বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১৬, ২০২৬ ১:৪৯ পিএম
ছবি: এআই দ্বারা নির্মিত

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) সব ধরনের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। সিদ্ধান্তের পর দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান কোনো দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। তবে গত কয়েক মাসে ছাত্রদলের বিভিন্ন কার্যক্রম, ছাত্রশিবিরের প্রকাশনীর স্টিকার এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক তৎপরতার চিহ্ন সামনে আসায় ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের ১০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রিজেন্ট বোর্ডের ১০৩তম জরুরি সভায় যবিপ্রবির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রুলস অব ডিসিপ্লিন ফর স্টুডেন্টস’-এর পার্ট-১-এর জেনারেল রুলস-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষ এবং প্রক্টর/প্রভোস্টের অনুমতি নিয়ে সাংগঠনিক বা অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ‘যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০১’-এর ধারা ৪৭(৫) এবং ‘সাধারণ আচরণ, শৃঙ্খলা ও আপীল সংক্রান্ত বিধি’-এর বিধি-৩(জ) অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। ওই বিধিতে কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর রাজনৈতিক মতামত প্রচার কিংবা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আইন, বিধি ও রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্তের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে এসব সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট আইন-বিধি লঙ্ঘন করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

দেড় বছর ছিল রাজনৈতিক কর্মসূচিমুক্ত

রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের পর দেড় বছরেরও বেশি সময় যবিপ্রবি ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান কোনো দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি দেখা যায়নি। এ সময়ে একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে। দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন সংগঠন ও ক্লাবের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করেই শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের ক্যাম্পাস জীবন পরিচালিত হয়েছে।

তবে জাতীয় নির্বাচনের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রদলপন্থী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কার্যক্রম দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ভর্তি পরীক্ষার সময় হেল্প ডেস্ক পরিচালনা, নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ, দোয়া মাহফিল ও সামাজিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়।

এ ছাড়া ‘যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল’ নামে ফেসবুক পেজ পরিচালনা, প্রকাশ্যে নিজেদের ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে দলীয় পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আসার পরও ছাত্রদল পরিচয়ে তাঁর কাছে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার ঘটনা সামনে আসে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়েও প্রশ্ন

শুধু শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন পোস্টের মন্তব্যে বিএনপি, এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে তাদের লেখালেখি করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া শিক্ষকদের একটি গ্রুপ নিজেদের বিএনপিপন্থী দাবি করে ‘সাদা দল’-এর কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়। পরে একটি খসড়া তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তারা কমিটি গঠন থেকে বিরত থাকেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এসব কার্যক্রম কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

প্রকাশ্যে কার্যক্রম নেই, মিলছে শিবিরের স্টিকার

ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে যবিপ্রবি ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বা আত্মপ্রকাশ দেখা না গেলেও তাদের প্রকাশনী আইসিএস পাবলিকেশনের কিছু স্টিকার ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুন্সি মেহেরুল্লাহ হলের নোটিশ বোর্ড, লিফট, বিভিন্ন একাডেমিক ভবন ও মসজিদে এসব স্টিকার দেখা গেছে।

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের তৎপরতার চিহ্ন

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রমের চিহ্নও ক্যাম্পাসে দেখা গেছে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের মে মাসে যবিপ্রবির মুন্সি মেহেরুল্লাহ হলের বিভিন্ন দেয়াল ও লিফটের সামনে ‘শেখ হাসিনা আসছে, বাংলাদেশ কাঁপছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যবিপ্রবি শাখা। ছাত্রলীগে যোগ দাও’—এমন লেখা দেখা যায়।

এরপর গত ২৫ জুলাই যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ১৯ সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদনের খবর পাওয়া যায়। কমিটিতে ১৬ জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং তিনজনকে সদস্য করা হয়। তবে কমিটিতে থাকা কয়েকজনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব নেই বলেও জানা গেছে। যদিও অনুমোদিত ওই কমিটির কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম ক্যাম্পাসে দেখা যায়নি।

দলীয় ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা

জুলাই-পরবর্তী সময়ে যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দলীয় ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংগঠন এবং কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছে।

প্রশাসনের অবস্থান কী

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. হামিদুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক সরকার আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিক্ষার্থীদের জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সবকিছু পরিচালিত হবে। সে অনুযায়ী প্রক্টর দপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি টানিয়ে ক্যাম্পাসে রাজনীতি ও র‌্যাগিং নিষিদ্ধ করা হয়। সবার প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে।

তিনি বলেন, অফিশিয়াল নীতিমালায় রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার পরও কেউ গোপনে বা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি লঙ্ঘন হলে প্রশাসন অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

তিনি বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী কেউ যদি ক্যাম্পাসে দলীয় পরিচয় বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে সরাসরি মিছিল, সভা-সমাবেশ কিংবা কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন, তাহলে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের দুই বছর পর প্রশাসনের দাবি, ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ, স্টিকার ও সাংগঠনিক তৎপরতার চিহ্ন সামনে আসায় সিদ্ধান্তটির বাস্তব প্রয়োগ ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বেরোবিতে স্নাতক পাসের আগেই জালিয়াতি করে সোহানের চাকরি, এবার স্থায়ীকরণের উদ্যোগ

স্নাতক পাসের আগেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরিতে যোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ...

ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় জরুরি বৈঠকে সাংবাদিকদের ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) গত ৪ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’-এর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিবির ও ...

ইউজিসি সদস্য মামুন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির চালিকাশক্তি হবে তরুণরা

কৃষির আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে তরুণদের, বিশেষ করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সময়োপযোগী দক্ষতায় ...

পেশাগত দক্ষতা ও গবেষণা উন্নয়নে যবিপ্রবির সঙ্গে তিন প্রতিষ্ঠানের চুক্তি

আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, এআই এর সঠিক ব্যবহার ও গবেষণা ভিত্তিক বাস্তব ...

প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে ইবিতে দোয়া মাহফিল

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপার্সন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ...