ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬ ৪:৫৮ পিএম

২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বিতর্কিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ দেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায়। এই চুক্তিটি এমন এক সন্ধিক্ষণে সম্পাদিত হয়েছিল যখন বাংলাদেশ তার ১৩তম সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে দাঁড়িয়ে ছিল, যা এর সময়জ্ঞান এবং নৈতিক বৈধতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই চুক্তির পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা শর্তাবলী এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণ করা কেবল একটি একাডেমিক দায়িত্ব নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এটি একটি অপরিহার্য জাতীয় কর্তব্য। এই চুক্তিটি কেবল পণ্যের আদান-প্রদান নয়, বরং আগামী ১৫ বছরের জন্য বাংলাদেশের বাজারকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘লক-ইন’ করেবে। ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য এবং ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির যে প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ দিয়েছে, তা কেবল একটি বাণিজ্যিক সংখ্যা নয়, বরং এটি দেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার ওপর একটি সুপরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প, বিশেষ করে পোশাক, কৃষি, ঔষধ ও জ্বালানি খাত কীভাবে একটি অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে, তা বুঝতে গেলে আমাদের এর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিকই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

রাজনৈতিক অর্থনীতির তাত্ত্বিক কাঠামো:

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে যে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল, বর্তমান মার্কিন বাণিজ্য নীতি তা থেকে সরে এসে উগ্র দ্বিপাক্ষিকতাবাদের দিকে ঝুঁকেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ‘রেসিপ্রোসিটি’ বা পারস্পরিক বিনিময়ের যে ধারণাটি প্রচার করছে, তা আসলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর নিজের অর্থনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র। ডগলাস নর্থের ‘লিমিটেড অ্যাকসেস অর্ডার’ (সীমিত সুযোগের সমাজ) অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্রে যখন গুটিকয়েক অলিগার্ক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদী জনস্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের জটিল আন্তর্জাতিক চুক্তিতে লিপ্ত হয়। এই চুক্তির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে যে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার মূল ম্যান্ডেট ছিল একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া, তারা একটি বৈশ্বিক শক্তির কাছে সার্বভৌমত্ব-সংকটের পরিচয় দিয়েছে। রড্রিকের ‘পলিসি স্পেস’ ধারণাটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রড্রিকের মতে, প্রতিটি দেশের নিজস্ব উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট নমনীয়তা বা স্বাধীনতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই চুক্তিটি বাংলাদেশের সেই নীতিনির্ধারণী জায়গাকে এমনভাবে সংকুচিত করছে যে, নির্বাচিত সরকার চাইলেও নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারবে না। একে ডগলাস নর্থের ভাষায় ‘পাথ ডিপেন্ডেন্সি’ বলা হয়, যেখানে একটি প্রাথমিক ভুল সিদ্ধান্ত বা চুক্তি রাষ্ট্রকে এমন একটি পথে পরিচালিত করে যেখান থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে দাঁড়ায়।

চুক্তির কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ:

এই চুক্তির প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ বেশ বড় অংকের আমদানির দায়ভার গ্রহণ করেছে। কৃষি খাতে গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা আমদানির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি খাতে আগামী ১৫ বছরের জন্য (২০২৬-২০৪১) প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এলএনজি ও শিল্প পণ্য ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ২.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে মার্কিন বোয়িং বিমান ও এর যন্ত্রাংশ ক্রয়ের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শিল্প পণ্যের ক্ষেত্রে রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং আইসিটি পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে হবে। চুক্তির প্রাথমিক আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক হ্রাস। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশি পণ্যে ২০% ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ আরোপিত হয়। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তিতে তা সামান্য কমিয়ে ১৯% করা হয়েছে, প্রথম দৃষ্টিতে বিজয় মনে হলেও রাজনৈতিক অর্থনীতির বিচারে এটি নগণ্য ছাড় মাত্র। যেখানে বাংলাদেশ ৪,৫০০টি পণ্যের ওপর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক প্রত্যাহার করছে এবং ভবিষ্যতে আরও ২,২১০টি পণ্যের শুল্ক কমাতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ১ শতাংশ শুল্ক ছাড় একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ে এক বিরাট ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। সিপিডি-র প্রাক্কলন অনুযায়ী, এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে বাংলাদেশ। চুক্তির ধারাগুলোতে কেবল শুল্ক নয়, বরং অ-শুল্ক বাধা অপসারনের নামে বাংলাদেশের সার্বভৌম রেগুলেটরি কাঠামোকে মার্কিন মানদণ্ডের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশকে এখন থেকে মার্কিন ফেডারেল মোটর যান নিরাপত্তা ও নির্গমন মানদণ্ড গ্রহণ করতে হবে এবং মার্কিন এফডিএ এর সনদকে সরাসরি স্বীকৃতি দিতে হবে। এটি মূলত বাংলাদেশের নিজস্ব গুণগত মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কর্তৃত্ব কমিয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে একটি অবারিত সুযোগ করে দেওয়া।

