
‘অর্থবছর’ ধারণাটি বাজেটের সাথে সম্পৃক্ত। ইতিহাসে প্রাচীন বা মধ্যযুগে বাজেট বা অর্থবছর বিষয়ে কোন ধারনা পাওয়া না গেলেও আধুনিক যুগে অর্থবছর এবং বাজেট রাষ্ট্র পরিচালনায় জনপ্রিয় ধারণা। অর্থবছর হচ্ছে একবছরে একটি দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যা দ্বারা সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব- নিকাশের নির্দেশনা বুঝায়। জনগণের নিকট রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এক ধরনের জবাবদিহিতা। এতে জনগণ রাষ্ট্রের আয়-ব্যয় সম্পর্কে জানতে পারে। বর্তমানে কম-বেশি ৮০টি দিনপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার প্রচলিত আছে বিশ্বজুড়ে। এছাড়া আছে ভারতীয় পঞ্জিকা ও হিজরি সালের হিসাব। বছরের শুরু-শেষ পরিবর্তন করতে না পারলেও অর্থবছরের বিষয়টি পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ কোন রাষ্ট্র তার সুবিধাজনক সময়কে অর্থবছর হিসেবে নির্ধারণ করে নিতে পারে। গত কয়েক দশকে বহু দেশ প্রয়োজন অনুযায়ী এটি পরিবর্তন করেছে।
বিশ্বের একেক দেশে একেক সময় অর্থবছর শুরু হয়। বাংলাদেশে এখনো পাকিস্তান আমল থেকে পাওয়া অর্থবছরই অনুসরণ করছে। কোন বছরের ১ জুলাই থেকে পরের বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছর ধরা হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অর্থবছর শুরু হয় এপ্রিলে। আমাদের প্রতিবেশী বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অর্থবছর মোঘল যুগ, ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এপ্রিল-মার্চ হলেও ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরে পাকিস্তানি শাসকদের একচ্ছত্র সিদ্ধান্তেই প্রবর্তিত হয় জুলাই-জুন অর্থবছর। যা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশে বিদ্যমান। পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি বা উৎপাদন মৌসুম অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এর মূল কারণ। তবে দূরত্ব এবং আবহাওয়ার কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সবকিছুই ভিন্ন। সে কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের সুবিধার্থে এপ্রিল- মার্চের স্থলে জুলাই- জুন অর্থবছর সাব্যস্ত করা হয় বলে জানা যায়। সে ক্ষেত্রে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের কথা ভাবা হয়নি।
উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, পৃথিবীর ২৩৩ টি দেশের মধ্যে ১৬৬ দেশের অর্থবছর পঞ্জিকাবর্ষ (জানুয়ারি – ডিসেম্বর), ৩৬ দেশের এপ্রিল-মার্চ,১৯ দেশের জুলাই-জুন এবং ১১ দেশের অক্টোবর-সেপ্টেম্বর। বিশ্বের দেড়শতাধিক দেশের অর্থবছর শুরু হয় ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। অর্থাৎ জানুয়ারি মাসেই তাদের বাজেট ঘোষণা করা হয়।বাংলাদেশ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই থেকে। আর শেষ হয় ৩০ জুন।
১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় ৩০ ডিসেম্বর এমন দেশের মধ্যে রয়েছে- চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, স্পেন, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইডেন। এপ্রিলের প্রথম দিন বাজেট বর্ষ শুরু হয় ভারত, যুক্তরাজ্য, হংকং, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকায়। শেষ হয় ৩১ মার্চ। যুক্তরাষ্ট্র, কোস্টারিকা ও থাইল্যান্ডে অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর। আর শেষ হয় ৩০ সেপ্টেম্বর। অনেক দেশ মাসের মধ্যবর্তী তারিখ থেকে অর্থবছর শুরু করে। এদের মধ্যে ইরান ২১ মার্চ থেকে ২০ মার্চ, ইথিওপিয়া ৮ জুলাই থেকে ৭ জুলাই। ইরানে অবশ্য হিজরি সন অনুযায়ী অর্থবছর হয়ে থাকে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। কোন কোন দেশ যেমন নেপাল (অর্থবছর চলে বিক্রম ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে, যা ১৬ জুলাই – ১৫ জুলাই), ইরান (২১ মার্চ-২০ মার্চ), ইথিওপিয়া (৮ জুলাই-৭ জুলাই) মাসের মধ্যবর্তী তারিখ থেকে অর্থবছর শুরু করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়ন প্রয়াসে জাতীয় বাজেটকেন্দ্রিক মতবিনিময় সভাসমূহে আলোচনায় অর্থবছরের মেয়াদ পুনঃনির্ধারণের প্রস্তাব আসে কয়েকবার। উপযুক্ত কারণ পরীক্ষা -পর্যালোচনা করে এটি পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণের আবশ্যকতা অনুভূত হয়। এটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। সেই সঙ্গে বাংলাবর্ষকে কেন্দ্র করার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সেই চিন্তা-ভাবনা আর বাস্তবতায় রূপ পায়নি। বাংলাদেশের মৌসুমি আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বার্ষিক কর্মযোজনার নিরিখে এটা খুব স্পষ্ট যে, জুলাই- জুন অর্থবছর হতে পারে না। আমাদের দেশে মূলত মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর অবধি বৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে অর্থবছর জুলাই- জুন। এতে দেখা যায়, অর্থবছরের শেষে বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ শেষ করার তাগিদে কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানোর তাগিদে এবং ঠিকাদাররা বিল পাইতে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার জন্য মে-জুন