
রাষ্ট্রের আর্থিক হৃদপিণ্ড ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ গত দেড় দশক ধরে এক পদ্ধতিগত পক্ষাঘাতের শিকার। ২০১১ সালের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরি, ২০১৭-এর ভল্টের সোনা গায়েব, ২০২২-২৪ সালের তীব্র তারল্য সংকট কিংবা ব্যাংক কর্মীদের সাম্প্রতিক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি সুসংহত পদ্ধতিগত ব্যাধির ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ। এর মূলে রয়েছে অলিগার্কি বা স্বল্পতন্ত্রের এক দুর্ভেদ্য কাঠামো। এটি একটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক থেকে নিষ্কাশনমূলকে রূপান্তরের চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর স্বার্থে আপামর জনতার সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পক্ষাঘাত কেবল কিছু কাগুজে মুদ্রার লুণ্ঠন নয়, এটি এক ‘স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য’। যখন একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলে, তখন তা সমগ্র অর্থনীতির উৎপাদন সম্ভাবনা রেখাকে ভেতরের দিকে ঠেলে দেয়। একজন সাধারণ আমানতকারী যখন দেখেন রাষ্ট্রের কঠোরতম নিরাপত্তাবেষ্টনীতে থাকা ভল্ট অনিরাপদ এবং দেশের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই রেগুলেটরি ক্যাপচারের শিকার হয়ে রাজনৈতিক চাপের কাছে নির্লজ্জভাবে নতি স্বীকার করছে, তখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থার শেষ ঠিকানাও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদ্ধতিগত পতনের ইতিহাস, বর্তমানের অগ্নিগর্ভ সংকটের গভীরতা এবং তা থেকে উত্তরণের কাঠামোগত পথ বিশ্লেষণ করা।
সপ্তভুজ লৌহ কাঠামো: অলিগার্কির এনাটমি
আমার প্রস্তাবিত ‘সপ্তভুজ লৌহ কাঠামো’ অলিগার্কির একটি অনমনীয় কাঠামো, যা সাতটি মিথোজীবী বাহুর মাধ্যমে রেন্ট-সিকিংকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং কাঠামোটিকে স্ব-শক্তিশালী করে তোলে।
(১) রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, পরিবারতন্ত্র ও কাল্ট (ক্ষমতার নিউক্লিয়াস): পুরো কাঠামোর নিয়ন্ত্রক এই বাহু। ক্ষমতা এখানে জনকল্যাণের নয়, সম্পদ আহরণের উৎস; পৃষ্ঠপোষকতা-নেটওয়ার্কের (খান, ২০০০) মাধ্যমে আনুগত্যের বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা বণ্টিত হয়, আর ‘কাল্ট অব পার্সোনালিটি’ (গ্রামসি, ১৯৭১) লুণ্ঠনকে আদর্শিক বৈধতা দেয়।
(২) সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র (রাষ্ট্রের ‘লৌহ মুষ্টি’): বলপ্রয়োগমূলক ভিত্তি নিশ্চিতকারী এই বাহু আনুগত্যের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা, পদোন্নতি ও সুরক্ষা দেয়। ওয়েবারের মেরিটোক্র্যাটিক আদর্শের বিপরীতে নিয়োগ-বদলি হয় পৃষ্ঠপোষকতায়; ফলে ‘আইনের শাসন’ সরিয়ে ‘আইন দ্বারা শাসন’ (ও’ডোনেল, ২০০৪) প্রতিষ্ঠিত হয়।
(৩) লুটেরা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও প্লুটোক্র্যাসি (অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড): দক্ষতা নয়, রাজনৈতিক সংযোগই এদের সম্পদের উৎস। এদের কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৩০% ছাড়িয়েছে—এশিয়ায় সর্বোচ্চ (এডিবি, ২০২৫)। ট্রেড সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ‘নিয়ন্ত্রণ ক্যাপচার’ (স্টিগলার, ১৯৭১) এদের মূল কৌশল।
(৪) রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান (আইনি ক্যাপচার): জাতীয় সংসদ, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক লুণ্ঠনকে আইনি বৈধতা দেয়। রাজনৈতিক নিয়োগ প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ধ্বংস করে—এসেমোগলু ও রবিনসন (২০১২)-এর ভাষায়, “নিষ্কাশনমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকেও নিষ্কাশনমূলক করে।”
(৫) মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক চক্র (আখ্যানের নিয়ন্ত্রণ): এই বাহু ‘সাংস্কৃতিক হেজেমনি’ (গ্রামসি, ১৯৭১) ও ‘সম্মতির উৎপাদন’ (চমস্কি ও হারম্যান, ১৯৮৮) ঘটিয়ে লুণ্ঠনকে ‘উন্নয়ন’-এর আখ্যানে বৈধতা দেয়। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ ‘প্রতীকী পুঁজি’র (বোর্দিও, ১৯৮৬) বিনিময়ে ক্ষমতার প্রশংসা করে।
(৬) বিদেশি মিত্র ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তি (আন্তর্জাতিক বৈধতা): ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এই বাহু আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও বৈধতা দেয়, যা অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা কমায় এবং বৈদেশিক নির্ভরতা সংস্কারের চাপ হ্রাস করে (হ্যাগার্ড ও কাউফম্যান, ১৯৯৫)।