তৈরি পোশাক শিল্প:

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক এই চুক্তির মাধ্যমে একটি জটিল সমীকরণের সম্মুখীন হয়েছে। চুক্তির পর রেসিপ্রোকাল শুল্ক ১ শতাংশ কমানো হয়েছে এবং একটি কোটা ভিত্তিক মেকানিজমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভলিউমের পণ্যে শূন্য শুল্কের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তবে তার জন্য প্রধান শর্ত হলো উৎপাদনে মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ তুলা আমদানির জন্য ভারতের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল, যারা বাংলাদেশের মোট তুলা আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশি স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলো ভারতের সস্তা কাঁচামালের পরিবর্তে তুলনামূলক ব্যয়বহুল মার্কিন তুলা ও লজিস্টিকসের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের স্থানীয় সুতা ও কাপড় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হবে এবং রপ্তানি মুনাফায় টান পড়বে। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় ‘এম্পায়ার অফ কটন’ এর আধুনিক সংস্করণ, যেখানে কাঁচামাল থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলটি একটি সুনির্দিষ্ট শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে।

কৃষি খাত:

এই চুক্তির অন্যতম অন্ধকার দিক হলো বাংলাদেশের কৃষি খাতের ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব। চুক্তির শর্তানুযায়ী, বাংলাদেশকে বছরে অন্তত ৭ লাখ টন গম এবং সাড়ে ২৬ লাখ টন সয়াবিনসহ প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে হবে। মার্কিন কৃষকরা তাদের সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি পায়, যার ফলে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে কৃত্রিমভাবে সস্তায় পাওয়া যায়। এই সস্তা গম, ভুট্টা ও সয়াবিন যখন কোনো শুল্ক ছাড়াই বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে, তখন বাংলাদেশের স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে না। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক ক্ষতি নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি। যদি দেশীয় কৃষকরা ভুট্টা বা গম চাষে নিরুৎসাহিত হয়, তবে বাংলাদেশ চিরতরে মার্কিন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক অর্থনীতির ‘ডাম্পিং’ তত্ত্ব অনুযায়ী, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় সস্তায় পণ্য সরবরাহ করে টার্গেট করা দেশের স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়, যাতে পরবর্তীতে তারা একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই চুক্তিটি সেই তত্ত্বেরই এক বাস্তব প্রয়োগ বলে মনে হচ্ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা:

জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অঙ্গীকারটি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলবে। কাতার বা ওমানের সাথে করা বিদ্যমান চুক্তিগুলো ছিল দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং মূলত বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু মার্কিন কোম্পানি ‘আর্জেন্ট এলএনজি’-র সাথে স্বাক্ষরিত এই ১৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিটি অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমত, এই প্রকল্পটি এখনও নির্মাণাধীন এবং এর সরবরাহ শুরু হতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, যা সরবরাহের নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দ্বিতীয়ত, পেট্রোলিয়ামের বা ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্যের সাথে এই জ্বালানির দামের যে লিঙ্কেজ রাখা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের ঝুঁকি তৈরি করবে। তৃতীয়ত, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করছে, যেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সাথে একাত্ম হওয়ার এক ধরনের অলিখিত শর্ত কাজ করে। এটি বাংলাদেশের জন্য ‘অপরচুনিটি কস্ট’ বৃদ্ধি করছে। ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো দেশ থেকে আরও সস্তায় জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশ এই চুক্তির কারণে সেই সুযোগ নিতে পারবে না।

