ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১১, ২০২৫ ৩:০৪ পিএম

জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। তবে, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার স্বাস্থ্য চাহিদা ও সীমিত সরকারি সম্পদের প্রেক্ষাপটে, এককভাবে সরকারের পক্ষে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ অর্জন করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ-পিপিপি) মডেলটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে গতিশীল, সম্প্রসারিত ও মানসম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল বলে মনে করি। তবে, এই অংশীদারিত্বকে কেবল একটি ধারণা বা নীতি হিসেবে না দেখে, এর বাস্তব প্রয়োগ, বিদ্যমান ডেটা এবং কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে জরুরী ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের সিংহভাগ (সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬৯%) এখনও জনগণের নিজস্ব পকেট থেকে আসে (Out-of-Pocket Expenditure – OOPE)। এই উচ্চমাত্রার ওওপিই নির্দেশ করে যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক সুরক্ষা যথেষ্ট নয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারীদের ৬২% বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহণ করে। এছাড়াও, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নিবন্ধিত বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১৫,২৩৩টি (২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী)।

এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত ইতোমধ্যেই দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে এবং সরকারি খাতের পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এই বিদ্যমান বাস্তবতাকে স্বীকার করে একটি সুচিন্তিত ও কাঠামোগত ‘পিপিপি’ মডেল প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। এই মডেলের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের অব্যবহৃত বা স্বল্প-ব্যবহৃত অবকাঠামো এবং উচ্চমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম বেসরকারি অংশীদারদের ব্যবস্থাপনায় এনে জনগণের জন্য সহজলভ্য করা যেতে পারে, যার ফলে সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ঘাটতি মেটাতে ‘পিপিপি’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে হবে, যার জন্য দেশে দ্রুত বিদেশি যৌথ উদ্যোগে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা অপরিহার্য।

‘পিপিপি’ মডেলের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে হলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং প্রতিবেশী দেশসমূহের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা অপরিহার্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিকভাবে ‘পিপিপি’ মডেলকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউএইচসি) অর্জনের একটি কার্যকরী কৌশল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে, ‘পিপিপি’ সাধারণত তিনটি মডেলে বিভক্ত: ১. সরবরাহ অংশীদারিত্ব, যেমন ক্লিনিক পরিচালনা; ২. অর্থায়ন অংশীদারিত্ব, যেমন স্বাস্থ্য বীমা প্রবর্তন; এবং ৩. সম্পদ অংশীদারিত্ব, যেমন হাসপাতাল বা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি লিজ। উন্নত দেশগুলিতে, যেমন যুক্তরাজ্যে, প্রাইভেট ফাইনান্স ইনিসিয়েটিভ (পিএফআই) মডেলের মাধ্যমে হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণে বেসরকারি অর্থায়ন সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত এবং থাইল্যান্ড এই মডেলকে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। ভারতে বিভিন্ন রাজ্য সরকার, যেমন গুজরাট, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে ‘পিপিপি’ মডেল ব্যবহার করেছে। বিশেষত, রোগ নির্ণয় এবং জটিল সার্জারির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি হাসপাতালে অপেক্ষার সময় হ্রাস করা হয়েছে। অন্যদিকে, থাইল্যান্ড তার সফল ইউএইচসি মডেলের জন্য পরিচিত। সেখানে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা স্কিমগুলো বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোকেও চুক্তির মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করে সেবার পরিধি বৃদ্ধি করেছে। এই মডেলে, সরকার সেবার মূল্য এবং মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

