
দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, তারল্য সংকট ও মুনাফা কমে যাওয়ার চাপে ক্রমেই নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু বহুজাতিক ও বেসরকারি খাতের ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করলেও এস আলমের লুণ্ঠনের শিকার ব্যাংকগুলোর উচ্চ লোকসান পুরো খাতকে আবার লোকসানি খাতে পরিণত করেছে। ২০২৫ সালে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাত লোকসান করেছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এমতাবস্থায়, আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মূলত একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংক ও অনিয়ম হওয়া ব্যাংকগুলোর উচ্চ লোকসান পুরো খাতের লোকসানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের ফলে এই চিত্র ফুটে উঠেছে। এর আগে ২০০৪ ও ২০০৬ সালে ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির সময়েও ব্যাংক খাত লোকসান করেছিল। আর ২০১২ সালে পুরো খাত লোকসান করেছিল সোনালী ব্যাংকের হল–মার্ক কেলেঙ্কারির কারণে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বড় লোকসানে ব্যাংক খাত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে মুনাফা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালে পুরো খাতের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ৯টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই (একিউআর) হয়েছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই নিরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে। বাকি চারটির অবস্থাও খারাপ। এ কারণে ব্যাংকগুলোর বড় লোকসানের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এর আগে ২০০৪ সালে ৭৭৬ কোটি টাকা ও ২০০৬ সালে ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছিল পুরো ব্যাংক খাত। ২০০২ সালে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফেরাতে ও খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকিং সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। তখন ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র বের করতে স্বাধীন নিরীক্ষা হয়। এতেই ক্ষতিতে পড়ে পুরো ব্যাংক খাত।
এ ছাড়া হল–মার্ক কেলেঙ্কারির কারণে ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক বড় লোকসান দেখায়। এই কারণে ওই বছর পুরো খাতের লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকা।
কার কত লোকসান
ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর ১০ ব্যাংক মিলে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। তবে ভালো ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর উচ্চ মুনাফার কারণে এই লোকসান কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি বিদায়ী বছরে ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এরপর এস আলমের মালিকানায় থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লোকসান করেছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংক লোকসান করেছে ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। এস আলমের মালিকানায় থাকা গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা ও ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৯২ কোটি টাকা এবং পদ্মা ব্যাংক ৯৩০ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে গত বছর।
শীর্ষ মুনাফার ব্যাংক
গত বছর শেষে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি)। ব্যাংকটি বিদায়ী বছরে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। আর দেশি ব্যাংকের মধ্যে হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে তিনটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক। গত বছর ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ও পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
আয় নেই ৫৯% সম্পদের
ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের আমানত থেকে যে টাকা ঋণ দেয় ও বিনিয়োগ করে, তাই তাদের সম্পদ। এসব সম্পদের বিপরীতে যত আয় আসে, ব্যাংক তত শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ১০০ টাকার মধ্যে ৫৯ টাকা এখন ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ বা ডিস্ট্রেসড ঋণে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ এসব ঋণ থেকে কোনো আয় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। গত বছর শেষে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ পুনঃ তফসিল করা। বাকিটা খেলাপি, অবলোপন ও আদালতের আদেশে খেলাপি স্থগিত অবস্থায় আছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ব্যাংকিং নীতি প্রণয়নকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে ডিস্ট্রেসড ঋণের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে সাধারণত যে ঋণ থেকে কোনো আয় আসে না বা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হয় না, সেগুলোকে এই শ্রেণির ঋণ হিসেবে ধরা হয়। পুনঃ তফসিল করা ঋণের বিপরীতে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হয়, তাই এসব ঋণকে ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে ধরা হয় না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা উপায়ে ঋণ নিয়মিত দেখানো হতো। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র সামনে আনতে শুরু করায় পুরো খাতের চিত্র সামনে এসেছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। বিশেষ পুনঃতপশিলের কারণে শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে গত ডিসেম্বরে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নামে। মোট ঋণের যা ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মূলত লুকানো খেলাপি ঋণ সামনে আনাসহ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ অনেক বেড়ে যাওয়ায় পুরো খাতের খারাপ অবস্থা সামনে এসেছে। গত বছর রেকর্ড এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়। এর পরও ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। মোট ঋণের যা ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছর আগে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।
এএ
- ১চলতি অর্থবছরে ৫০ আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেবে বাংলাদেশ
- ২সব পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর
- ৩সরকারের প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গার কারণে সবকিছু হতাশায় পরিণত হয়েছে
- ৪নতুন বিনিয়োগ সৃষ্টি ও ব্যবসার সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকার
- ৫নামজারিতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি: আব্দুল মান্নান
- ৬জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রধান কারিগর যাদু মিয়া : তথ্যমন্ত্রী
- ৭মোদির বাসভবনের সামনে থেকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক
- ৮কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটের নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
- ৯বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা যাবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- ১০যানজট নিরসনে নবীনগর বাজারে উচ্ছেদ অভিযান, দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা
- ১‘লুটপাটে সহায়তাকারী’ আইএফআইসির এমডি মনসুর মোস্তফা বহাল তবিয়তে
- ২ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে যা বললেন এমপি গাজী নজরুল ইসলাম
- ৩চাঁদপুরে নিজ বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে বাড়ির মালিকের মৃত্যু
- ৪শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরল কমিটির হাতে
- ৫নবীনগরে সরকারি পুকুরপাড়ের লিজ নিয়ে বিতর্ক
- ৬পাথরঘাটায় তরুণী নিখোঁজ
- ৭ময়মনসিংহে ট্রাক চাপায় নারীসহ অটোরিকশার তিন যাত্রী নিহত
- ৮শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিসিএসের স্বপ্নে প্রিয়ন্তী
- ৯প্রবাসী কার্ডে মিলবে প্রায়োরিটি চেক-ইন ও বোর্ডিং সুবিধা
- ১০সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত মুজিবুরের পরিবারকে সরকারি সহায়তা





পাঠকের মতামত