ঔষধ শিল্প ও মেধা স্বত্ব:

বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প বা ফার্মা সেক্টর বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস ওয়েভারের অধীনে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত পেটেন্ট ছাড় ভোগ করছে, যা একে সস্তায় জেনেরিক ঔষধ উৎপাদনের সক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান মার্কিন চুক্তিতে মেধা স্বত্ব সংরক্ষণ এবং ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ সংক্রান্ত যে কঠোর ধারাগুলো রয়েছে, তা বাংলাদেশের এই ওয়েভার সুবিধাকে পরোক্ষভাবে দুর্বল করতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ মার্কিন এফডিএ-এর অনুমোদনপ্রাপ্ত ঔষধ ও মেডিকেল ডিভাইসগুলোকে সরাসরি স্বীকৃতি দিতে বাধ্য। এর ফলে মার্কিন বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চুক্তিতে যদি এমন কোনো ‘ডেটা এক্সক্লুসিভিটি’ শর্ত থাকে যা জনসমক্ষে আনা হয়নি, তবে বাংলাদেশের জেনেরিক কোম্পানিগুলো পেটেন্ট করা ঔষধের কপি তৈরি করতে পারবে না। এটি কেবল ফার্মা শিল্পের ক্ষতি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনরক্ষাকারী ঔষধের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফার্মা খাত এখন বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি উদীয়মান উৎস, কিন্তু এই চুক্তি সেই অগ্রযাত্রাকে মার্কিন স্বার্থের বলয়ে বন্দি করে ফেলছে।

সাংবিধানিক সংকট ও অন্তর্বর্তী সরকার:

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা আমি মনে করি এর আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল, যার মূল দায়িত্ব ছিল একটি নির্বাচন আয়োজন করা। সংবিধানের কোথাও উল্লেখ নেই যে, একটি অ-নির্বাচিত সরকার এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে পারবে যা পরবর্তী ১০-১৫ বছরের নির্বাচিত সরকারের নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করবে। সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উত্থাপন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপটে কোনো সংসদ না থাকায় এই চুক্তিটি কোনো প্রকার জন-পর্যালোচনা বা বিতর্ক ছাড়াই স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি একটি মারাত্মক ‘গণতান্ত্রিক ঘাটতি’। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের চুক্তি ‘আলট্রা ভায়ার্স’ বা ক্ষমতার বহির্ভূত হতে পারে। একটি বিদায়ী সরকার কীভাবে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এমন একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়, তা নৈতিকতার বিচারেও অগ্রহণযোগ্য।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং চুক্তির নৈতিক ভিত্তির পতন:

এই চুক্তির ভাগ্য নাটকীয়ভাবে বদলে যায় ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘গ্লোবাল ট্যারিফ’ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কেবল মার্কিন কংগ্রেসের হাতে সংরক্ষিত, প্রেসিডেন্টের একতরফাভাবে এটি ব্যবহারের কোনো অধিকার নেই। এর ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যারা চাপের মুখে এই চুক্তিতে সই করেছিল, তাদের এখন চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন বা প্রত্যাহারের একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস ইতিমধ্যে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্য ল অফ ট্রিটিজ এর ৬২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেহেতু মার্কিন শুল্কের সেই ‘আইনি তলোয়ার’ এখন আর কার্যকর নয়, তাই বাংলাদেশ যুক্তি দিতে পারে যে চুক্তির বাণিজ্যিক ও আইনি প্রেক্ষাপট মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

অলিগার্কি, ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি ও উত্তরণের পথ:

কেন একটি রাষ্ট্র নিজের স্বার্থের পরিপন্থী এমন চুক্তিতে লিপ্ত হয়? উত্তর লুকিয়ে আছে অলিগার্কিক স্বার্থের সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোয়। এই কাঠামোর সাতটি বাহু সম্মিলিতভাবে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। প্রথম বাহু হলো অন্তর্বর্তী সরকার নিজেরা: মেয়াদের শেষে এসে তারা একটি বড় আন্তর্জাতিক শক্তির আশীর্বাদ মাথায় দিয়ে বিদায় নিতে চেয়েছে। দ্বিতীয় বাহু হলো প্রতিরক্ষা ও আমলাতান্ত্রিক মহল: চুক্তির আড়ালে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের শর্ত রয়েছে, যা আমলাতন্ত্রের একটি শক্তিশালী অংশকে সুবিধা দেয়। বিশেষ করে মার্কিন এক্সিম ব্যাংক ও ডিএফসি-র অর্থায়নের লোভে এই চুক্তি ত্বরান্বিত হয়েছে। তৃতীয় বাহু নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী: ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ও ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির জন্য যারা এলসি খুলবে বা কমিশন পাবে, তারাই চুক্তির প্রধান চালিকাশক্তি। চতুর্থ বাহু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: চুক্তিকে ‘আইনসম্মত’ প্রমাণ করতে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে সব দুর্বলতা ঢেকে ফেলা হয়েছে। পঞ্চম বাহু গণমাধ্যম ও মতাদর্শিক চক্র: চুক্তির নেতিবাচক দিক আড়াল করে একে ‘উন্নয়ন’ ও ‘বিদেশি বিনিয়োগ’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, আর সমালোচকদের ‘উন্নয়নবিরোধী’ লেবেল দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ বাহু যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ও চীনের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে চুক্তিটি বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। সপ্তম বাহু স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী: আমদানিকৃত মার্কিন পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে যারা যুক্ত থাকবে, তারা এই চুক্তির সুফল ভোগ করবে।

এই চুক্তি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মাত্র। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কের ইতিহাস দেখায়, আমরা বারবার একই ভুল করছি। ভারতের সঙ্গে ফারাক্কা চুক্তি বা আদানি চুক্তিতে দেখা গেছে কীভাবে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ বড় হয়েছে। বর্তমান চুক্তি তার আধুনিক সংস্করণ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো চুক্তির ৪.৩(৪) অনুচ্ছেদ: ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি চীন বা অন্য কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও বাধ্য হয়ে সেই নিষেধাজ্ঞায় অংশ নিতে হবে, যা দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নির্ভরতা নয়, কৌশলগত আত্মসমর্পণ।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে এই চুক্তির নৈতিক ও আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে নিজের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে। আমি চারটি পদক্ষেপ প্রস্তাব করছি। প্রথম, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকটি শর্ত, উপ-শর্ত ও অ্যানেক্স জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়, পোশাক, কৃষি, ওষুধ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি খাতভিত্তিক প্রভাব মূল্যায়ন কমিশন গঠন করতে হবে। তৃতীয়, যেহেতু চুক্তিটি কোনো সংসদীয় তদারকি ছাড়া স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাই এটি সংসদে উত্থাপন করতে হবে এবং জাতীয় বিতর্কের আয়োজন করতে হবে। চতুর্থ, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে এবং ভিয়েনা কনভেনশনের ৬২ নম্বর অনুচ্ছেদ (পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন) ব্যবহার করে চুক্তির অসম ও ক্ষতিকর ধারাগুলো পুনঃআলোচনার দাবি জানাতে হবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থই প্রকৃত জাতীয় স্বার্থ। বিতর্কিত এই মার্কিন চুক্তি যদি জনস্বার্থে সংশোধিত না হয়, তবে এটি ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নির্ভরতার দলিল হিসেবে লেখা থাকবে। এখন সময় এসেছে সজাগ হওয়ার এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার।

লেখক: ড. মো. আবু হাসান
সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: hhafij@yahoo.com

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...