(৭) অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অর্থনীতি (মাফিয়া, সিন্ডিকেট, ছায়াশাসন, ধর্ম): চাঁদাবাজির ‘সমান্তরাল কর’-নেটওয়ার্ক তৃণমূলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং পুটনাম (১৯৯৩) বর্ণিত ‘ব্রিজিং সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ ধ্বংস করে কেবল সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করে।
স্টেট ক্যাপচার: তাত্ত্বিক ভিত্তি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
সপ্তভুজ কাঠামোর চতুর্থ বাহু—রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান—কে তাত্ত্বিকভাবে বুঝতে হলে হেলম্যান, কাউফম্যান এবং গেরিটস (২০০০)-এর ‘স্টেট ক্যাপচার’ তত্ত্বটি প্রাসঙ্গিক। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, দুর্নীতি মানে শুধু ঘুষ নেওয়া নয়; যখন শক্তিশালী অলিগার্ক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তখন তাকে ‘স্টেট ক্যাপচার’ বলা হয়। এটি সাধারণ দুর্নীতির চেয়েও বিপজ্জনক, কারণ এখানে অলিগার্করা আইন ভাঙে না, বরং নিজেদের লুটপাটকে বৈধতা দিতে নিজেদের স্বার্থে আইন তৈরি করিয়ে নেয়। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান অস্থিরতা এই তত্ত্বেরই এক অকাট্য প্রমাণ। খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ব্যাংক একীভূতকরণের সাম্প্রতিক নাটকীয়তা ও পুরনো লুটেরা মালিকদের কাছে ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান—এসবই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অলিগার্কিক পক্ষাঘাতের বহিঃপ্রকাশ। আইএমএফ-এর সংস্কার শর্ত পূরণে সরকারের ধারাবাহিক শৈথিল্যও একই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজও নব্য লুটেরাদের কাছে ‘ক্যাপচারড’ বা জিম্মি; তারা স্বাধীনভাবে কাজ করার বদলে এখনো নির্দিষ্ট কিছু অলিগার্কের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংক: চতুর্থ বাহুর প্রাতিষ্ঠানিক পাহারাদার
সপ্তভুজ কাঠামোর এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। অলিগার্ক কাঠামোর চতুর্থ বাহু হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক দশকে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র হারিয়ে লুণ্ঠনের এক প্রাতিষ্ঠানিক পাহারাদারে পরিণত হয়েছে। এটি এখন আর কেবল আর্থিক স্থিতিশীলতার রক্ষক নয়, বরং লুণ্ঠনকে আইনী ও সাংবিধানিক বৈধতা দানের মাধ্যমে লুটেরা গোষ্ঠীকে মূলত অঘোষিত দায়মুক্তি প্রদান করছে। অধিকন্তু, তথ্যের অসামঞ্জস্যতা বজায় রেখে এবং ‘অর্ডার অব লিমিটেড অ্যাকসেস’ নীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ আমানতকারীদের বঞ্চনাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেছে। এখানে রেন্ট-সিকিং ও প্রতিষ্ঠানের ‘খেলার নিয়ম’ ভয়ংকর রূপ পেয়েছে। এই ব্যবস্থায় আইনের শাসনের বদলে আইনের মাধ্যমে শাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে লুটেরাদের জন্য এক অঘোষিত ও স্থায়ী দায়মুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। নিম্নে এই কাঠামোর আলোকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদ্ধতিগত পতনের ঐতিহাসিক গতিপথ বিশ্লেষণ করা হলো।
অতীতের দহন: লুণ্ঠনের মহড়া ও প্রাতিষ্ঠানিক পতন
সাইবার লুণ্ঠন ও নিরাপত্তার পরিকল্পিত ভঙ্গুরতা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার প্রথম লক্ষণ ফুটে ওঠে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিকল্পিত ভঙ্গুরতায়। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক ফেড থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন ডলারের সাইবার লুণ্ঠন বিশ্ব ব্যাংকিং ইতিহাসের এক কৃষ্ণতম অধ্যায়। হ্যাকাররা ১ বিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা করে ফেডের ৩৫টি জাল নির্দেশের মধ্যে ৫টিতে সফল হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসা ত্রুটিপূর্ণ প্রিন্টার বা অরক্ষিত সুইফট সার্ভারের কাহিনী নিছক কোনো প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ওপর চরম আঘাত। লুণ্ঠনের তথ্য জানার পরও ২৪ দিন তা গোপন রাখা এবং পরবর্তীতে ফরাসউদ্দিন কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা প্রমাণ করে যে, অলিগার্কির আমলাতন্ত্র ও লুটেরা ব্যবসায়ী বাহু পর্দার আড়াল থেকে লুণ্ঠনকারীদের নীতিগত সুরক্ষা দিয়েছিল।
