চাইলে কয়েকটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাতকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারে।
প্রথমত, আবাসন খাতে কর ও রেজিস্ট্রেশন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ফি ও অতিরিক্ত কর ক্রেতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং লেনদেনকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ঠেলে দেয়। করহার যৌক্তিক করলে লেনদেন বাড়বে, ফলে রাজস্বও বাড়বে। পাশ্ববর্তী কয়েকটি দেশের রেজিস্ট্রেশন ব্যয় আমাদের তুলনায় অনেক কম।
দ্বিতীয়ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ সহজলভ্য করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় বিশেষ হাউজিং ফাইন্যান্স তহবিল চালু করা গেলে আবাসনের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে নির্মাণ কার্যক্রম বাড়বে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর আগে ২০০৯ সালে এমন একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তখন অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাগরিক নিজের একটা ফ্ল্যাট ক্রয় করতে পেরেছিল।
তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ করা জরুরি। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে একটি প্রকল্পের অনুমোদনে দীর্ঘ সময় লাগে, যা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকরভাবে চালু হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
চতুর্থত, সাশ্রয়ী আবাসন (Affordable Housing) নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। জনসংখ্যা ও নগরায়ণের চাপে শহরে বাসস্থান একটি মৌলিক চাহিদা। সরকার-বেসরকারি অংশীদারত্বের (PPP) মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা গেলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও পরিকল্পিত বাসস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
পঞ্চমত, প্রবাসী আয়ের একটি অংশ আবাসন খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। প্রবাসীদের জন্য কর সুবিধা বা সহজ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালু করলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে বিনিয়োগ হবে।
এছাড়া পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নির্মাণকে উৎসাহিত করতে গ্রিন বিল্ডিং নীতিমালা ও প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে। এতে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে।
ড্যাপ এর সংশোধিত গেজেট মন্দের ভালো। তবে রিহ্যাব এর প্রস্তাব অনুযায়ী রাজউক এবং গৃহায়ন মন্ত্রণালয় যে সুপারিশ করেছিল সে অনুযায়ী সংশোধন করলে নাগরিকদের ফ্ল্যাট আরো সহজ লভ্য হতো, ব্যবসার গতি বৃদ্ধি পেতো। ইতোমধ্যে রিহ্যাব প্রণোদনা চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। এ বিষয়ে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অতিরিক্ত জনসংখ্যা, যানজট ও পরিবেশ দূষণের চাপ কমাতে ঢাকার পাশে স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে রাজধানীতে আবাসন সংকট, কর্মস্থলে দীর্ঘ যাতায়াত ও নাগরিক সেবার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে নতুন শহর গড়ে তুললে বাসস্থান, শিল্পকারখানা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা যাবে। এজন্য উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ–পানি–গ্যাস ব্যবস্থা, আধুনিক হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশবান্ধব মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ নিশ্চিত করলে কর্মসংস্থান বাড়বে, যানজট কমবে, জমির মূল্য স্থিতিশীল হবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। এ জন্য স্যাটেলাইট সিটির প্রয়োজনীয় তা অপরিহার্য।
আবাসন খাতকে যদি কৌশলগত শিল্পখাত হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা যায়, তবে এটি আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতির গতি বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব বৃদ্ধি, নগর উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ—সবক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, তেমনি আছে সুযোগও। সঠিক নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে আবাসন খাতকে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, নীতিগত সাহস এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
মতামত লেখকের নিজস্ব
লেখক: সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিহ্যাব
- ১স্পেন ও ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল: সরানো হলো দুই লাখের বেশি মানুষ
- ২দেশের সাত জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা
- ৩শিক্ষকদের অবশ্যই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী
- ৪সংবিধান রক্ষা করেছি, নতুন সরকার দেশ চালাচ্ছে, এসব আমারই কৃতিত্ব
- ৫শেরপুর সীমান্তে ভারতীয় মদসহ ২ চোরাকারবারি আটক
- ৬২০২৭ সালে ৩১ কোটি মানসম্পন্ন বই বিতরণ করা হবে : শিক্ষামন্ত্রী
- ৭কয়রায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসএমসি’র সদস্য মনোনয়নে বিতর্ক
- ৮ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে : তথ্যমন্ত্রী
- ৯আত্মঘাতী বোমা হামলায় পাকিস্তানের ১২ সেনাসহ ১৫ জন নিহত
- ১০মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা-শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ
- ১মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমা সদৃশ বস্তু, নিষ্ক্রিয় করেছে পুলিশ
- ২যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘোষণায় সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক পাচ্ছে বাংলাদেশ
- ৩শেরপুরে হাতি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বিষয়ক তিনদিনব্যাপী প্রশিক্ষণ
- ৪পাটশিল্পের স্বর্ণযুগ ফেরাতে যবিপ্রবির দুই শিক্ষার্থীর এআই অ্যাপ ‘ম্যাটেরিও’
- ৫বৃষ্টিমুখর পরিবেশে ঢাকার বায়ুর মান ‘ভালো’
- ৬বাংলাদেশ-ভারতের পণ্য আমদানিতে মার্কিন শুল্ক ১০ শতাংশ
- ৭কয়রায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের স্মরণে ছাত্রশিবিরের দোয়া অনুষ্ঠান
- ৮লক্ষ্মীপুরে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার
- ৯রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করছেন আজ
- ১০চাঁদপুরে বিজয়ী’র উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প





পাঠকের মতামত