
আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে একটি জাতীয় দৈনিকের উপ-সম্পাদকীয়-তে পরিবর্তিত বাংলাদেশ: অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ভাবনার উপর আমার প্রথম কলামটি প্রকাশ হয়। সেসময় ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় আসীন ছিলেন। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সঙ্গত কারণে বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা অনেক বেশী। তবে বেশ কিছু জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকারকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষত: বৈদেশিক ্ঋণ ও ঋণ পরিশোধের চাপ, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা, রাজস্ব ঘাটতি ও বাজেট বাস্তবায়ন চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প বিনিয়োগ স্থবিরতা, রপ্তানি ও বাণিজ্য ঘাটতি, পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা অন্যতম। এসকল চ্যালেঞ্জ সমুহ মোকাবেলা করে দেশ এবং দেশের অর্থনীতি সঠিক ট্র্যাকে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে বিশেষত: আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবেলায় অবকাঠামো উন্নয়নকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপকভাবে অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রতিযোগীতা এবং তড়িগড়ি করে সেসব প্রকল্প উদ্ধোধনের জন্য অস্বাভাবিক ভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খরচ করা সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে বেশ নাজুক করে ফেলে। একইসাথে মেগা/বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পূর্বে যথাযথ টেকনিক্যাল এবং ফাইন্যান্সিয়াল বিশ্লেষণের ঘাটতি লক্ষনীয় ছিল। বিশেষত: চট্রগ্রামে নির্মিত দেশের বৃহত্তম কর্ণফূলী টানেল লাভজনক স্থাপনার পরিবর্তে শে^তহস্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দৈনিক মোট ৩৭.৫ লক্ষ টাকা পরিচালনা ব্যয়ের বিপরীতে গড়ে ১০-১১ লক্ষ টাকা টোল আদায় হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন ২৭ লক্ষের অধিক টাকা ঘাটতি হচ্ছে যার আকার বার্ষিক ৯৮.৬ কোটি টাকা অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোকসান করছে। অপরদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্প ইতিমধ্যে লাভজনক অবস্থায় পৌছেছে। মেট্রোরেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এখনও লাভজনক অবস্থায় পৌছায় নাই। ঢাকা মেট্রোরেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে মুলত ঢাকা মহানগরীর সীমাহীন যানজট নিরসনের উদ্দেশ্যে নির্মান করা হলেও মহানগরী ও আশেপাশের শহরগুলিতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান যানজট সমস্যার তেমন কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হয় নি। যানজট ও এর কারণে সৃষ্ট সমস্যায় প্রতিনিয়ত নগরবাসীকে হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে।
মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র্যাপিট ট্রানজিট (বিআরটি) সহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও অদ্যবধি এ সমস্যার কার্যকর কোন সমাধান হয় নাই। মুলত সমস্যা সমাধানের জন্য সবসময় প্রতিকারের দিকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, প্রতিরোধে নজর দেয়া হয় নাই। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন ১৭০০-১৮০০ নতুন মানুষ স্থায়ীভাবে যুক্ত হচ্ছেন। তাছাড়া বিভিন্ন প্রয়োজনে আসা যাওয়া করা ‘ফ্লোটিং’ জনসংখ্যা কোটির উপরে। এসব গবেষণা হতে আরো জানা যায়, প্রায় ৪ লাখ যানবাহন বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতিদিন ঢাকায় প্রবেশ করে। সে হিসেবে প্রতিবছর ৭-৮ লাখ নতুন মানুষ ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যায় যুক্ত হচ্ছেন। এর বিপরীতে ঢাকা মহানগরী থেকে বছরে ১.৫-২ লক্ষ লোক গ্রামে স্থায়ী ভাবে চলে যান। ফলে ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা সবসময় ক্রমবর্ধমান।