ভৌত সম্পদে আঘাত: এই পদ্ধতিগত অবক্ষয় কেবল ডিজিটাল পরিসরে থেমে থাকেনি, তা রাষ্ট্রের ভৌত সম্পদকেও গ্রাস করেছে। ২০১৭ সালে শুল্ক গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে ভল্টে রক্ষিত ৯৬৩ কেজি সোনার বিশুদ্ধতা ও ওজনে যে ভয়ংকর হেরফের ধরা পড়ে, তা যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়। ২০১৫ সালের জমা দেওয়া ৮০ শতাংশ খাঁটি সোনার চাকতি রহস্যজনকভাবে ৪৬.৬৬ শতাংশ সংকর ধাতুতে পরিণত হয়। ভল্টের ২২ ক্যারেট সোনা নথিপত্রে ১৮ ক্যারেট দেখিয়ে সরকারের প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ক্ষতির সুযোগ তৈরি করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এহেন গুরুতর অপরাধকে ‘ক্লারিক্যাল মিসটেক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা টিআইবি-র ভাষায় ছিল এক ‘ন্যক্কারজনক আস্থাহীনতা’। এটি মূলত ‘কালেক্টিভ অ্যাকশন’ সমস্যার ধ্রুপদী উদাহরণ, যেখানে একটি সুসংগঠিত ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বৃহত্তর জনস্বার্থকে সহজেই পদদলিত করে।
ব্যাংকিং লুণ্ঠনের ধারাবাহিক উত্থান: ব্যাংকিং খাতে প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠনের শুরু মূলত ২০১১ সালের হলমার্ক কেলেঙ্কারির (৩,৫০০ কোটি টাকা) মাধ্যমে। এটি ছিল অলিগার্কদের একটি ‘পাইলট প্রজেক্ট’। যখন দেখা গেল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীরব, তখন একে একে বেসিক ব্যাংকে শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর ৪,৫০০ কোটি টাকা, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ১,২০০ কোটি, অ্যাননটেক্সের ৫,৫০৪ কোটি ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের ১,০৭৫ কোটি টাকার জালিয়াতি সংঘটিত হয়। ফারমার্স (পদ্মা) ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পরপরই অনিয়মে জড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রকের পূর্বাভাস ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা প্রমাণ করে। ইউনিয়ন ব্যাংকের বিতরণকৃত ৯৫ শতাংশ ঋণ খেলাপিযোগ্য হওয়া এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঘোষিত ৫.১৮ শতাংশ খেলাপির বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে ২৩ শতাংশের বেশি খেলাপি ধরা পড়লেও রহস্যজনকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মালিকানা দখল: লুণ্ঠনের এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পায় ২০১৭ সালে, যখন রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা চাপে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা জোরপূর্বক একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর (এস আলম গ্রুপ) হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিএফআইইউ-এর তথ্যমতে, এই গোষ্ঠীটি সাতটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ২.২৫ লাখ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি করে, যার বড় অংশই আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে। সাম্প্রতিক নাবিল গ্রুপের কেলেঙ্কারি (২০২৩-২৪) এই লুণ্ঠনের ভয়াবহতা প্রমাণ করে; মাত্র ছয় মাসে তিনটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৬,৩৭০ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়, যেখানে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ছিল মাত্র ৩,৬৯০ কোটি টাকা। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক প্রদত্ত ঋণের ৭৫ শতাংশ খেলাপি করে ব্যাংকটিকে দেউলিয়ার পথে নিয়ে যায়। পটপরিবর্তনে পর্ষদ ভেঙে সাবেক প্রতিষ্ঠাতাদের ফেরানো হলেও বিপুল এই মূলধন ঘাটতি পূরণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অলিগার্কিক সিন্ডিকেটের নতুন সংযোজন হিসেবে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি জালিয়াতি ও অস্তিত্বহীন রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ৩,০০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ চতুর্থ বাহু তথা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারির অভাবকে পুনরায় সামনে এনেছে। এটি নিষ্কাশনমূলক ব্যবস্থার সেই চরম স্তর, যেখানে ৪র্থ বাহু হিসেবে নিয়ন্ত্রক নিজেই লুণ্ঠনকারীর পাহারাদার ও ‘রেন্ট-সিকিং’-এর অংশীদার। এর ফলে ১৯টি ব্যাংকের ১.৭১ লাখ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি এবং কারিগরি দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করে যে, সাধারণের আমানত লুণ্ঠিত হলে তা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষাঘাতের এক চরম রূপ, যা সমগ্র অর্থনীতির উৎপাদন সম্ভাবনা রেখাকে সংকুচিত করে দেয়।
অগ্নিগর্ভ বর্তমান: অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্য ও নীতিগত টানাপোড়েন
পাথ ডিপেন্ডেন্সি ও নিয়ন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ পতন: অতীতের লুণ্ঠন বর্তমানের নীতিহীনতাকে উসকে দিয়ে কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে আত্মহত্যার পথে ধাবিত করে, তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে স্পষ্ট। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, আমলাতন্ত্র ও লুটেরা ব্যবসায়ীদের (লৌহ কাঠামোর প্রথম তিন বাহু) যুগলবন্দী বাংলাদেশ ব্যাংককে (চতুর্থ বাহু) একটি বিশৃঙ্খল আখড়ায় পরিণত করেছে। বাইরের অলিগার্কিক চাপ সহ্য করতে গিয়ে সংস্থার অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ব এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর অলিগার্কদের যেসব সেবাদাস কর্মকর্তা দীর্ঘকাল নীরব থেকে লুণ্ঠনে সহায়তা করেছেন, তারাই এখন নিজেদের স্বার্থ ও ক্ষমতা রক্ষায় নবরূপে এজেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সাবেক গভর্নরের একজন ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা প্রমাণ করে, প্রতিষ্ঠানটি কেবল রেগুলেটরি ক্যাপচার নয়, বরং অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্যের কবলে পড়েছে। এটি মূলত একটি গভীর পাথ ডিপেন্ডেন্সি তৈরি করেছে, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেই অলিগার্কির ‘গভীর রাষ্ট্র’ সক্রিয় থেকে যেকোনো মৌলিক সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করছে। যখন লৌহ কাঠামোর চতুর্থ বাহু হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণের আমানতকে এভাবে মুষ্টিমেয় অলিগার্কের হাতে তুলে দেয়, তখন প্রকৃত উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঋণবঞ্চিত হয়। ফলে শিক্ষিত যুবসমাজের জন্য গুণগত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না এবং জাতীয় মানব পুঁজি উৎপাদন সম্ভাবনা রেখার অনেক ভেতরেই অবিন্যস্ত থেকে যায়। এটি অলিগার্কিক কাঠামোর একটি সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব, যা সামষ্টিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন, মব-জাস্টিস ও নতুন অস্থিরতা: সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতার এক নতুন ও ভয়ংকর চিত্র উন্মোচন করেছে। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ পাসের মাধ্যমে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আগের মালিকদের কাছে ফেরার সুযোগ তৈরি হওয়া বা জোরপূর্বক একীভূত করার নীতি ছিল একটি ডুবন্ত নৌকার সাথে ভাসমান নৌকাকে বেঁধে দেওয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকগুলোতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও মব-জাস্টিসের চেষ্টা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার চরম অবনতির নজির। এস আলম নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোতে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের পুনর্বহালের দাবি এবং এর বিপরীতে গ্রাহকদের ক্ষোভ একটি ‘ব্যাংক-রান’ তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নতুন গভর্নরের ঘোষিত ১১ দফা পরিকল্পনা তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও, তথ্যের অসামঞ্জস্যতা এবং শক্তিশালী ‘এন্ড-ইউজ ভেরিফিকেশন’ ছাড়া কেবল সুদের হার পরিবর্তন করে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। যদি ‘রেন্ট-সিকিং’ বা লুণ্ঠনের পথগুলো বন্ধ না করা হয়, তবে সস্তা ঋণ আবারও লুটেরাদের হাতে পৌঁছে পাচার হয়ে যাবে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য’ তৈরি করেছে, যা দূর করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যৎ: কাঠামোগত সংস্কার ও সার্বভৌমত্বের লড়াই
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দণ্ডায়মান। নিষ্কাশনমূলক গহ্বর থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কেবল উপরিভাগের প্রলেপ নয়, অলিগার্কিক শিকড় উপড়ে ফেলে প্রাতিষ্ঠানিক ‘পাথ ডিপেন্ডেন্সি’ ভাঙা আবশ্যক। অলিগার্কির ৪র্থ বাহু বা এই নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি।
প্রথমত, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব: বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মীদের বুঝতে হবে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন নয়। অলিগার্কদের সেবাদাসদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে মানব পুঁজির সঠিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দ্বৈত শাসনের অবসান: ব্যাংক তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা: পাচার রোধে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্যের অসামঞ্জস্যতা দূর করতে হবে। এলসি নিশ্চিতকরণ ও এন্ড-ইউজ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চতুর্থত, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার: এগমন্ট গ্রুপসহ বৈশ্বিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সাথে সমন্বয় করে পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এটি না করলে রেন্ট-সিকিং প্রবণতা বন্ধ হবে না।
পঞ্চমত, স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন: একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করতে হবে যারা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে এবং ঋণের প্রকৃত মালিকদের তথ্য প্রকাশ করবে।
ষষ্ঠত, বিদেশি মিত্রদের সাথে নতুন সমীকরণ: আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেওয়া নীতির বদলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির উপযোগী ও জনবান্ধব চুক্তি জোরদার করতে হবে।
আস্থার পুনর্নির্মাণ
কাঠামোগত উত্তরণে আস্থা পুনরুদ্ধারই হলো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল তারল্য জোগান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী নৈরাশ্য ভাঙার লড়াই। মহামন্দার সময় ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট বলেছিলেন, “ভয়ের একমাত্র জিনিস হলো ভয় নিজেই।” আমানতকারীদের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে যে, তাদের সম্পদ অলিগার্কদের বিলাসিতার খোরাক হবে না। বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি ঋণ অর্থনীতির একটি ‘টাইম বোম্ব’। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সম্পদ ক্রোক করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সংকট কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পুনর্জন্মের লড়াই। সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোর লৌহমুষ্টি ভাঙা ছাড়া কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং আপামর জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও রাষ্ট্রের নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত হতে পারে। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে, বঞ্চনা ও আস্থাহীনতা থেকে জনগণের ক্ষোভ যখন ফুঁসে ওঠে, তখন কোনো অলিগার্কিক শক্তিই তা ঠেকাতে পারে না। একটি স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও বিশ্বমানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গড়ে তোলা হোক অন্যতম জাতীয় অগ্রাধিকার।
মতামত লেখকের নিজস্ব।
লেখক: ড. মো. আবু হাসান সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: hhafij@yahoo.com
- ১রণক্ষেত্র দিল্লি: ভারতের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় আন্দোলনের’ ডাক সিজেপির
- ২মাগুরায় শিশু ধর্ষণ চেষ্টা ও হত্যার দায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড
- ৩ব্লক মার্কেটে লেনদেন ১৮ কোটি টাকার
- ৪গাজীপুরে ২ সন্তানের জননীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ যুবকের বিরুদ্ধে
- ৫বিজিবিকে আরও শক্তিশালী করতে জনবল-প্রযুক্তি-অস্ত্র বাড়ানো হবে
- ৬দর পতনের শীর্ষে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স
- ৭দর বৃদ্ধির শীর্ষে এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড
- ৮ঝুঁকিতে চাঁদপুর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প
- ৯আসাদুজ্জামান কামালকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
- ১০১২শ ফলজ গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ বনবিভাগের বিরুদ্ধে
- ১বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে ৫ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনা
- ২জুলাইয়ের ১৮ দিনে এলো ১৮০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স
- ৩চাঁদপুরে এক কালভার্ট বদলে দেবে ৮ গ্রামের মানুষের জীবন
- ৪মে মাসে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় ধাক্কা
- ৫টাঙ্গাইলে আদিবাসী যুবকের মরদেহ উদ্ধার
- ৬সাতক্ষীরা সীমান্তে প্রায় পঁচিশ লক্ষ টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ
- ৭মোস্ট সাসটেইনেবল কোম্পানি অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ
- ৮প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইএলও মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ, সহযোগিতা জোরদারের আশ্বাস
- ৯প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হলেন রাশেদ খাঁন
- ১০কেশবপুরে দুই দিনব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত





পাঠকের মতামত