মো: মামুন হাসান
প্রকাশিত: এপ্রিল ৭, ২০২৬ ১১:৫৯ এএম , আপডেট: এপ্রিল ১৫, ২০২৬ ৭:৩৩ এএম

মো. মামুন হাসান

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি শুধু আমাদের নদী ও সাগরের সম্পদই নয় বরং দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ইলিশ পুষ্টি চাহিদা পূরণে অবদান রাখে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক, জেলেদের জীবিকা নিশ্চিত করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা ধরে রাখে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইলিশের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অতিরিক্ত আহরণ, নির্বিচারে জাটকা নিধন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে ইলিশের উৎপাদন ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সরকার, ২০০৩-০৪ সালে ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার নিমিত্ত ‘হিলসা ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করে। এটিই মূলত ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। এই কর্মপরিকল্পনার আলোকেই ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণ, ইলিশ অভয়াশ্রম ঘোষণা ও ব্যবস্থাপনা, জাটকা সংরক্ষণ, অবৈধ জালের ব্যবহার রোধে বিশেষ কম্বিং অপারেশন, জেলেদের ভিজিএফ প্রদান, বিকল্প কর্মসংস্থানসহ বিবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ৯.৭৯ শতাংশ। জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী, মোহনা ও সাগর থেকে। ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০-২৫ লাখ লোক ইলিশ পরিবহন, বিক্রি, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। সরকার ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে সময়োপযোগী এবং বাস্তবমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে  ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি প্রতি বছর জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ভোক্তাসহ সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬’। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশ ভরবে সাগর-নদী’ যা ভবিষ্যতের ইলিশ উৎপাদন নিশ্চিত করার গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলে। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর উদযাপিত হয়ে আসছে। ইলিশের স্থায়িত্বশীল উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখার জন্য, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মৎস্য সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ এর অধীনে প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ রুলস, ১৯৮৫-এর রুল ১৩ অনুযায়ী, পরিপক্ব ইলিশ যাতে নিরাপদে ডিম দিতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১৯ আশ্বিন থেকে ৯ কার্তিক আশ্বিনী-পূর্ণিমার আগের ৪ দিন এবং অমাবস্যার পরের ৩ দিনকে অন্তর্ভুক্ত করে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার আলোকে ইলিশের প্রজনন সময় নির্ধারণ করে মা ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং মৎস্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ রাখা হয়। মাছের মুখ থেকে লেজ পর্যন্ত ১০ ইঞ্চি (২৫ সেন্টিমিটার) কম দৈর্ঘ্যরে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ, যাতে জাটকা নিরাপদে বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ণাঙ্গ ইলিশে রূপান্তরিত হতে পারে। সরকার আশা করছে, জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী বছর ইলিশের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ (সংশোধিত) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। এই নিষিদ্ধকালের মধ্যে জেলেদের জীবনধারণ নিশ্চিত করতে সরকার, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ লাখ ৬৭ হাজার জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে চার মাসে ৫৮ হাজার ৭২০ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছে এবং বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

জাটকা মূলত ২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চির কম দৈর্ঘ্যরে ইলিশকে বোঝায়। এদের সংরক্ষণ করা গেলে, পরবর্তী সময়ে বড় আকারের ইলিশে পরিণত হয়, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাধারণভাবে এক কেজি ওজনের ইলিশের দৈর্ঘ্য ৪০-৫০ সেন্টিমিটার এবং দুই কেজির বেশি হলে ৬০-৬২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। জাটকাকে পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হওয়ার সুযোগ করে দিতে নিষিদ্ধ সময়কালে উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের সব নদ-নদী, মাছঘাট, মৎস্য আড়ত ও বাজারে নিয়মিত অভিযান এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এই সমন্বিত প্রয়াসের ফলেই জাটকার বিস্তৃতি এখন নিম্ন মেঘনা ছাড়িয়ে পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা নদী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। পদ্মা নদীর দুই পাড়ের জেলা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাবনা, কুষ্টিয়া, নাটোর, রাজশাহী, চঁাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং যমুনা নদীর তীরবর্তী জেলা সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামে ইলিশ ধরা পড়ছে। জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে চলমান কার্যক্রমসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে, সারা বছর ইলিশের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং ইলিশের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। নির্বিচারে জাটকা নিধন রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইন প্রয়োগ কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে জাটকা ধ্বংসে সবচেয়ে ক্ষতিকর জালগুলো নির্মূলে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ‘বিশেষ কম্বিং অপারেশন’ পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে চার ধাপে ৩০ দিনব্যাপী দেশের ১৮টি জেলার ৯৩টি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে ‘বিশেষ কম্বিং অপারেশন-২০২৬’ পরিচালিত হয়েছে। এছাড়া ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় মার্চ মাসে অতিরিক্ত ১৫ দিন দেশের ১৮টি জেলার ৬৯টি উপজেলায় বিশেষ কম্বিং অপারেশন পরিচালিত হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব বাজেট প্রকল্পের আওতায় ৫১২টি মোবাইল কোর্ট এবং ৪২০৯টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে, দেশব্যাপী নিয়মিত অভিযান ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে যা ইলিশ সম্পদের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জাটকা সংরক্ষণে সরকার আইন প্রয়োগের পাশাপাশি, জেলেদের জন্য মানবিক সহায়তা জোরদার করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ লাখ ৬৭ হাজার জেলে পরিবারকে ৪ মাসে মোট ৫৮ হাজার ৭২০ মেট্রিক টন এবং প্রজনন মৌসুমে ৬ লাখ ১৯ হাজার পরিবারকে ১৫ হাজার ৪৮২ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ৫৮ দিনের সমুদ্র নিষেধাজ্ঞায় ৩ লাখ ১১ হাজার পরিবারকে ২২,০৮২.১৯ মেট্রিক টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী সহায়তা দিয়ে জেলেদের স্বাবলম্বিতা বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া, ‘নিহত জেলে পরিবার বা স্থায়ীভাবে অক্ষম জেলেদের আর্থিক সহায়তা প্রদান নীতিমালা-২০১৯’ এর আলোকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৭টি জেলে পরিবারকে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের নিষেধাজ্ঞায় ৫২.৫ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়ে এবং ৪৪.২৫ হাজার কোটি জাটকা উৎপন্ন হয়। তবে ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রত্যাশিত উৎপাদন বৃদ্ধি হয়নি; জুলাই-আগস্টে আহরণ আগের বছরের তুলনায় ৩৩.২০ শতাংশ ও ৪৭.৩১ শতাংশ কমে মোট ৩৫,৯৯৩.৫০ মেট্রিক টনে দাঁড়ায় (৩৮.৯৩ শতাংশ হ্রাস)। সার্বিকভাবে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ সময়ে ইলিশ আহরণ প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। যদিও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অজওগঅ মডেল অনুযায়ী উৎপাদন ৫.৩৮-৫.৪৫ লাখ মেট্রিক টন হতে পারে। নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, বাস্তব উৎপাদন আরও কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, ইলিশ আহরণ হ্রাসের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণ দায়ী। নদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি জমা, দূষণ এবং অপরিকল্পিত বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণে ইলিশের পরিভ্রমণ পথ, প্রজনন ক্ষেত্র, ফিডিং ও নার্সারি গ্রাউন্ড পরিবর্তিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিকর জাল ব্যবহার ও অপরিকল্পিত যান্ত্রিক নৌযানে মাছ ধরা উৎপাদন কমাচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সমন্বিত আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশবাসীকে জাটকা আহরণ, ক্রয়-বিক্রয় এবং খাওয়া থেকে বিরত থেকে জাতীয় মাছ ইলিশের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে, ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬’ সফল ও ফলপ্রসূ হবে, যা ইলিশ সংরক্ষণ ও টেকসই উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...