ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬ ১২:০৪ পিএম

পঞ্জিকার হিসাবে সেদিন ছিল আগস্টের পাঁচ তারিখ। কিন্তু এ দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে, দেয়ালের গ্রাফিতিতে এবং মুক্ত বাতাসে দিনটি কোনো সাধারণ তারিখ হয়ে থাকেনি। মানুষের মুখে মুখে, দেয়ালে দেয়ালে সেদিনের পরিচয় হয়ে উঠেছিল—’৩৬ জুলাই’।

ক্যালেন্ডারের হিসাবে জুলাই মাস ৩১ দিনেই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু স্বৈরাচারের চূড়ান্ত পতন না হওয়া পর্যন্ত সেই জুলাই যেন আর শেষ হচ্ছিল না। ঘড়ির কাঁটা ও পঞ্জিকার হিসাবকে অতিক্রম করে জুলাই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে মানুষের সংগ্রাম, ত্যাগ ও প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে।

যে সকালে ঘুচেছিল ভয়

সেদিনের সকাল ছিল একই সঙ্গে রক্তস্নাত ও মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত। বহু বছর ধরে মানুষের বুকের ওপর চেপে থাকা ভয়ের পাথরটি যেন হঠাৎ সরে গেল। যে রাজপথ কিছুদিন আগেও তরুণদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, গুলির শব্দে কেঁপে উঠেছিল, সেদিন সেই পথেই নেমে এসেছিল লাখো মানুষের বাঁধভাঙা জনস্রোত।

ধর্ম, বর্ণ, বয়স ও পেশার বিভাজন ভুলে মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। সবার একটাই পরিচয়—তারা স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক।

কান্না ও বিজয়ের উল্লাস সেদিন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ এবং নাম না জানা অসংখ্য শহীদের শূন্যতা বুকে নিয়েও মানুষ বুকভরে নিয়েছিল স্বস্তির নিশ্বাস। চোখে জল ছিল, তবে সে জল পরাজয়ের নয়; ছিল গ্লানি মোচনের, দীর্ঘ পনেরো বছরের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস ফুরিয়ে যাওয়ার।

আত্মত্যাগের দীপশিখা:

এই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে কিছু মুখ চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। তাঁদের রক্তে ভেজা পথ ধরেই অর্জিত হয়েছে মানুষের এই বিজয়। এমন হাজার প্রাণ বুক পেতে , মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজ জীবন কে বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাদের মাঝে প্রথমেই যে নাম গুলো চোখের সামনে ও প্রাণের মাঝে ভেসে উঠে তারা হলেন আবু সাঈদ ও মুগ্ধ।

আবু সাঈদ: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অকুতোভয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। দুই হাত প্রসারিত করে তাঁর সেই দৃঢ় অবস্থান ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর অবিচল ভঙ্গি প্রমাণ করেছে—একটি তরুণ প্রজন্মের মেরুদণ্ড সোজা করার শক্তিকে শত বুলেটও পরাজিত করতে পারে না।

মীর মুগ্ধ: ঢাকার রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুপেয় পানি বিতরণের সময় নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মুগ্ধ। তাঁর শেষ মুহূর্তের আকুতি—“পানি লাগবে, পানি?”—আজও বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে। হাতে পানির বোতল নিয়ে ছুটে চলা মুগ্ধ মানবতার এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা স্বৈরাচারের নিষ্ঠুরতাকে চিরদিনের জন্য লজ্জিত করে রাখবে।

গ্রাফিতির আয়নায় বেঁচে থাকা ইতিহাস

আজও ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দেয়ালে চোখ আটকে যায়। রঙ-তুলির আঁচড়ে সেখানে অমর হয়ে আছে ৩৬ জুলাইয়ের দিনগুলো। কোথাও ফুটে উঠেছে আবু সাঈদের বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কোথাও মুগ্ধর হাতে পানির বোতল—সঙ্গে লেখা, “পানি লাগবে, পানি?”

গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়া তরুণের প্রতিকৃতি কিংবা রিকশার হাতলে ঝুলে থাকা জেনারেশন জির তরুণ-তরুণীদের ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কখনো এমনিতেই আসে না। এসব গ্রাফিতি কেবল রঙের কারুকাজ নয়; এগুলো প্রতিবাদের জীবন্ত ইশতেহার এবং শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

একটি দেশের স্বাধীনতা মানে কেবল মানচিত্রের পরিবর্তন নয়; স্বাধীনতা হলো পরাধীনতার শেকল ভেঙে মানুষের মনে ভয়কে জয় করার আনন্দ।

সংকটময় মুহূর্তে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা

৩৬ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনতার পাশাপাশি দেশের অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন।

দেশের এই সংকটময় সময়ে অভিজ্ঞ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান। রাজপথে তরুণদের ওপর নির্বিচারে চলা হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে তাঁদের অবস্থান, দিকনির্দেশনা ও সংহতি আন্দোলনকারীদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর এসব দেশপ্রেমিক সদস্য প্রমাণ করেছেন—গায়ে ইউনিফর্ম না থাকলেও দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ তাঁদের রক্তে মিশে আছে। তাঁদের সময়োপযোগী অবস্থান স্বৈরাচারী শক্তির পতন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি অটুট রাখতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ: স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা শক্তিশালী করার রূপরেখা

৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই কেবল একটি তারিখ কিংবা কোনো সরকারের পতনের ইতিহাস নয়। এটি তরুণদের সাহস, সাধারণ মানুষের অদম্য ঐক্য এবং আত্মত্যাগের মহিমায় নির্মিত এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

এই অর্জনকে সুসংহত করতে আমাদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে—

আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ: বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা: দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে মেধা, সততা ও যোগ্যতাকে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তাব্যবস্থার আধুনিকায়ন: দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায়ন: ৩৬ জুলাইয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্ব বিকাশে তাঁদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

যতদিন বাংলার মাটিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর প্রয়োজন থাকবে, ততদিন ’৩৬ জুলাই’ আমাদের পথ দেখাবে। সেদিন যে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, তা যেন আর কখনো অন্ধকারের গহ্বরে হারিয়ে না যায়—এটাই প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের আজীবনের প্রার্থনা।

মোঃ আনিসুর রহমান (সজল)
অবসরপ্রাপ্ত লেঃ কর্নেল
সামরিক বিশ্লেষক, লেখক ও সাহিত্যিক।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...