প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২২ ৫:২২ পিএম

পদ্মা সেতু শুধু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় যাতায়াত সুবিধাই দেবে না, জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখবে। স্বপ্নের এ সেতু ঘিরে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন), পর্যটন, ইকোপার্কের পরিকল্পনা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে হিমায়িত মৎস্য ও পাটশিল্পের নতুন সম্ভাবনা। পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসার অপেক্ষায়। পদ্মা সেতুর কারণে দেশে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও সহজ হবে। গর্ব আর অহংকারের এ সেতু বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার ঐতিহাসিক মাইলফলক।

এই সেতু যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা আরও সহজ করবে। শিল্পদ্যোক্তাদের কাছে গুরুত্ব বাড়াবে এ বন্দরগুলোর। এতে রপ্তানি বাণিজ্য হবে আরও সহজ ও সাশ্রয়ী। পদ্মার বুকে নির্মিত স্বপ্নের সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ অবদান রাখবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে (মাওয়া ও জাজিরা) গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। একসময় ওইসব এলাকার জমির দাম অনেক কম থাকলেও সেতু হওয়ায় এখন দাম বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। পর্যটন খাতেরও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। সুন্দরবন ও কুয়াকাটাসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকাগুর গুরুত্ব বাড়বে বহুগুণ। কৃষি অর্থনৈতিক চিত্রেও আসবে পরিবর্তন। খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট অঞ্চলের হিমায়িত মাছ রপ্তানি আরও সহজ করে তুলবে। মৎস্য খামারি বিশেষত দক্ষিণাঞ্চল থেকে পুকুর-ঘের বা নদীর মাছ সহজেই আসবে ঢাকার বাজারে। ছোট খামারির হাঁস-মুরগি বা কৃষকের শাক-সবজিও আসবে। এসব কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও ফিরবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতুর কারণে জিডিপিতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে, যা সেতুটির ব্যয়ের প্রায় তিনগুণ বেশি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের গর্বের বিষয়। এটি শুধু সেতুই নয়, পদ্মা সেতু হবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ফলে আমাদের ভৌগোলিক যে বিভাজন ছিল, তাতে সংযোজন স্থাপন হবে এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একটা একীভূত অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হবে। পদ্মা সেতুর ফলে আমাদের বিনিয়োগ, বিতরণ ও বিপণনগুলোতে যে সাশ্রয় হবে, সেটা অর্থনীতিতে ইতিবাচকভাবে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। এরই মধ্যে পদ্মার করিডোরের পাশ দিয়ে বিনিয়োগের বিভিন্ন ধরনের সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে। তবে এসব বিনিয়োগে যে কর্মসংস্থান হবে, সেগুলো আমাদের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবদান রাখবে বলে আমরা মনে করছি।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাতে বড় অবদান রাখবে পদ্মা সেতু। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জমিস উদ্দিন বলেন, করোনা ও ইউক্রেন সংকট মোকাবিলা এবং এর প্রভাব থেকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সফল হওয়ায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র বসন্তকালীন সভায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হচ্ছে, সাহায্যে প্রাপক হওয়া থেকে দাতা হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পদ্মা সেতু আমাদের অগ্রযাত্রার ঐতিহাসিক মাইলফলক। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ সেতু ব্যাপক অবদান রাখবে, ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সহজ করে তুলবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলে পোশাক ও পর্যটনসহ নানা খাতে বিনিয়োগ জরুরি। অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে, যেন বিদেশি বিনিয়োগ আসে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, জিডিপিতে এর অবদান তত বেশি হবে। পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের পণ্য আমদানি সহজ হবে। মালামাল দ্রুত সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবে। প্রবৃদ্ধি ১ থেকে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ বাড়বে। পদ্মা সেতুর সর্বোচ্চ বেনিফিট (উপকার) পেতে দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগ দরকার। সবখাতে বিনিয়োগ হতে পারে। ফলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে। কুয়াকাটায় আরও বিনিয়োগ করতে হবে। মানুষ কক্সবাজার বাদ দিয়ে কুয়াকাটায় যাবে।

তৈরি পোশাক মালিক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বন্দরের সক্ষমতার ওপর জোর দেন। আমাদের পতেঙ্গা টার্মিনাল, বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে ক্রেতারা অবগত। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ এর কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে এয়ারে (আকাশপথে) রপ্তানি সহজ হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলসহ অন্য মেগা প্রকল্পগুলো সম্পর্কে আমরা আপডেট করছি। এ সেতুর কারণে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়ই লাভবান হবেন।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচামাল আমদানি আরও সহজ, সুলভ ও দ্রুত হবে। এতে আমদানি-রপ্তানি আরও সহজ হবে। বিভিন্ন বন্দর এলাকায় পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রসার হবে। যদিও পায়রা বন্দরের অপারেশনের জন্য আমাদের আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে।

পদ্মা সেতুর বদৌলতে দেশের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যাবে, বিশেষত উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় নতুন ভূমিকা রাখবে দক্ষিণাঞ্চল।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, পদ্মা সেতু খোলামাত্রই জিডিপি বেড়ে যাবে ও শিল্প-কারখানা হয়ে যাবে, তা হবে না। আমি ব্যাংকগুলোতে দেখছি, গত দুই বছরে শিল্প-কারখানার যত প্রস্তাব এসেছে তার অধিকাংশই পদ্মার ওপাড়ের অঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে এবং এর অধিকাংশই কৃষিভিত্তিক শিল্প। এর মানে মানুষ অলরেজি ওইসব অঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। পদ্মা সেতুর কারণে ২০২৭ সালে জিডিপির ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ অবদান থাকবে। ওই সময় দেশের জিডিপির আকার হবে ৬৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ কোটি টাকা হবে দক্ষিণাঞ্চলের কারণে।

 

বিপি/ আইএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

এস আলম ও সাবেক রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ায় সাসপেন্ড ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা

বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস আলম ও ...

ভিসাকে বাংলাদেশে গ্লোবাল সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র বা গ্লোবাল সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের জন্য আর্থিক প্রযুক্তি ...

আমির খসরুর নেতৃত্বে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি

দেশে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশ ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ে ‘ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি’ ...

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানা, ঋণের সুদ মওকুফ চায় চট্টগ্রাম চেম্বার

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এ ...