সাইদুর রহমান নোমান, নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৫ ৮:১৩ পিএম

দেশে নামিদামি হোটেলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। প্রত্যেক অলিতে-গলিতে হোটেল বা রেস্তোরাঁ আছে। এখন বাংলাদেশের হোটেলগুলোতেই বিদেশী খাওয়ার পাওয়া যায়। মানুষও দামি ও মুখরোচক খাওয়ার দিকে ঝুঁকেছে। এতে রাজস্ব আদায় বাড়ার কথা থাকলেও এই খাতে রাজস্ব আদায়ে কোন প্রভাব পড়েনি। কারণ বেশিরভাগ হোটেল-রেস্তোরা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের (বিন) নিবন্ধন নেই। এতে ভ্যাট আদায়ের আওতার বাহিরে থাকে এই হোটেলগুলো।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁর বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের (বিন) নিবন্ধন নেই। নিবন্ধন না থাকায় এনবিআরও ৯৭ শতাংশ হোটেল থেকে ভ্যাট আদায় করতে পারছে না। মাত্র ৩ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে ভ্যাট আদায় হচ্ছে।

এক অর্থবছরে এই টাকার পরিমাণ অন্তত ১৮ হাজার কোটি টাকা। যেখানে সরকার পায় মাত্র সোয়া ৫০০ কোটি টাকা। ৯৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এই টাকা ফাঁকি দিচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) নিবন্ধিত হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৪৩। এর মধ্যে হোটেল তিন হাজার ১১৫টি এবং রেস্তোরাঁ ১০ হাজার ৬২৮টি। অথচ বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, দেশে হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে চার লাখ ৮২ হাজার। সে হিসাবে ভ্যাট দেয় মাত্র ২.৮৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী এই সংখ্যা চার লাখ ৩৬ হাজার ২৭৪। সে হিসাবে ভ্যাট দিচ্ছে মাত্র ৩.১৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। অনলাইন খাবার ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার সঙ্গেও যুক্ত ৮০ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান। এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত দেশের ১৭.১৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান।

বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের (বিন) নিবন্ধন না থাকার কারণ হিসেবে অভিযোগ আছে, রাজস্ব কর্মকর্তারা ইচ্ছা করেই হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোকে ভ্যাটের আওতার বাহিরে রেখেছে। নিবন্ধনবিহীন এই সব রেস্তোরাঁগুলো থেকে ঘুষ আদায় করে এই কর্মকর্তারা।অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজস্ব কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়। এতে রাষ্ট্র বড় অঙ্কে রাজস্ব হারাচ্ছে।

২০২১ সালে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাত নিয়ে একটি জরিপ চালিয়েছিল ভ্যাট গোয়েন্দা। সে সময়ের জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিরই নিবন্ধন নেই। তবে এরপর এই খাতে বিনিয়োগ আরো বেড়েছে। অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে।

তবে এনবিআরের দাবি, ৯৭ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ ভ্যাট দেয় না এটা সঠিক তথ্য না। মূলত জনবল ও সক্ষমতা কম থাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে ভ্যাট আদায়ে জোর দেয়া হচ্ছে না। নিবন্ধনেও এনফোর্সমেন্ট দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, এখন দেশে চার লাখ ৮২ হাজার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আছে। এর মধ্যে অল্পসংখ্যক সরকারের ভ্যাট পরিশোধ করে। বাকিরা এই ভ্যাটের টাকা পকেটে ঢুকায়। এসব হলো ভ্যাট কর্মকর্তাদের চুরি করার একটা রাস্তা। সবাইকে তাঁরা ভ্যাটের আওতায় আনতে চান না। ফলে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের টিকে থাকা কঠিন। যারা ভ্যাট দেয় তাদের ওপরই জুলুম হয়, যারা দেয় না তাদের কোনো সমস্যা নেই। সেখান থেকেই চাঁদা নিয়ে তাঁরা (কর্মকর্তারা) চলেন।

এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি) মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী বলেন, এই ডেটা সঠিক নয়।

ভ্যাট বিষয়ক এনবিআরের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের জনবল সক্ষমতা কম। এদিক থেকে আমরা যে খাতগুলোতে রাজস্ব আহরণ বেশি হয়। আমরা সে সেক্টরগুলোতে বেশি জোর দিচ্ছি। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো থেকে রাজস্ব কম আসে, তাই এই খাতে ভ্যাট আদায়ে জোর কম দেয়া হচ্ছে। কারণ হোটেল থেকে রাজস্ব খুব আসে। আমরা যদি হোটেল রেস্তোরাঁর দিকে ভ্যাট আদায়ে জোর দিয়। রাজস্ব বেশি আসে এমন খাতে কর ফাঁকি বেশি হয়ে যাবে। অর্থাৎ সব দিকে সমানভাবে এনফোর্সমেন্ট করার সক্ষমতা এনবিআরের নেই। এটাই বাস্তবতা। তাই বলে আমরা হোটেল রেস্তোরাঁকে যে একইবারে ছেড়ে দিচ্ছি বা দিব এমন না। তুলনামূলকভাবে একটু ছেড়ে দেয়ায় এমনটা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেকোনো ব্যবসা চালাতে হলে প্রথমে নিবন্ধন করতে হয়। সবার ট্রেড লাইসেন্স আছে, কিন্তু এনবিআরের খাতায় তাদের নাম নেই। যেমন জয়েন্ট স্টক কোম্পানি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এখন ওয়েবসাইট সংযোগের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান হয়। ফলে নিবন্ধিত কোম্পানিগুলো এনবিআরের খাতায় চলে আসছে। আমাদেরও ট্রেড লাইসেন্সের সাথে এনবিআরের ওয়েবসাইটের সংযোগ স্থাপন করা উচিত। এরপর নির্ধারণ করতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান ছোট, কোনটা বড়, কোনটা কোন গ্রেডের আওতায় পড়বে, আর কোনটা টার্নওভার ট্যাক্স বা ভ্যাটের আওতায় আসবে। সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যেন হয়রানি না হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স দেয়, কিন্তু সরকারের খাতায় তা প্রতিফলিত হয় না। এনবিআরের জনবল কম থাকলেও প্রযুক্তির সহায়তায় এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। প্রায় সাড়ে চার লাখ ইউনিটে এনবিআরের কর্মকর্তা গিয়ে সরাসরি কালেক্ট করা কখনো সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাটাবেজ সংযোগ করা জরুরি। ইএফডি মেশিনের অগ্রগতি নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পাঁচ বছরে ৩ লাখ ইএফডি মেশিন স্থাপনের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু এখনো ১০ হাজারও স্থাপন হয়নি। এসব জায়গায় নজর দেওয়া জরুরি।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

কাঁচা মরিচ ও টমেটো আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতির প্রস্তাব অনুমোদন

কাঁচা মরিচ ও টমেটো আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে ...

নবম পে–স্কেল মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ, বাস্তবায়ন দুই ধাপে

প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা ...

এস আলম ও সাবেক রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ায় সাসপেন্ড ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা

বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস আলম ও ...

আমির খসরুর নেতৃত্বে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি

দেশে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশ ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ে ‘ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি’ ...

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানা, ঋণের সুদ মওকুফ চায় চট্টগ্রাম চেম্বার

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এ ...