মাসে দেশজুড়ে শুরু করে খোঁড়াখুঁড়ি। শহরে পানির লাইন, সুয়ারেজ লাইন, নতুন রাস্তা, রাস্তা সংস্কারের কাজে খুব তড়িঘড়ি করে। গ্রামে দেখা যায়, মে- জুন মাসে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাঁচা রাস্তায় নতুন মাটি দিয়ে সংস্কার কিংবা নতুন রাস্তা নির্মাণ কাজ করায় বৃষ্টির পানিতে হাঁটু সমান কাদা হয়ে রাস্তা চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে শুধু চরম ভোগান্তি পেতে হয় তা নয়, কাজটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এতে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের আর্থিক অপচয় হয়। শুধু কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অর্থবছরের বর্ষার ৪/৫টি মাস অর্থনীতির জন্য অনুকূল না হয়ে প্রতিকূল হয়ে উঠে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে – “অর্থ-বৎসর” অর্থাৎ জুলাই মাসের প্রথম দিবসে অর্থবছর শুরু হবে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, জীবনযাপনের সময়চক্র, আর্থ-প্রশাসনিক কর্মকান্ডের আবহমান সংস্কৃতি বিবেচনায় অর্থবছর জানুয়ারি -ডিসেম্বর বা এপ্রিল-মার্চ হতে পারে, এতে প্রথম মাসেই কাজ শুরু করে পরবর্তী ৪/৫ মাস বর্ষাকালে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে অক্টোবর-মার্চ এ ছয় মাস পুরোটা সময় নিরবিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে পরিপূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হতে পারে। এতে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই অর্থবছরের বকেয়া সব কাজ শেষ করা সম্ভব। বাংলাদেশের জন্য এই সময়টিই সব কাজের জন্য অনুকূল, সহনশীল ও উৎপাদনমুখী। সংবিধান যেহেতু রাষ্ট্র এবং মানুষের প্রয়োজনে তৈরি, সেহেতু প্রয়োজনে সময়ে সময়ে এটি সংশোধনের বিধানও আছে।
মহান স্বাধীনতার ৫২ বছর পরেও এমন প্রতিকূল একটি প্রথা প্রচলিত এবং বহাল তবিয়তে আছে যা শুধু নাগরিকদের কাছে অগ্রহণযোগ্য তা নয়, উন্নত ও সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্তরায়। এ বিষয় নিয়ে অনেকেই আওয়াজ তুলেছে বিচ্ছিন্ন -বিক্ষিপ্তভাবে। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে সফল হওয়া সম্ভব এবং তা উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে “স্মার্ট বাংলাদেশ” বিনির্মাণের প্রয়োজনেই করা উচিত। স্মার্ট বাংলাদেশ ধারণার চারটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ‘স্মার্ট গভর্নেন্স (Smart Governance)। এতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের উন্নয়নে সরকার ঘোষিত বাজেটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকবে অর্থাৎ বাজেটের সঠিক ব্যবহার হবে। বাজেট/ প্রকল্পের অপচয় রোধ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাক্কলিত বাজেটে কাজ শেষ করাই স্মার্ট গভর্নেন্সের মূল ধারণায় বলা হয়েছে। মোদ্দাকথায়, অর্থবহ অর্থবছর স্মার্ট গভর্নেন্সের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। অর্থবছর পুনঃনির্ধারণ করা হলে যে বিশাল অংকের টাকা অপচয় হতো, তা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
লেখক: মোঃ বেলায়েত হোসেন
তথ্য কর্মকর্তা
- ১ধর্ম-জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে সুযোগ কম দেওয়া যাবে না
- ২প্রাইম ব্যাংক ও ডিএইচএস অটোসের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর
- ৩সাতক্ষীরায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তররে বাজার তদারকি অভিযান
- ৪থাই বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর
- ৫প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের বোর্ড সভা ২৮ জুলাই
- ৬ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষার্থীসহ অংশীজনদের নিয়ে পুষ্টি সচেতনতা কর্মসূচির আয়োজন
- ৭প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের সভা চলছে
- ৮বাংলাদেশ-মালদ্বীপ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে অঙ্গীকার
- ৯উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর খাবার নিয়ে নানা অভিযোগ
- ১০রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আসিয়ানের সহযোগিতা চাইলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- ১লোকসানী শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর এক মাসে বেড়েছে ৬৮ শতাংশ
- ২‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে বৈদেশিক সম্পর্ক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- ৩পারিবারিক বিরোধের জেরে তায়েবাকে হত্যার অভিযোগ, ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
- ৪মাদক সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে পুলিশ জড়িত থাকলেও ছাড় নয়: ডিআইজি
- ৫চকরিয়ায় ২০ প্যাকেট ইয়াবাসহ মাদককারবারী আটক
- ৬ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- ৭চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রো-ভিসিকে ছাত্রদলের শুভেচ্ছা
- ৮আকস্মিক বন্যায় কৃষকের স্বপ্ন মূহুর্তেই তছনছ
- ৯বিশ্ববাজারে ফের বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম
- ১০স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন পরিচালক ডা. নুরুল ইসলাম





পাঠকের মতামত