এই বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলে যথেষ্ট হবে না। যেহেতু এই শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয় নাই সেহেতু এখানে সমন্বিত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত সময়োপযোগী হবে। সে লক্ষ্যে নতুন নতুন সরকারী পরিষেবা তথা বিভিন্ন অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থাপনা ঢাকার অদূরে স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া শুধুমাত্র রাজধানীর উপর অব্যাহত চাপ বৃদ্ধি না করে বিকেন্দ্রীকরণের উপর গুরুত্তোরোপ করতে হবে। উক্ত বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত সে সম্পর্কে আলোকপাত করা আজকের এই লেখনীর মুল উদ্দেশ্য। একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা যেটি কার্যকর ভাবে গ্রহণ করা গেলে ঢাকা মহানগরীর অব্যাহত জনসংখ্যার চাপ এবং যানজট ও জনযট মোকাবেলা সম্ভব হতে পারে। এক্ষেত্রে রেলপথ সিষ্টেমকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যেতে পারে।
ঢাকায় বাংলাদেশ সচিবালয়, সরকারী বিভিন্ন অধিদপ্তর সহ, বিশ^বিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, কারিগরী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রায় কোটির অধিক মানুষ কর্মরত আছেন। যাদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা ঢাকা মহানগরীর আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা শহরে বসবাস করেন। যেমন- ঢাকার পাশে গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ি, মাদারীপুর, শরীয়তপুর জেলা এবং উপজেলা বা থানা শহর যেমন- সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, কালিগঞ্জ, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ইত্যাদি এলাকায় স্থায়ী বসবাসকারী যারা শুধুমাত্র চাকুরীর জন্য ঢাকায় বসবাস করেন তাদের জন্য কার্যকর রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাপ কার্যত: অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।
এই সকল ফরমাল সেক্টরের কর্মজীবি ছাড়াও প্রতিদিন প্রায় ১৫-২০ লাখ জনসাধারণ বিভিন্ন কাজ-কর্মের উদ্দেশ্যে মহানগরীতে যাতায়াত করে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি কার্যকর রেলওয়ে সিস্টেম পুরো ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন করতে পারে। ধরা যাক, জনাব মোবারক হোসেন, স্থায়ী নিবাস মানিকগঞ্জ সদরে। সরকারি একটি সংস্থায় মাসিক ৩০,০০০টাকা বেতনে চাকুরী করেন। তার কর্মস্থল মতিঝিল। মুগধা এলাকায় বাসা ভাড়া থাকেন। সেখান থেকে নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করেন। প্রতিমাসে বাসাভাড়া ইউটিলিটি সহ খরচ ১৫,০০০ টাকা। প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত বাবদ খরচ ৪,০০০ টাকা। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে সাংসারিক অন্যান্য খরচাদি সম্পন্ন করে থাকেন। দেখা যায় প্রতি মাস শেষ হতে না হতে তার আয়ের সমুদয় অর্থ শেষ হয়ে কিছু ্ঋণ করতে হয়।
যদি কোন মাসে চিকিৎসা বা অন্য কোন আকস্মিক দূর্ঘটনায় অর্থের প্রয়োজন হয় তাহলে তিনি চরম সংকটে পড়ে যান। এক্ষেত্রে মানিকগঞ্জ থেকে কার্যকর রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হলে তিনি সকাল ৭.৩০মিনিটে রওনা হয়ে ট্রেন যোগে খুব সহজে ৯টার সময় অফিসে উপস্থিত হতে পারবেন। তার ছেলেমেয়েদের মানিকগঞ্জে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহন করাতে পারবেন। প্রতিমাসে ট্রেনে যাতায়াত বাবদ সর্বোচ্চ ৩০০০-৩৫০০ টাকা খরচ হতে পারে। এর বিপরীতে তার বাসা ভাড়া বাবদ খরচ সাশ্রয় হবে, স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনার ব্যয় তুলনামুলক কম হবে, ছুটির দিনে নিজের কৃষি জমি বা অন্য উৎপানশীল কাজে সময় দিতে পারবেন। এতে করে যেমন আয় বাড়বে তেমনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন। তিনি স্থানীয় বাজার থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় করার ফলে বাজার সম্প্রসারণ হবে, নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, উদ্যোক্তা তৈরী হবে এবং কর্মসংস্থান হবে। এতে করে জেলা কাঠামো আরো সুসংহত হবে। সুতরাং একটি কার্যকর রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশের জরুরী গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।
