মো. মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬ ১০:০০ এএম

একসময় বৈদেশিক মুদ্রা মানেই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার, পোশাকশিল্প কিংবা প্রবাসীদের ঘামে ভেজা রেমিট্যান্স। আজ সেই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি অদৃশ্য শ্রমবাহিনী। তারা বিমানবন্দরে লাইন দেয় না, সমুদ্র পাড়ি দেয় না, বিদেশি কারখানায় কাজও করে না। তারা বসে থাকে ঢাকার মিরপুরে, রাজশাহীর পুঠিয়ায়, রাঙামাটির পাহাড়ে কিংবা বরিশালের কোনো গ্রামে। তাদের অফিস একটি ল্যাপটপ, তাদের কারখানা একটি ইন্টারনেট সংযোগ, আর তাদের বাজার পুরো পৃথিবী। এই নতুন শ্রমবাহিনীর নাম ফ্রিল্যান্সার।

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ বিশ্বে কততম? এর উত্তর নির্ভর করে কোন সূচক দেখা হচ্ছে তার ওপর। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের বহুল উদ্ধৃত Online Labour Index–এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ কয়েকটি দেশের একটি। বহু বিশ্লেষণে ভারত, বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানকে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফ্রিল্যান্সিং জনশক্তির দেশ এবং অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে অবস্থান করছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। “ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়” কিংবা “প্রথম”—এ ধরনের দাবির পেছনে প্রায়ই নির্দিষ্ট কোনো প্ল্যাটফর্ম বা নির্দিষ্ট সময়ের তথ্য থাকে। পুরো বৈশ্বিক বাজারের জন্য একক ও চূড়ান্ত কোনো র‌্যাংকিং নেই। ফলে দায়িত্বশীল বিশ্লেষণে বলা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফ্রিল্যান্সিং প্রতিভার উৎস এবং দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

অর্থনীতির ভাষায় আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই খাত কত ডলার দেশে আনছে? সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে যে বাংলাদেশের সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা কয়েক লাখ এবং এই খাত থেকে প্রতিবছর শত শত মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে কয়েকটি একাডেমিক গবেষণায় প্রকৃত আয় এক বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

এই বৈদেশিক আয়কে অনেকেই “ডিজিটাল রেমিট্যান্স” বলে অভিহিত করেন। যদিও অর্থনীতির কঠোর সংজ্ঞায় এটি প্রবাসী রেমিট্যান্স নয়, বরং সেবা রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। তবু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে এর অবদান বাস্তব এবং ক্রমবর্ধমান। এমন একটি সময়ে যখন বিশ্ববাজারে শ্রমের চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি কৌশলগত সম্পদ।

বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা কী ধরনের সেবা দিয়ে থাকেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একসময় ডেটা এন্ট্রি ও সাধারণ প্রশাসনিক কাজের জন্য বাংলাদেশ পরিচিত ছিল। এখন চিত্র অনেক বদলেছে। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, মোবাইল অ্যাপ উন্নয়ন, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন, কনটেন্ট রাইটিং, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, UI/UX ডিজাইন এবং ক্রমবর্ধমান হারে AI-সংশ্লিষ্ট কাজেও বাংলাদেশি পেশাজীবীরা যুক্ত হচ্ছেন।

কিন্তু ঠিক এখানেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে নতুন এক ভূমিকম্পের নাম—Generative Artificial Intelligence। কয়েক বছর আগেও যে কাজ করতে একজন কনটেন্ট রাইটারের তিন দিন লাগত, আজ একটি AI মডেল সেটি কয়েক মিনিটে খসড়া আকারে তৈরি করে দিতে পারে। যে লোগো ডিজাইন করতে একজন গ্রাফিক ডিজাইনারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে হতো, এখন AI-নির্ভর সফটওয়্যার কয়েক সেকেন্ডে ডজনখানেক বিকল্প হাজির করছে। অনুবাদ, কপিরাইটিং, প্রাথমিক কোডিং, তথ্য বিশ্লেষণ, এমনকি ভিডিও নির্মাণেও একই দৃশ্য।

এখানে অনেকেই আতঙ্কিত হন। আমি কিছুটা ভিন্নভাবে বিষয়টি দেখি। ইতিহাস বলে, প্রযুক্তি সাধারণত চাকরি পুরোপুরি ধ্বংস করে না; বরং কাজের প্রকৃতি বদলে দেয়। শিল্পবিপ্লব কৃষকের সংখ্যা কমিয়েছিল, কিন্তু নতুন শিল্পশ্রমিক তৈরি করেছিল। ইন্টারনেট টাইপরাইটার অপারেটরকে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু কম্পিউটার অপারেটর তৈরি করেছে। AI-ও একই কাজ করবে। বিপদ তাদের জন্য, যারা কেবল পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করেন। সুযোগ তাদের জন্য, যারা সমস্যার সমাধান করেন।

বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই। দেশের বড় অংশ এখনও তুলনামূলক কমমূল্যের শ্রমভিত্তিক সেবার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে “সস্তা কিন্তু দক্ষ” জনশক্তি হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল। AI যুগে “সস্তা” শব্দটির মূল্য দ্রুত কমছে, কারণ যন্ত্র মানুষের চেয়েও সস্তা। ফলে প্রতিযোগিতার নতুন মাপকাঠি হবে সৃজনশীলতা, কৌশলগত চিন্তা, শিল্পজ্ঞান, ক্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনা এবং জটিল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা।
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের তিনটি বড় রূপান্তর প্রয়োজন। প্রথমত, সাধারণ কাজ থেকে বিশেষায়িত কাজে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, শ্রম বিক্রেতা থেকে সমাধান বিক্রেতায় পরিণত হওয়া। তৃতীয়ত, AI-কে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা। একজন দক্ষ ডেভেলপার যদি AI ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা তিনগুণ বাড়াতে পারেন, তাহলে তিনি চাকরি হারাবেন না; বরং বাজারে আরও শক্তিশালী হবেন।

বাংলাদেশকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার পথে বাধাও কম নয়। প্রথম সমস্যা দক্ষতার গভীরতা। দেশে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ তৈরির হার এখনও সীমিত। দ্বিতীয় সমস্যা ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা। তৃতীয় সমস্যা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং। ভারত বা ইউক্রেনের মতো দেশগুলো নির্দিষ্ট প্রযুক্তিখাতে শক্তিশালী সুনাম তৈরি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। চতুর্থ সমস্যা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট অবকাঠামো ও আর্থিক জটিলতা। পঞ্চম সমস্যা গবেষণা ও উদ্ভাবনের দুর্বলতা।

যেসব দেশ ফ্রিল্যান্সিংয়ে এগিয়ে আছে, তারা কেবল প্রশিক্ষণ দেয়নি; তারা পুরো একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। ভারত বহু বছর ধরে প্রযুক্তি শিক্ষা, সফটওয়্যার রপ্তানি অঞ্চল এবং বৈশ্বিক আইটি ব্র্যান্ড নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও সফটওয়্যার আউটসোর্সিং খাত ধরে রেখেছে উচ্চ দক্ষতার কারণে। ফিলিপাইন ইংরেজি ভাষা ও বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিংকে জাতীয় কৌশলে পরিণত করেছে। পাকিস্তান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক প্রচারে জোর দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি র‌্যাংকিংয়ের নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি আগামী দশকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে নিজের জায়গা নিশ্চিত করতে পারবে? আজকের ফ্রিল্যান্সার কেবল একজন আউটসোর্সড কর্মী নন; তিনি দেশের অদৃশ্য রপ্তানিকারক। তার কোনো কারখানা নেই, কিন্তু তিনি বৈদেশিক মুদ্রা আনেন। তার কোনো বন্দর নেই, কিন্তু তিনি সেবা রপ্তানি করেন। তার কোনো জাহাজ নেই, কিন্তু তিনি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পতাকা বহন করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝড় সামনে আরও তীব্র হবে। অনেক পুরোনো দক্ষতা বিলীন হবে। নতুন দক্ষতার জন্ম হবে। যে জাতি দ্রুত শিখতে পারবে, সেই জাতিই জিতবে। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এখনও বিশাল। তবে সেই সুযোগকে বাস্তব সম্পদে পরিণত করতে হলে আমাদের কিবোর্ডের সৈনিকদের শুধু শ্রমিক নয়, জ্ঞানকর্মীতে পরিণত করতে হবে। কারণ আগামী দিনের বাজারে সস্তা শ্রম নয়, মূল্যবান মেধাই হবে সবচেয়ে দামি রপ্তানি পণ্য।

সামগ্রিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই একটি বাস্তবতা মেনে নিতে হবে—ফ্রিল্যান্সিং আর কোনো ক্ষুদ্র আয়ের খাত নয়। এটি এখন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি কৌশলগত ক্ষেত্র। পোশাকশিল্প যেমন একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপ বদলে দিয়েছিল, আগামী দশকে ডিজিটাল সেবা রপ্তানি তেমন একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এর জন্য সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। ফ্রিল্যান্সারদের শুধু “তরুণদের কর্মসংস্থান” হিসেবে দেখলে চলবে না; তাদের “ডিজিটাল রপ্তানিকারক” হিসেবে দেখতে হবে।

সবার আগে প্রয়োজন একটি জাতীয় ডিজিটাল ট্যালেন্ট স্ট্র্যাটেজি। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। কিন্তু AI, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্লকচেইন, ফিনটেক এবং উন্নত সফটওয়্যার প্রকৌশলকে কেন্দ্র করে ১০ বছরের একটি জাতীয় রোডম্যাপ থাকা দরকার। আজ বিশ্বের আউটসোর্সিং বাজার দ্রুত নিম্নমূল্যের শ্রম থেকে উচ্চমূল্যের জ্ঞানভিত্তিক সেবার দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এখনও শুধু গ্রাফিক ডিজাইন বা ডেটা এন্ট্রির মতো খাতে আটকে থাকে, তাহলে AI যুগে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও এমন সিলেবাস পড়াচ্ছে, যার একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে বহু বছর আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেখানে Generative AI, Machine Learning Operations (MLOps), Quantum Computing এবং Advanced Data Engineering নিয়ে কাজ করছে, সেখানে অনেক শিক্ষার্থী এখনও পুরোনো কারিকুলামের মধ্যে আটকে আছে। সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে হবে। এখনও অনেক বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার বিদেশি ক্লায়েন্টের অর্থ গ্রহণে জটিলতার মুখোমুখি হন। বৈদেশিক মুদ্রা আনার প্রক্রিয়া যত সহজ হবে, তত বেশি আয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে দেশে আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

চতুর্থত, AI-কে ভয় না পেয়ে AI-কেন্দ্রিক দক্ষতা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ করতে হবে। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যারা AI-কে চাকরি ধ্বংসকারী প্রযুক্তি নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশকেও সেই পথেই হাঁটতে হবে। সরকারের উচিত জাতীয় পর্যায়ে AI ল্যাব, গবেষণা তহবিল এবং উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলা। শুধু ব্যবহারকারী নয়, AI-ভিত্তিক পণ্য নির্মাতাও হতে হবে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মানেই সফটওয়্যার, ফিলিপাইন মানেই BPO, এস্তোনিয়া মানেই ডিজিটাল গভর্নেন্স—এ ধরনের একটি পরিচিতি তারা তৈরি করতে পেরেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও “Bangladesh Digital Services” বা অনুরূপ কোনো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সম্মেলন, আউটসোর্সিং এক্সপো এবং বিনিয়োগ ফোরামগুলোতে বাংলাদেশকে আরও দৃশ্যমান হতে হবে।

ষষ্ঠত, দেশের বাইরে আইটি সেবা রপ্তানির জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা “ডিজিটাল এক্সপোর্ট জোন” তৈরি করা যেতে পারে। পোশাকশিল্পের জন্য যেমন শিল্পাঞ্চল রয়েছে, তেমনি উচ্চগতির ইন্টারনেট, ডেটা সেন্টার, গবেষণা সুবিধা এবং কর-সুবিধা সম্বলিত প্রযুক্তি অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহী হবে।

সপ্তমত, ইংরেজি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক সময় প্রযুক্তিগত দক্ষতার চেয়ে ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অনেক প্রতিভাবান তরুণ কেবল ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চমূল্যের প্রকল্প হারান।

সবশেষে, সরকারকে ফ্রিল্যান্সিংকে একটি জাতীয় রপ্তানি খাত হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। পোশাকশিল্পের মতো এখানেও রপ্তানি প্রণোদনা, দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল, গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।

আমার মতে, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ভারত, পাকিস্তান বা ফিলিপাইনের সঙ্গে নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। যে দেশ তার মানবসম্পদকে AI-এর সহযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে, সেই দেশই ডিজিটাল অর্থনীতির পরবর্তী অধ্যায়ে নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ এখনও খোলা আছে। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সময় থাকতে প্রস্তুতি নিতে পারব?

মো. মাহমুদুল হাসান
ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...