নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৫ ৩:১৪ পিএম , আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৫ ৩:৪৮ পিএম

** বৈশ্বিক বাজার ১০২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
** ২০৩০ সালে এ খাতের বৈশ্বিক বাজার হবে ১৫০ বিলিয়ন
** বাংলাদেশের রপ্তানি ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
** গুণগত মান উদ্ভাবন এবং নকশায় গুরুত্ব দিলে বৈশ্বিক বাজারের বড় অংশই হবে বাংলাদেশের

খেলানা সামগ্রী রপ্তানির বৈশ্বিক বাজার ১০২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩০ সালে এ খাতের বৈশ্বিক বাজার ১৫০ বিলিয়নে পৌঁছাবে। বর্তমানে এই খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পণ্যের গুণগত মান উদ্ভাবন এবং নকশায় গুরুত্ব দিলে বৈশ্বিক বাজারের বড় অংশ বাংলাদেশের দখলে থাকবে। এতে রপ্তানি খাতে গুটি কয়েক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কাটার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা চেম্বার অব কমার্স (ডিসিসিআই) আয়োজিত “রপ্তানি বহুমুখীকরণ: খেলনা উৎপাদন শিল্পে উদ্ভাবন এবং রপ্তানির সম্ভাবনা” শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

আলোচনা সভার অনুষ্ঠানের সভাপতি ও ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ স্বাগত বক্তব্যে বলেন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের বিষয়টি বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিগত বছরগুলোতে আমাদের রপ্তানি গুটিকয়েক পণ্যের উপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল। ডিসিসিআই সভাপতি জানান, খেলানা সামগ্রী রপ্তানির বৈশ্বিক বাজার ১০২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেটি ২০৩০ সালে ১৫০ বিলিয়নে পৌঁছাবে, সেখানে এ খাতে আমাদের রপ্তানি মাত্র ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনুপস্থিতি, টেস্টিং সুবিধার অপ্রতুলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা, ব্যবহৃত কাঁচামালে আমদানি নির্ভরতা ও আমদানি পণ্যের উপর উচ্চ শুল্কারোপ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সহায়ক নীতিমালার অভাবে এখাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে জানান তাসকীন আহমেদ।

আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস্ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জালালাবাদ পলিমান ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, প্লাস্টিক খাতে বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের মত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ২৫০টি খেলনা সামগ্রী উৎপাদনের সাথে জড়িত এবং এখাতে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত রয়েছে।

এই খাতে রপ্তানির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এখাতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তিনি জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খেলনা সামগ্রী রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৮টি দেশে রপ্তানির মাধ্যমে তা ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

তবে পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ, অপ্রতুল অবকাঠমো, গবেষণা কার্যক্রমের অনুপস্থিতি এবং নতুন পণ্যের ডিজাইন উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকা প্রভৃতি বিষয়সমূহের কারণে এখাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। সেই সাথে এখাতের সার্বিক উন্নয়নে পণ্য উদ্ভাবন কাজে মানব সম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রদান, জয়েন্ট ভেঞ্চার বিনিয়োগকে উৎসাহিত করণ, অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন, প্লাস্টিক খাতের উন্নয়ন নীতিমালার মধ্যেই খেলনা সামগ্রী শিল্পের নীতিমালা প্রণয়ন, পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির উপর সম্পূরক শুল্ক হ্রাস প্রভৃতির উপর জোর দেন তিনি।

প্রেমিয়াফ্লেক্স প্লাস্টিকস লিমিটেডের ডেপুটি এক্সিকিউটি ডিরেক্টর আনিসুর রহমান বলেন, আমাদের নীতি তুলে ধরলেও তা বাস্তবায়ন হয় না। খেলনা শিল্পে মোল্ড এবং ডিজাইনের গুণগত মান পূর্ণ হচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ট্যারিফ আরোপের ক্ষেত্রে সরকারকে চিন্তাভাবনা করে ট্যারিফ আরোপ করার পরামর্শ দেন তিনি।

হ্যাসি টাইগার কোম্পানী লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মুসা বিন তারিক রপ্তানি বাধা দূর করণের ওপরে জোর দিয়ে বলেন, মূলত আমরা খেলনা ২০১২ সাল থেকে উৎপাদন করছি। আমাদের মূল ক্রেতা হচ্ছে জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড। আমাদের রপ্তানির যে কোয়ালিটি, আমরা জাপানি স্ট্যান্ডার্ডটাই ফলো করি। আমাদের দেশে বড় সুযোগ আছে। কাস্টমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধার কারণে খেলনা রপ্তানি সময়মতো করতে না পারার কথাও বলেন তিনি।

রেডমিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক ও বিপণন বিভাগে প্রধান জহিরুল ইসলাম শিমুল বলেন, আমরা অনেক সময় দেশীয় বাজারের জন্য যে পণ্যগুলো উৎপাদন করে থাকি তারা পণ্যের গুণগত মানে গুরুত্ব না দিলেও বাংলাদেশের বাজারে পণ্য দিতে পারি। কিন্তু বৈশ্বিকভাবে যখন আমরা আমাদের পণ্য নিয়ে দাঁড়াবো তখন কিন্তু আমাদের পণ্যে গুণগত মান সম্পূর্ণভাবে দিতে হবে।

ইউরোপের শিশু নিরাপত্মা আইনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো সার্টিফিকেশন আছে। এগুলোতে মনোযোগ দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সহজ হবে বলে জানান তিনি। বৈশ্বিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে পণ্যের গুণগত মান উদ্ভাবন এবং ডিজাইনের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করলে খেলনা রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পারব। এছাড়াও খেলনা উৎপাদক কোম্পানিগুলোকে অভিজ্ঞদের স্বমন্বয়ে রপ্তানি ডেস্ক তৈরির পাশাপাশি উদ্ভাবন এবং পণ্যের ডিজাইনে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তর ওয়েস্ট কেমিক্যাল ম্যানেজমেন্ট শাখার উপপরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা মনে করি যে আমাদের টেক্সটাইল ও লেদার এবং ফার্মাসিউটিক্যালস এর পরে যদি গল্প করার মত একটা সেক্টর থাকে তাহলে সেটা প্লাস্টিক সেক্টর। আমার মনে হয় যে সরকারেরও ইতিবাচক মনোভাবের আছে। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন যে আমাদের সম্প্রতি যে এনভয়মেন্ট কনজারভেশন রুলস হয়েছে। সেই রুলসে প্লাস্টিক সেক্টরকে গ্রিন ক্যাটাগরিতে নিয়ে এসেছে। রিসাইংক্লিং সেক্টরকে ইয়োলো ক্যাটাগরিতে আনা হয়েছে।

এই ক্যাটাগরিতে আসার সুবিধা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, গ্রীণ ক্যাটাগরিতে আসা মানে পাঁচ বছর কোন রিনিউয়াল লাগবে না। এটার মানে একটা ব্যবসাকে সহজীকরণ করা, এক ধরনের অল্টারনেটিভ প্রমোশন বলা যেতে পারে। এছাড়াও আমাদের হলুদ ক্যাটাগরিও কিন্তু দুই বছর রিনিউয়াল লাগে না। সুতরাং এই বিষয়গুলো আসলে আমাদের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ বলা যেতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর বলেন, এলডিসি পরবর্তী সময়ে তৈরি পোষাকের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতের উপর নজর দিতে হবে, এলক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সহজীকরণ ও বন্ডেড সুবিধা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, গত ৪০ বছর ধরে তৈরি পোষাকখাতে সহায়তা দেওয়া হলেও এখাতের সক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে তা নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে, তাই খেলনা শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রাপ্তির চাইতে নিজেদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং পণ্যের উদ্ভাবনী কার্যক্রমে বেশি হারে মনোযোগী হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৃটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডওসন বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত খেলনা পণ্য রপ্তানির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে এবং বৃটিশ সরকার এখাতে সহযোগিতা করতে বেশ আগ্রহী। বিদ্যমান নীতিমালার সংষ্কার ও প্রতিবন্ধকতা নিরসন করা সম্ভব হলে বৃটেনে এখাতের পণ্যের রপ্তানি আরো বহুগুন বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মার্টিন ডওসন জানান, বৃটিশ সরকার সম্প্রতি রুলস অব অরিজিনের শর্তাবলী সহজীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের তাঁর দেশে পণ্য রপ্তানি সম্প্রসারণে সহযোগিতা করবে। তিনি উল্লেখ করেন, এনবিআর শিল্পখাতের কাঁচামালের কাস্টম্স ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ সহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা নিরসন করেছে, যা বাংলাদেশের সামিগ্রক রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এআইর ব্যবহার সম্ভাবনাময়

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ব্লকচেইনের ব্যবহার সম্ভাবনাময় বলে জানিয়েছেন আলোচকরা। শনিবার (১৯ জুলাই) ...

এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ ও ক্রয়ব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে টিসিবি

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)ভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ এবং সরকারি ...

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান সাড়ে ১৭ শতাংশ

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশের সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাসের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন ...

ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় যাবে আর্থিক সেবা : অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে মানুষের সেবা ...

বাজার মনিটরিং আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার তাগিদ বাণিজ্য সচিবের

বাজার মনিটরিং কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, সমন্বিত ও ফলপ্রসূ করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়, আন্তরিক সহযোগিতা ...