জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১৬, ২০২৬ ৮:৩৫ পিএম , আপডেট: আগস্ট ১৬, ২০২৬ ৮:৩৮ পিএম

ইট দিয়ে দেড় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে কোটি টাকার অধিক বরাদ্দ। অথচ নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন। সর্বত্র কাঁদাযুক্ত বালু, আনা হয়েছে অতিনিম্নমানের ইট। রাস্তার পাশেই বসানো ড্রেজিং মেশিন। অভিযোগ—মাটির গভীর থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে সরাসরি সরকারি সড়ক নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার রাস্তার পুরোনো সোলিংয়ের ইট তুলে কোথায় রাখা হয়েছে, তা নিয়েও নেই স্বচ্ছতা।

খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বতুল বাজার এলাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মাণাধীন হেরিং বোন বোল্ড (এইচবিবি) সড়ক ঘিরে এমনই অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল রয়েছে। রাস্তার নির্মিত অংশে মানসম্মত ইটের পাশাপাশি নিম্নমানের ইটও ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যবহৃত ইটের পোড় অনেক কম। এছাড়া বালুর সাথে রয়েছে কাঁদার মিশ্রণ। শ্রমিকরা সাবগ্রেডের ওপর থেকে কাঁদাযুক্ত কিছু বালু সরিয়ে রাস্তার দুই পাশে ফেলছিলেন। তাদের ভাষ্য, ইট বিছানোর পর সেই বালু ছিটিয়ে ফাঁকা অংশ পূরণ করা হবে।

রাস্তার পাশেই চোখে পড়ে একটি ড্রেজিং মেশিন। স্থানীয়দের দাবি, মেশিনটি দিয়ে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করে সরাসরি নির্মাণকাজে সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে থাকা অবস্থাতেই নির্মাণকাজের জন্য ট্রাকে করে আনা হয় কয়েক হাজার নিম্নমানের ইট।

তবে ইট নামানোর দায়িত্বে থাকা শরিফুল ইসলাম অবশ্য বললেন অন্য কথা। তিনি বলেন, “মেম্বারসহ স্থানীয় কয়েকজনকে ইটের স্যাম্পল দেখানোর পর পছন্দ হওয়ায় এগুলো আনা হয়েছে। আগে যে ভাটা থেকে ইট নেওয়া হচ্ছিল, সেখানে আর এক নম্বর ইট না থাকায় অন্য ভাটা থেকে আনা হয়েছে।”

স্থানীয়দের দাবি, রাস্তার সাবগ্রেড তৈরি এবং এইচবিবির ওপরের ফাঁকা অংশ পূরণে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঁদাযুক্ত বালু। আর এই বালু সংগ্রহ করা হচ্ছে রাস্তার পাশের একটি মৎস্য খামার থেকে। সেখানে বসানো ড্রেজিং মেশিন দিয়ে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। আর এই বালু উত্তোলন ও সরবরাহের সঙ্গে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু হাসানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতি ঘনফুট বালুর জন্য ১৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এভাবে কয়েক লাখ টাকার বাণিজ্য চলছে বলে দাবি তাদের। এছাড়া কৃষি জমি থেকে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু তোলায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে সচেতনমহলের অভিযোগ। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে সরাসরি সরকারি কাজে ব্যবহার করার পরেও স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছে।

তবে ইউপি সদস্য আবু হাসান বালু নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমার বোনের জমি থেকে বালু দেওয়া হচ্ছে। প্রতি ঘনফুট বালুর জন্য আমার বোনকে ৯ টাকা দিতে হচ্ছে। আর বালু উত্তোলনের জন্য ড্রেজিং মেশিনের মালিক নিচ্ছে ৬ টাকা।”

বালুর মান নিয়ে তাঁর দাবি, বালু ভালো। উত্তোলনের সময় ওপরে সামান্য কাঁদার স্তর পড়ে। সেটি কেটে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, নতুন সড়ক নির্মাণের আগে ওই স্থানে ইটের সোলিং ছিল। কাজ শুরুর সময় সেগুলো তুলে ফেলা হয়। সরকারি সম্পদ হিসেবে ওই ইট ইউনিয়ন পরিষদে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা না করে পাশের একটি স্থানে রাখা হয়েছে। আর সেই স্থানটি ইউপি সদস্যের নিয়ন্ত্রণে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে আবু হাসান বলেন, “সোলিংয়ের ইট একত্রিত করে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার মাঠে রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের সবাই বিষয়টি জানেন। রেজুলেশনের মাধ্যমে পরে অন্য একটি সরকারি কাজে সেগুলো ব্যবহার করা হবে।”

তবে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম সরদার বলেন, “ওই রাস্তার বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। হাসান মেম্বারই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। ওই রাস্তাটি জনগুরুত্বপূর্ণও নয়। কীভাবে বরাদ্দ আনা হয়েছে, পুরাতন ইট কোথায় রাখা হয়েছে কিংবা কোথা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে আমি অবগত নই।”

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে উত্তর বেদকাশী ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে মোট দেড় কিলোমিটার এইচবিবি সড়ক নির্মাণে ১ কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কাজটি বাস্তবায়ন করছে মেসার্স হাজী এন্ড সন্স কর্পোরেশন। গত ২৮ এপ্রিল কাজ শুরু হয়ে ১০ জুনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে ৫০০ মিটার কাজ শেষ হলেও উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বতুল বাজার সংলগ্ন প্রায় এক কিলোমিটার অংশে কাজ চলছে। কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরত শেখ রামিম বলেছেন, রাস্তার পূর্বের সোলিংয়ের ইট অপসারণ করে কাজের পরিবেশ করে দিতে বিলম্ব হয়। এজন্য কাজ শুরু করতে আমাদের দেরি হয়। ভাটায় এখন খুব ভালো ইট পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক দূর থেকে ইট নিয়ে যেতে হচ্ছে। কাজ তুলতে আমাদের লোকসান হচ্ছে।

বালুর বিষয়ে তাঁর দাবি, “মানসম্মত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে পাশের মাটি ধুয়ে আসায় হয়তো কিছুটা কাঁদাযুক্ত মনে হচ্ছে। যথেষ্ট বরাদ্দ ও যাতায়াত ব্যবস্থা থাকার পরেও কেন অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালু সরাসরি সরকারি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি।”

কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, “কাজের শুরুতে নিম্নমানের ইট আনা হয়েছিল। সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়। পরে মানসম্মত ইট এনে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। তবে পুনরায় নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে।”

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেছেন, “ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে কিনা সেটা জানা নেই। কাউকে বালু উত্তোলনের জন্য অনুমতি দেয়া হয়নি। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

টিআর

শেয়ার

পাঠকের মতামত

নবীনগরে বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের প্রতিবাদে এবং ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক ...

শিবচরে আড়িয়াল খাঁ নদের তীব্র ভাঙনে হুমকিতে সড়ক-বেড়িবাঁধ

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আড়িয়াল খাঁ নদে আবারও তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। উপজেলার বহেরাতলা-কলাতলা পয়েন্টে সোমবার ...

সোনাগাজীতে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

“রূপালী মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ফেনীর সোনাগাজীতে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন ...