
বৈশাখী সূর্যোদয় এবার এক অদ্ভুত দ্বিমুখী বার্তা নিয়ে এসেছে। একদিকে যখন নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার উৎসবমুখর আবহ, ঠিক তখনই নীতিনির্ধারকদের কক্ষগুলোতে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, ডলারের অস্থিরতা এবং এলডিসি উত্তরণের বহুমুখী চাপের এক ধূসর মানচিত্র আঁকা হচ্ছে। এই বৈপরীত্য আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ইঞ্জিনটি এখন এমন এক বাঁকে দাঁড়িয়ে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার ছায়া উৎসবের আলোকেও ম্লান করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান এবং বেতন-কাঠামো নিয়ে জনপরিসরে একটি তীব্র ও মেরুকৃত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে বেতন স্কেল কার্যকরের পর বিগত এক দশকের পুঞ্জীভূত মুদ্রাস্ফীতি সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত মজুরিকে এমনভাবে অবক্ষয়িত করেছে যে, তা বর্তমানে এক ‘নীরব বেতন হ্রাসে’ পর্যবসিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবটি নিছক আর্থিক দাবি বা বাজেটের অঙ্ক মেলানোর বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির এক গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রশ্ন।
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের শেষ সময়ে এই প্রস্তাব আমলে নিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকরের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ দিলেও, চূড়ান্ত বাস্তবায়ন না করেই বিদায় নেয়। এদিকে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বেতনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে তাদের প্রতিশ্রুত কার্ড-ভিত্তিক ভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধ করেছে। উপরন্তু, জ্বালানির উচ্চমূল্যে ভর্তুকি মেটাতে গিয়ে সরকার উল্টো ব্যাংক খাত থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে তহবিল স্থানান্তর ও চরম আর্থিক টানাপোড়েনের এই বহুমুখী চাপ সত্ত্বেও নতুন সরকার বেতন কমিশনের রিপোর্ট পর্যালোচনার জন্য সম্প্রতি একটি সচিব কমিটি গঠন করেছে, যা রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে এই কাঠামোগত সংস্কারের অনিবার্য প্রয়োজনীয়তাকেই স্পষ্ট করে। এই প্রেক্ষাপটে নিবন্ধটি চলমান বিতর্কের গভীরে নেমে বিশ্লেষণ করতে চায়; কেন এই বেতন বৃদ্ধি নিছক ব্যয় নয়, বরং উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান রক্ষা এবং একটি কার্যকর রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত।
বেতন-বিতর্কের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ: বাজার বনাম রাষ্ট্র
সরকারি বেতন বৃদ্ধির আলোচনা উঠলেই জনপরিসরে একটি নিও-লিবারেল বা বাজার-নির্ভর যুক্তি ধেয়ে আসে: “বেসরকারি খাতের মতো উৎপাদনশীলতা না বাড়লে বেতন কেন বাড়বে? জনগণের করের টাকায় এই বেতন বৃদ্ধিতে সায় আছে কি না?” আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক মনে হলেও, রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় এই তুলনাটি তাত্ত্বিকভাবে ভ্রান্ত। রাষ্ট্র কোনো ‘মুনাফা-সর্বোচ্চকারী’ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। বেসরকারি খাতের লক্ষ্য নিছক আর্থিক মুনাফা, যেখানে উৎপাদনশীলতা (বিক্রয় বা আয়) মাপা সহজ। কিন্তু নোবেলজয়ী ডগলাস নর্থ (১৯৯০) রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করেছেন এমন এক সার্বভৌম সত্তা হিসেবে, যা সমাজের ‘খেলার নিয়ম’ তৈরি করে। জননিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কিংবা দুর্যোগকালীন সেবার মতো জনপণ্যের উৎপাদনশীলতা বাজারের ইউনিট-প্রাইস বা তাৎক্ষণিক মুনাফার ভাষায় মাপা অসম্ভব। একজন শিক্ষক কতজন সুনাগরিক গড়লেন বা একজন পুলিশ কর্মকর্তা কতটি অপরাধ থামালেন, তার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। যে প্রতিষ্ঠান নিজেই বাজারের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য কাজ করে, তাকে বাজারের মাপকাঠিতে বিচার করা তাত্ত্বিকভাবেই বিভ্রান্তিকর। এখানেই আসে ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। বেসরকারি খাতে কর্মীরা চাইলেই ‘এক্সিট অপশন’ ব্যবহার করে চাকরি বদলাতে পারেন। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীরা বদলি, কঠোর আচরণবিধি, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং ধর্মঘট না করার আইনি শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এই অতিরিক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতার আংশিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ বেতন-কাঠামো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও নীতিগত দায়িত্ব।
জনপরিসরের আপত্তির খণ্ডন
জনপরিসরে বেতন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মূলত চারটি আপত্তি দেখা যায়, যা রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামোগত দ্বন্দ্বকে আড়াল করে। প্রথমত, মেধার অবমাননা ও নৈতিক স্ববিরোধিতা: সমাজ তার সেরা মেধাবীদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বেছে নেয়, অথচ দীর্ঘমেয়াদে তাদের অমর্যাদাকর মজুরিতে আটকে রাখে। একদিকে উচ্চমানের সেবার প্রত্যাশা, অন্যদিকে জীবনযাত্রার সংকট; এই নেতিবাচক প্রণোদনা মেধাবীদের নৈতিকভাবে পরাস্ত করে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে। দ্বিতীয়ত, হিংসার অপরায়ন: জনপরিসরের ক্ষোভ সাধারণত করফাঁকিবাজ, ঋণখেলাপি বা অলিগার্কিক লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠীর দিকে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই ক্ষোভ সুকৌশলে সীমিত দর-কষাকষির ক্ষমতার অধিকারী সরকারি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, জাতীয় মজুরি নীতি: ‘সবার মজুরি বাড়ছে না, তাই সরকারি বেতনও বাড়বে না’; এই যুক্তি বৈষম্যকে স্থায়ী করে। রাষ্ট্র যখন তার কর্মীদের সম্মানজনক বেতন নিশ্চিত করে, তখনই সে বেসরকারি খাতের ওপর মানবিক মজুরি নিশ্চিত করার নৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জন করে। চতুর্থত, করের টাকার সায়: নাগরিকদের মধ্যে করের টাকা নিয়ে যে অসন্তোষ দেখা যায়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে বেতনের অঙ্ক নয়, বরং সেবার গুণগত মান। এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ন্যূনতম চাহিদা অপূর্ণ রেখে কিংবা তাদের আর্থিক অনিশ্চয়তায় রেখে বাজেট সংকোচনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক হয়। কারণ, তখন কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে নাগরিককে প্রায়শই ‘ঘুষ’ নামক এক অলিখিত ‘দ্বিতীয় কর’-এর বোঝা বহন করতে হয়।
প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যা
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুতর তাত্ত্বিক দিকটি হলো ‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট’ সমস্যা। আদর্শ ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ও জনগণ হলো ‘প্রিন্সিপাল’ (মালিক), আর কর্মচারীরা হলেন ‘এজেন্ট’ (প্রতিনিধি)। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের দেওয়া বেতন জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তলানিতে ঠেকে, তখন এই সম্পর্কে বিকৃতি ঘটে। কর্মচারীরা তখন বৈধ বেতনের বদলে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিকল্প শক্তির উৎস খোঁজে। এখানেই লুণ্ঠনকারী অলিগার্করা প্রবেশ করে। তারা কর্মচারীদের অনানুষ্ঠানিক সুবিধা, ঘুষ বা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের প্রলোভন দিয়ে রাষ্ট্রের ভেতর নিজেদের ‘পকেট এজেন্ট’ তৈরি করে। ফলে রাষ্ট্রের এজেন্টরা জনস্বার্থের বদলে সংগঠিত রেন্ট-সিকারদের স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়। বেতন যখন জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত থাকে না, তখন আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের চেয়ে লুণ্ঠনকারীদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই পক্ষাঘাত থেকে মুক্তির প্রধান তাত্ত্বিক হাতিয়ার হলো ‘দক্ষতা-মজুরি তত্ত্ব’। অর্থনীতিবিদ শাপিরো ও স্টিগলিটজ (১৯৮৪) দেখিয়েছেন, যখন নিয়োগকর্তা কর্মীর ওপর পূর্ণ নজরদারি করতে পারেন না, তখন বাজার-দরের চেয়ে কিছুটা বেশি মজুরি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে কর্মীর জন্য চাকরি হারানোটা এক বিশাল শাস্তির সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চ মজুরি একজন কর্মচারীর জন্য ঘুষ না নেওয়া এবং অলিগার্কদের আদেশ অমান্য করাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলে। এটি মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘সেফটি-বাফার’।
টেম্পোরাল ক্যাপচার: মস্তিষ্কের সৃজনশীল সময়ের লুণ্ঠন
নোবেলজয়ী গ্যারি বেকারের ‘সময়ের বণ্টন তত্ত্ব’ অনুযায়ী, সময় হলো এক মূল্যবান পুঁজি। কিন্তু রাষ্ট্র যখন তার মেধাবী কর্মচারীদের উপযুক্ত মজুরি দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কর্মচারীদের সৃজনশীল সময়টুকু জীবনযুদ্ধের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। একে আমি বলি ‘টেম্পোরাল ক্যাপচার’। মাসের মাঝামাঝি থেকেই যখন সন্তানের স্কুলের বেতন বা বাসা ভাড়া মেলাতে হিমশিম খেতে হয়, তখন নীতি-উদ্ভাবন বা প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্থিরতা বা ‘ব্রেইন-স্পেস’ অবশিষ্ট থাকে না। রাষ্ট্রের সবচেয়ে মেধাবী অংশটি উদ্ভাবনী চিন্তা বাদ দিয়ে নিছক টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামো কর্মচারীদের এই মানসিক বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সময়টুকু বাজার থেকে পুনরায় কিনে নেওয়ার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। একইভাবে, পেনশনে শতভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাবকেও কেবল বৃদ্ধভাতা ভাবা ভুল; এটি জীবনের শ্রেষ্ঠ তিন-চার দশক জনসেবায় বিনিয়োগ করার ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচার, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধাবীদের জন্য একটি ইতিবাচক ‘ইন্টারজেনারেশনাল সিগন্যাল’ তৈরি করে।
উন্নয়ন ব্যয়ের শবযাত্রা: সরকারি ইঞ্জিনের চরম দুর্বলতা
বেতন বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দিতে গেলে একটি অস্বস্তিকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হয়। বাংলাদেশের সরকারি ব্যয়ের কাঠামো আজ ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের চেয়ে বর্তমান সামলাতেই বেশি খরচ করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের মোট ব্যয় জিডিপির মাত্র ১২.৭ শতাংশ। আমাদের এই মোট ব্যয় নেপাল (২৩ শতাংশ), লাওস (১৮ শতাংশ) বা কম্বোডিয়ার (১৮ শতাংশ) মতো স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম; যা মূলত আমাদের ‘গভর্নমেন্ট ইঞ্জিন’-এর চরম দুর্বলতার প্রমাণ। এই ১২.৭ শতাংশ ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ৬ শতাংশ (রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল), চলতি ব্যয় ৫.৮ শতাংশ (বেতন, সুদ, ভর্তুকি) এবং অন্যান্য ০.৯ শতাংশ। কিন্তু আসল সংকট লুকিয়ে আছে ব্যয়ের গুণগত মানে। একটি তাত্ত্বিক ধ্রুব সত্য মনে রাখা জরুরি: সকল মূলধনী ব্যয়ই উন্নয়ন ব্যয় হলেও, সকল উন্নয়ন ব্যয় মূলধনী ব্যয় নয়। নতুন সড়ক, সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলো ‘মূলধনী ব্যয়’, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তি দেয়। কিন্তু উন্নয়ন বাজেটের একটি বিশাল অংশ চলে যায় নিছক প্রকল্প চালাতে; পরামর্শক ফি, অতিরিক্ত সংশোধনী কাজ, যানবাহন, মেরামত ও প্রশাসনিক খরচ, যা নতুন সম্পদ তৈরি করে না। এই বাস্তবতায় কাগজে-কলমে উন্নয়ন ব্যয় ৬ শতাংশ দেখালেও, বাস্তবে প্রকৃত মূলধনী বিনিয়োগের অংশটি আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হয়ে জিডিপির মাত্র ১.৯ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিপরীতে, রাষ্ট্রের সামগ্রিক চলতি ব্যয় দ্রুত বেড়ে ৮.৭ শতাংশে পৌঁছেছে (যা ২০২৬-এ ৯.৫ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে)। অর্থাৎ, চলতি ব্যয়ের এই স্ফীত পেট যেন উন্নয়নের সবুজ ঘাস চিবিয়ে খেয়ে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগকে গ্রাস করছে। প্রোডাকশনাল বিনিয়োগের অভাবে রাষ্ট্র আজ মূলত একটি অনুৎপাদনশীল রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের নিচে আটকে আছে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে আত্মঘাতী।
দুই সংকটের সংযোগস্থল: বেতন বৃদ্ধি কি চলতি ব্যয় বাড়াবে?