ভারত ও থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশও বেশকিছু কৌশলগত উন্নতি সাধন করতে পারে। থাইল্যান্ডের মতো, বাংলাদেশে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির’ (SSK) মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে চুক্তির আওতায় আনা যেতে পারে, যেখানে সরকারি অর্থায়নে সেবার একটি নির্দিষ্ট প্যাকেজ প্রদান করা হবে এবং এটি সেবার মূল্যকে সাশ্রয়ী রাখবে। ভারতের মতো, ‘পিপিপি’ মডেলের মাধ্যমে বিশেষায়িত রোগ নির্ণয় এবং জটিল সার্জারি বা নবজাতক সেবার মতো উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রগুলোতে বেসরকারি খাতের দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে, যা সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহে অপ্রতুল। এছাড়াও, ‘পিপিপি’-এর চুক্তিতে এমন ধারা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যেখানে সেবার মান এবং জন-প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা না গেলে বেসরকারি অংশীদারের আর্থিক ক্ষতি বা জরিমানা ধার্য হবে, যার ফলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

কার্যকর ‘পিপিপি’ মডেল বাস্তবায়নে, কাঠামোগত সুশাসন ও ডেটাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য। প্রথমত, অংশীদারিত্ব চুক্তিতে সামাজিক বিচার্য বিষয়সমূহ—বিশেষত সেবার নির্ধারিত মূল্য, নিশ্চিত মান, ও জনগণের প্রবেশাধিকার—সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের ওপর একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিদ্যমান তদারকি প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হবে।

জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ‘স্বাস্থ্যসেবা রেগুলেটরি কমিশন’ গঠন করা আবশ্যক, যা সেবার মূল্য নির্ধারণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। তৃতীয়ত, জনস্বার্থ রক্ষায় চুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির’ (এসএসকে) মতো আর্থিক সুরক্ষা স্কিমগুলোকে ‘পিপিপি’-এর আওতায় এনে জনগণের পকেট থেকে হওয়া ব্যয় (ওওপিই) হ্রাস করার ওপর জোর দিতে হবে। স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন -এর সুপারিশ অনুযায়ী, জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ এই খাতে থাকা উচিত, যা বেসরকারি খাতের ওপর জনগণের নির্ভরতা কমাতে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে আরও ফলপ্রসূ করতে সহায়ক হবে।

স্বাস্থ্যখাতকে আমদানিনির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে মেডিকেল ডিভাইস ফ্যাক্টরি স্থাপন করা একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বর্তমানে, আমরা প্রায় ৯৯% চিকিৎসা সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করি, যা স্বাস্থ্যখাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়ায়। দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের অব্যবহৃত/পড়ে থাকা জমিতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মেডিকেল ডিভাইস ফ্যাক্টরি স্থাপনে সহায়তা করবে। এই স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার নীতি PPP মডেলের সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ঘাটতি মেটাতে পিপিপি-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেডিকেল এডুকেশনকে উৎসাহিত করতে হবে, যার জন্য দেশে দ্রুত বিদেশি যৌথ উদ্যোগে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা অপরিহার্য।

‘পিপিপি’ মডেলের সাফল্য নির্ভর করে দেশীয় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের (মার্চেন্টস) দক্ষতা এবং আর্থিক সক্ষমতার ওপর। তাদের সক্ষমতা উন্নয়নে সরকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ব্যবস্থা করা উচিত, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর জন্য। নতুন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়নের জন্য বেসরকারি অংশীদারদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ বা বিশেষ সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন- আইএসও) অনুসরণ করে একটি জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করা এবং এই মান অর্জনের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা দরকার। এটি স্বাস্থ্যসেবার ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সাহায্য করবে।

সকলের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং একটি অপরিহার্য কৌশল। তবে এই অংশীদারিত্বকে কেবল অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতির চুক্তি হিসেবে না দেখে, বরং সেবার মান এবং জবাবদিহিতার চুক্তি হিসেবে দেখা উচিত। সঠিক ডেটা বিশ্লেষণ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সুচিন্তিত নীতির মাধ্যমে এই অংশীদারিত্বকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে, তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে ২০৩৩ সালের মধ্যে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে উন্নীত করার (বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট -২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী প্রত্যাশিত) পাশাপাশি, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের পথ প্রশস্ত করবে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও জনগণের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে (পিপিপি) একটি সুদৃঢ় সামাজিক চুক্তির কাঠামোর মধ্যে রেখে দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সর্বাধিক অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

লেখক: সাকিফ শামীম, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...