এক্ষেত্রে সরকারের খুব বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে না। কেননা গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরিয়তপুর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় ইতিমধ্যে রেল যোগাযোগ চালু রয়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থা কিছুটা সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হলে খুব সহজে এ অঞ্চলসমুহে রেল যোগাযোগ চালু করা সম্ভব হবে। এর ফলে কার্যত: ঢাকা শহরে বসবাসকারী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে; যানজট কমে যাবে; বিভিন্ন ধরনের মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারের অর্থ ব্যয় করতে হবে না; অপরিকল্পিত নগরায়ন ও যানবাহনের সংখ্যা কমে যাবে; ঢাকা শহরের পরিবেশ উন্নত হবে, বসবাসের যোগ্য পৃথিবীর অন্যতম শহরে পরিনত হবে; বাতাসের আদ্রতা কমে যাবে, বায়ু দূষণ ও এর প্রভাবে সৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যধি কমে যাবে; যানজটের কারণে কর্মঘন্টা অপচয় হবে না, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে; ঢাকার আশেপাশের জেলাসমুহের সাথে যোগাযোগ উন্নত হলে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে; বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে; জেলা ভিত্তিক কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে, বেকারত্ব কমে যাবে; স্থানীয় ভাবে টেকসই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে, মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে; দেশের জিডিপি বাড়বে। তাই নতুন সরকারকে দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জসমুহ মোকাবেলা করতে হলে স্মার্ট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এক্ষেত্রে জনবান্ধব ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
মতামত লেখকের নিজস্ব।
লেখক: এম. হেলাল আহম্মেদ খান, অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষণা ফেলো, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।
hajonyeco@gmail.com
- ১মে মাসে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় ধাক্কা
- ২চাঁদপুরে এক কালভার্ট বদলে দেবে ৮ গ্রামের মানুষের জীবন
- ৩আসছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ৮২ লাখ মাদকাসক্তকে রক্ষায় আইনি সংস্কার
- ৪ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্যে হাসি ফুটেছে চাষিদের মুখে
- ৫হুমকির মুখে ১২০০ বিঘা আমন আবাদ, ঝুঁকিতে মাছ চাষ
- ৬পায়ে শিকল বাঁধা সেই নারী ফিরলেন স্বজনদের কাছে
- ৭কুড়িগ্রামের কাঁচকোলে ভাঙন মোকাবিলায় দিনরাত পাউবোর কাজ
- ৮জুলাইয়ের ১৮ দিনে এলো ১৮০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স
- ৯রেমিট্যান্স আহরণে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাইলফলক অর্জন
- ১০মোস্ট সাসটেইনেবল কোম্পানি অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ
- ১সিরাজগঞ্জে ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার
- ২কক্সবাজারে পরিবার পরিকল্পনা কমিটির মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত
- ৩নির্মাণাধীন চাঁদপুর শহর সংরক্ষণ বাঁধের কাজ দৃশ্যমান
- ৪রবি আজিয়াটার বোর্ড সভা ২৮ জুলাই
- ৫প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র-সমাজের যৌথ দায়িত্ব: ডিএসসিসি প্রশাসক
- ৬ঠাকুরগাঁওয়ে ধর্ষণ মামলায় তিনজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন
- ৭ইরানের হামলায় ২ মার্কিন সেনা নিহত, জবাবে ভয়াবহ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের
- ৮যমুনা ব্যাংকের বোর্ড সভা ২২ জুলাই
- ৯১৫ বছরের ধ্বংসযজ্ঞ অল্প সময়ে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়, তবে কাজ শুরু হয়েছে
- ১০চিলমারীতে ফের তীররক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ





পাঠকের মতামত