
ড. মুহাম্মদ মুঈনুদ্দীন মৃধা
পুলিশ জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। অথচ উপমহাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বাহিনী বহুবার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, পুলিশের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পুলিশ অনেক সময় সরকারের দলীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।
পুলিশ বাহিনী যখন আইন থেকে বিচ্যুত হয়ে সরকারের নির্দেশে নির্যাতনের যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন এটা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই ব্যর্থতার দায়ভার শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর ওপরও বর্তায়। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তাহলে পুলিশ বাহিনীকে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া যায়।
আমরা অনেক সময় রাষ্ট্র ও সরকারকে এক করে দেখি। অথচ রাষ্ট্রের চারটি মৌলিক উপাদান—ভূখণ্ড, জনগণ, সার্বভৌমত্ব ও সরকার—এর মধ্যে সরকার একমাত্র পরিবর্তনশীল উপাদান। সরকার আসে ও যায়, কিন্তু রাষ্ট্র থাকে। পুলিশ রাষ্ট্রের কর্মচারী, সরকারের নয়। কাজেই তাদের কাজ হওয়া উচিত দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কোনো দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা নয়।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলি—গত ১৯ ও ২০ জুন, ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পুলিশ আমার নিজ গ্রামে এসে আমার বৃদ্ধা মাকে হয়রানি করে। তারা জানায়, আমার নামে পুরনো এক রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে এবং তারা আমার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে। আমার মা একেবারে সাধারণ একজন বৃদ্ধা, কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। তার কাছ থেকে তারা ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করে। প্রশ্ন হলো—এ ধরনের হুমকি-ধামকি দিয়ে একজন নারীকে ভয় দেখানো কি কোনো আইনের অধীনে বৈধ? পুলিশ কি এখন জুলুম আর চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত হবে?
এ প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের পটিয়ায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশ যে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে, তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই বাহিনী এখনো গণবিচ্ছিন্ন একটি দমনযন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে পটিয়ায় একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। চোখে-মুখে গুলি খেয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিছিল ছত্রভঙ্গ করার কোনো আইনগত বা যৌক্তিক কারণ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতিশোধ। আহত ছাত্রদের কেউ এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পুলিশ সদস্যকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি।
আমরা যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চাই, তাহলে পুলিশের হাতে জনগণের ওপর নির্যাতনের হাতিয়ার তুলে না দিয়ে বরং তাদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত করে, আইন মেনে কাজ করতে বাধ্য করতে হবে। আজকে দেশের মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা নেই। কারণ অনেক পুলিশ কর্মকর্তা দলীয় স্বার্থে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে, বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে। জনতার ওপর গুলি চালানো, গ্রেপ্তার, মামলা, মারধর—এসব কর্মকাণ্ডে পুলিশ গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীকে ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে ব্যবহার করার ফলে অনেক জায়গায় জনগণের প্রতিরোধের মুখে পুলিশ সদস্যরা হতাহত হয়েছে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে এমন একটি ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এসব ঘটনায় তাদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না এবং কোনো মামলাও হয়নি। এটা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং নৈতিক সংকটেরও ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে রাজনীতি আজ জনসেবার জায়গা থেকে সরে এসে একটি পেশা হয়ে উঠেছে। এখন যারা রাজনীতিতে আছেন, তাদের অনেকেই সৎ নন, বরং ব্যক্তিস্বার্থে পরিচালিত। উচ্চশিক্ষা নয়, বরং নৈতিকতা ও দেশপ্রেম এখন রাজনীতির সবচেয়ে জরুরি উপাদান। যদি এমন আদর্শবান মানুষ রাজনীতিতে আসেন, যারা সত্যিকার অর্থে দেশ ও জনগণের কল্যাণ চান, তাহলে আমরা আশা করতে পারি পুলিশসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও আইনানুগ পথে পরিচালিত হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো দলের কর্মী নন। তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাদের কাজ দলীয় নেতৃত্ব তোষণ নয়, বরং সংবিধান মেনে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন। কিন্তু আমরা দেখছি, তারা আজ দলবাজিতে জড়িয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ সীমালঙ্ঘন করেছেন, জনগণের ওপর জুলুম চালিয়েছেন। পুলিশ সদস্যদের অনেকে এখন ‘আওয়ামী ট্যাগ’ নামক অপবাদে ভূষিত হয়েছেন—যা অনেক ক্ষেত্রে তারা আদায় করেননি, শুধুমাত্র সরকারের আজ্ঞাবহ থেকে দায়িত্ব পালনের কারণে পেয়েছেন।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন জরুরি, যার মাধ্যমে একটি ন্যায়নিষ্ঠ সরকার প্রতিষ্ঠা পাবে। সেই সরকারের দায়িত্ব হবে পুলিশসহ সব বাহিনীকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
সবশেষে বলব, রাজনীতি কখনোই পেশা হতে পারে না। যারা রাজনীতিকে পেশা বানায়, তারা আসলে দেশ নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তেই রাজনীতিতে আসেন। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অযোগ্যতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের এই সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে, রাজনৈতিক নেতৃত্বে দরকার আদর্শবাদী ও সৎ মানুষের অনুপ্রবেশ। নইলে আমাদের সমাজ আর কখনোই ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নিরাপদ হবে না।
(লেখক : মানবাধিকার কর্মী, লন্ডন)
- ১চাঁদপুরে ইলিশের আকাল, কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ দল
- ২রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে
- ৩জিয়াউল আহসানের বাড়িতে দুদকের অভিযান শেষ, মালামাল জব্দ
- ৪কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ
- ৫জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.২ শতাংশ, বড় পতন শিল্প ও সেবাখাতে
- ৬পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বেড়েছে ৯০ শতাংশ
- ৭চলমান প্রকল্পগুলোকে পরিমার্জন করা হবে : পরিবেশমন্ত্রী
- ৮তাড়াশে ৬১ বছরের পুরানো ঈদগাহ দখলের অভিযোগ
- ৯পুরানা পল্টন কলেজের নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
- ১০গ্রাহকদের জন্য নিজস্ব ওএমএস চালু করছে মর্ডান সিকিউরিটিজ
- ১রণক্ষেত্র দিল্লি: ভারতের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় আন্দোলনের’ ডাক সিজেপির
- ২কেশবপুরে দুই দিনব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
- ৩মতিগঞ্জে টর্নেডোয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে আর্থিক অনুদান প্রদান
- ৪সারাদেশে ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
- ৫মেসি নয়, সেরা খেলোয়ারের পুরস্কার জিতলেন রদ্রি
- ৬আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই বেনামি
- ৭সাতক্ষীরায় বিলে মৎস্য ঘের থেকে গাড়িচালকের মরদেহ উদ্ধার
- ৮কমলগঞ্জে মনিপুরি গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
- ৯প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হলেন রাশেদ খাঁন
- ১০চাঁদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়া খাবার তৈরি করায় জরিমানা





পাঠকের মতামত