মোঃ আনিসুর রহমান (সজল)
প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬ ৮:০২ পিএম

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তার নেপথ্যে কেবল ভূ-রাজনীতি নয়, বরং লুকিয়ে আছে এক গভীর ও অন্ধকার মনস্তত্ত্ব। দীর্ঘকাল ধরে ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কৌশল ছিল ইরানকে একটি ‘ভবিষ্যতের সমস্যা’ হিসেবে জিইয়ে রাখা। পশ্চিমা বিশ্বের প্রচলিত ধারণা ছিল, ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন থেকে কয়েক দশক দূরে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ভারে তারা পঙ্গু হয়ে থাকবে। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই ‘ধীরগতির কৌশল’ থেকে সরে এসে কেন সরাসরি যুদ্ধের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে?
এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ সম্ভবত তেহরানের সেন্ট্রিফিউজে নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বের আলমারিতে লুকিয়ে থাকা কঙ্কালগুলোর মধ্যে নিহিত।

১. অনুঘটক: এপস্টাইন ফাইলস ও বৈশ্বিক অভিজাতদের আতঙ্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজার পেছনে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত যে তত্ত্বটি উঠে আসছে, তা হলো এপস্টাইন ফাইলস। জেফরি এপস্টাইনের সেই কুখ্যাত নথিপত্র যত উন্মোচিত হচ্ছে, ততই কেঁপে উঠছে বিশ্ব রাজনীতির সিংহাসন। এই নথিতে এমন সব ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে আছে, যারা বিশ্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক।
• রাজনৈতিক নক্ষত্রপতন: ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ক্লিনটন পরিবারের মতো রাঘববোয়ালদের নাম বারবার এই নর্দমায় টেনে আনা হচ্ছে। তাদের কয়েক দশকের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন ধুলোয় মিশে যাওয়ার উপক্রম।
• অর্থনৈতিক টাইটান ও বৈশ্বিক নেতা: বিশ্বের প্রভাবশালী বিলিয়নেয়ার এবং নরেন্দ্র মোদীর মতো বিশ্বনেতাদের নাম বা সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যে গুঞ্জন তৈরি হয়েছে, তা তাদের সযত্নে লালিত ‘ক্লিন ইমেজ’ বা ভাবমূর্তির জন্য এক মরণকামড়।
• জটিলতার নক্ষত্র: এই নথিপত্র কেবল যৌন কেলেঙ্কারি নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক ব্ল্যাকমেইল নেটওয়ার্কের দলিল। মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এই ‘স্পটলাইট’ থেকে নিজেদের বাঁচাতে মরিয়া।

২. ধোঁয়াশায় ঢাকা রণকৌশল: যুদ্ধ যখন রক্ষাকবচ
রাজনীতির ময়দানে একটি পুরনো প্রবাদ আছে—”যদি কোনো সত্যকে হত্যা করতে না পারো, তবে তাকে বড় কোনো কোলাহলের নিচে চাপা দাও।” ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা সেই ‘কোলাহল’ তৈরির মোক্ষম হাতিয়ার।
• সংবাদ প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ: যখন আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন শুরু হয়, তখন পত্রিকার পাতায় এপস্টাইন বা শিশু পাচার চক্রের খবর আর প্রধান শিরোনাম থাকে না। জনমানসের চিন্তা “বিমানে কে ছিল?” থেকে সরে গিয়ে “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি আসন্ন?”—এই আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
• জরুরি ক্ষমতা ও সেন্সরশিপ: যুদ্ধকালীন সময়ে সরকারগুলো তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। যেকোনো ভিন্নমতকে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়ে দমন করা সহজ হয় এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে নজরদারি কঠোর করা হয়, যাতে কেলেঙ্কারির নথিগুলো ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
• সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের মুনাফা: এই সংঘাত একদিকে যেমন অপরাধীদের আড়াল করে, অন্যদিকে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পকেটে ট্রিলিয়ন ডলার যোগান দেয়। অর্থাৎ, অভিজাতরা তাদের অপরাধ আড়াল করার পাশাপাশি এই যুদ্ধ থেকে মুনাফাও লুটছে।

৩. মানবিক মূল্য ও ইরানের আধ্যাত্মিক প্রতিরোধ
এই যুদ্ধের ট্র্যাজেডি হলো, এর ‘ক্যাসাস বেলি’ বা যুদ্ধের কারণটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম। কয়েকশ ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে আইনি বিচারের হাত থেকে বাঁচাতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক যুগের ‘দানব’রা নিজেদের আদালতের কাঠগড়ায় দেখার চেয়ে বিশ্বকে অগ্নিপিণ্ডে পরিণত করাকে শ্রেয় মনে করছে।
কিন্তু ইরানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ইরান আজ এক অসম যুদ্ধের মুখোমুখি। তাদের চারপাশে মোনাফেকদের ভিড় এবং সামনে পরাশক্তি কাফেরদের আস্ফালন। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো—আবেগ দিয়ে নয়, যুদ্ধ চলে কৌশলে। ইরান আজ একা লড়ছে, কারণ পরাশক্তিরা যখন অন্যায় করে, তখন পৃথিবী ভয়ে চুপ থাকে।
ইরানের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন হলেও একটি বিষয় পশ্চিমা শক্তিরা বারবার ভুলে যায়—ইরানিরা এমন এক জাতি যারা আত্মসমর্পণকে মৃত্যুর চেয়ে বেশি অসম্মানজনক মনে করে। তারা স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে, তবুও আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করবে না।

উপসংহার
এই যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, এটি ইরানের জন্য একটি সম্মানের লড়াই। পরাশক্তির দম্ভের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এবং শহীদি তামান্না নিয়ে লড়াই করাটা বর্তমান বিশ্বের জন্য একটি বড় শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নির্দেশিত চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং রণকৌশল যদি তারা অনুসরণ করে, তবে আল্লাহর কুদরত তাদের ওপর ছায়া দেবেই। মাথা নত করে বেঁচে থাকার চেয়ে সম্মানের মৃত্যু যে হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ, ইরান আজ বিশ্বকে সেই সত্যই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমাদের দোয়া ও সমর্থন থাকবে সেই সত্যের লড়াকুদের প্রতি।

 

মোঃ আনিসুর রহমান (সজল)
অবসরপ্রাপ্ত লেঃকর্নেল
সামরিক বিশ্লেষক, লেখক ও সাহিত্যিক।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ব্যাংক ঋণ নির্ভর বাজেট: স্বস্তির আড়ালে বাড়ছে অর্থনীতির ঝুঁকি

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকারের ঋণ গ্রহণের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ...

অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি বাংলাদেশ ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষের ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী হুমকির মুখে, জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা

ঢাকা — আজ সকালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নাটকীয় বৃদ্ধি, তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সমন্বিত হামলা এবং পরবর্তীতে ইরানের ...

সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা: গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ ও জাতীয় প্রত্যয়

জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক আত্মার পরিচায়ক, জনগণের ...

পাঁচ শরিয়াহ ব্যাংক একীভূতকরণ: ‘বেইল-ইন’ ‘অবসায়ন’ নাকি ‘একত্রীকরণ’?

মোঃ খায়রুল হাসান: ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এর অধীনে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ...

ভ্লাদিমির পুতিন কি সত্যিই মুসলিম উম্মার পাশে আছে ও থাকবে?

ভ্লাদিমির পুতিন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চে একটি শক্তিশালী চরিত্র হিসেবে পরিচিত। ...