এই বাস্তবতায় একটি যৌক্তিক প্রশ্ন ওঠে: কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো তো চলতি ব্যয়েরই অংশ, তাহলে বেতন বৃদ্ধি কি চলতি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়িয়ে মূলধনী বিনিয়োগকে আরও সংকুচিত করবে না? প্রথম নজরে তাই মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীরে গেলে দেখা যায়, নিম্ন বেতনের কারণেই উন্নয়ন প্রকল্পের এই হাল। কর্মচারীরা যখন টেম্পোরাল ক্যাপচারে বন্দি থাকে এবং তাদের মধ্যে ‘কাঠামোগত ক্ষুধা’ থাকে, তখন তারা উন্নয়ন প্রকল্পের ভেতর দিয়ে অনানুষ্ঠানিক ‘রেন্ট’ বা উপরি আয়ের পথ খোঁজে। একটি সাধারণ সেতু নির্মাণে প্রকৃত খরচের চেয়ে পরামর্শক ফি, ইচ্ছাকৃত বিলম্ব এবং দুর্নীতিজনিত ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, কর্মচারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা সরাসরি উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মানকে ধ্বংস করে।
সমাধানটি তাই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট: উন্নয়ন বাজেটের ভেতর থেকে অনুর্বর প্রশাসনিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত খরচ কমাতে হবে। যে ৬ শতাংশ উন্নয়ন ব্যয়ের সিংহভাগ অপচয় হচ্ছে, সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সাশ্রয়কৃত অর্থ বেতন বৃদ্ধি ও প্রকৃত মূলধনী বিনিয়োগে রূপান্তর করতে হবে। সচ্ছল ও নিরাপদ কর্মচারী তখন অলিগার্কদের চাপ উপেক্ষা করে প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সাহস পাবেন।
মুদ্রাস্ফীতির ‘মিথ’ এবং রাজস্ব সক্ষমতার প্রকৃত চিত্র
বেতন বৃদ্ধির বিরোধিতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ‘ওয়েজ-প্রাইস স্পাইরাল’ বা মুদ্রাস্ফীতির মিথ। বলা হয়, বেতন বাড়লে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনৈতিক গবেষণা এই সরল সমীকরণকে ভুল প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির মূল চালিকাশক্তি হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয়, এবং বিনিময় হারের অস্থিরতা; সরকারি বেতন বিল এর প্রধান চালক নয়। বরং, সরকারি কর্মচারীদের হাতে বাড়তি টাকা গেলে তা সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে (খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা) সঞ্চালিত হয়। এটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়িয়ে উৎপাদনশীল খাতকে সচল করে।
রাজস্ব সক্ষমতার প্রশ্নেও ‘তহবিল নেই’ যুক্তিটি ধোপে টেকে না। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে প্রায় সর্বনিম্ন। প্রতি বছর করছাড়, ট্যাক্স-এক্সেমশন ও ঋণখেলাপির মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ‘অলিগার্কিক লিকিং’-এর শিকার হয়, তার একটি ক্ষুদ্র অংশ দিয়েই বেতন কাঠামো মর্যাদাপূর্ণ করা সম্ভব। প্রকৃত সংকট তহবিলের অভাব নয়, বরং রাজস্ব আদায়ের অদক্ষতা। ডিজিটাল ট্যাক্সেশন ও এআই-চালিত কর প্রশাসনের মাধ্যমে বড় করফাঁকিবাজদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাষ্ট্রের আয় বহুগুণ বাড়বে।
নতুন সামাজিক চুক্তি: সক্ষম রাষ্ট্রের রূপরেখা
২০২৪ সালের নোবেলজয়ী ড্যারন এসেমোগলু ও জেমস রবিনসন তাঁদের তত্ত্বে দেখিয়েছেন, ‘নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান’ মূলত ক্ষুদ্র এলিটগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে, আর ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান’ সাধারণ নাগরিকের সুযোগ বিস্তৃত করে। আমরা বর্তমানে একটি নিষ্কাশনমূলক ফাঁদের দিকে ধাবিত হচ্ছি। অর্থনীতিবিদ আলবার্ট হার্শম্যানের (১৯৭০) ভাষায়, প্রতিষ্ঠানের এমন অবনতি ঘটলে মানুষের হাতে দুটি পথ থাকে: ‘এক্সিট’ (ছেড়ে যাওয়া) অথবা ‘ভয়েস’ (ভেতরে থেকে সংস্কারের দাবি তোলা)। নিম্ন মজুরির কারণে আজ আমাদের মেধাবীরা দেশ ছাড়ছেন, নয়তো সিস্টেমের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-বিতর্ক তাই কেবল বাজেটের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’ পুনর্লিখনের ঐতিহাসিক সুযোগ। এই চুক্তিতে রাষ্ট্র তার কর্মচারীদের আর্থিক ও মানসিক মুক্তি নিশ্চিত করবে; বিনিময়ে কর্মচারীরা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিটি টাকাকে প্রকৃত মূলধনী বিনিয়োগে রূপান্তরিত করে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা সৃষ্টি করবেন। আর সংগঠিত নাগরিকসমাজ ও সেবা-গ্রহীতারা ‘ভয়েস’-এর তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে নিয়মিত সামাজিক মূল্যায়নের মাধ্যমে এই সমীকরণকে ভারসাম্য দেবে।
আজ বহুমুখী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে সবচেয়ে সোজা প্রশ্ন: সরকার কি নোবেলজয়ী ফিলিপ অ্যাগিওন ও পিটার হাওইট-এর ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ অনুযায়ী পুরোনো অদক্ষ কাঠামো ভেঙে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির স্থাপত্য গড়ার সাহস দেখাতে পারবে? যৌক্তিক বেতন বৃদ্ধি সেই স্থাপত্যের একটি ইট মাত্র। পুরো ভবন গড়তে প্রয়োজন উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মানে বিপ্লব, রাজস্ব ফাঁকি রোধ করে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং অলিগার্কিক পক্ষাঘাত থেকে মুক্ত একটি সক্ষম রাষ্ট্রযন্ত্র। টেম্পোরাল ক্যাপচার থেকে মুক্ত একটি দক্ষ, বুদ্ধিদীপ্ত ও সৎ আমলাতন্ত্রই কেবল পারে লুণ্ঠনতন্ত্র ভেঙে করের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সক্ষম ও ন্যায়ভিত্তিক আগামীর বাংলাদেশ গড়তে।
মতামত লেখকের নিজস্ব
লেখক: ড. মো. আবু হাসান,সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: hhafij@yahoo.com
- ১চাঁদপুরে মসজিদের সম্পত্তি ভোগ করার অভিযোগ, মুসল্লিদের বিক্ষোভ
- ২একই পরিবারের জন্মান্ধ ১১ জনের মধ্যে তিন জনের আলো ফিরেছে
- ৩চাঁদপুরে সাংবাদিকদের এআই ও ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয়ক কর্মশালা
- ৪গাজীপুরে আবাসিক হোটেল থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার
- ৫ফিলিপাইন ব্ল্যাক আখ চাষে ১০ লাখ আয়ের স্বপ্ন
- ৬রোগ শনাক্তে ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে স্বাস্থ্যকর্মীরা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- ৭আকস্মিক বন্যায় কৃষকের স্বপ্ন মূহুর্তেই তছনছ
- ৮নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানকে র্যাঙ্ক ব্যাজ পরালেন প্রধানমন্ত্রী
- ৯ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিংয়ের বোর্ড সভা ২৯ জুলাই
- ১০আজ মেগাসিটি ঢাকার বায়ু মাঝারিমানের
- ১লোকসানী শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর এক মাসে বেড়েছে ৬৮ শতাংশ
- ২‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে বৈদেশিক সম্পর্ক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- ৩পারিবারিক বিরোধের জেরে তায়েবাকে হত্যার অভিযোগ, ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
- ৪কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন এমওপি সার কিনবে সরকার
- ৫একনেক সভায় ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন
- ৬মানিকগঞ্জে বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান
- ৭অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ৪৭ লাখ
- ৮টেকসই অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ
- ৯এমপি গাজী নজরুলকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার
- ১০শ্রীপুরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নিজ অর্থায়নে স্থানীয়দের ড্রেন নির্মাণ





পাঠকের মতামত