এসআর শফিক স্বপন, মাদারীপুর
প্রকাশিত: আগস্ট ৯, ২০২৬ ১১:৩৯ এএম

একসময় আড়িয়াল খাঁ নদী ছিল মাদারীপুরের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান ভরসা। নদীর পানি ও পলিতে উর্বর হতো কৃষিজমি, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে ঘিরে চলত বহু পরিবারের সংসার। সেই নদীই এখন তীরবর্তী মানুষের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে আড়িয়াল খাঁর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। ইতোমধ্যে বসতভিটা, ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি হারিয়েছেন অনেক পরিবার। নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক পরিবার।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া ও চরহোগলপাতিয়া এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড় ধসে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি তোলা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশ ও তীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভাঙন বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাকিব সরদার অভিযোগ করেন, একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। ড্রেজার দিয়ে বালু কাটার পর থেকেই নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের মাত্রা বেড়েছে। দ্রুত এসব কার্যক্রম বন্ধ করা না হলে আরও অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে বলে আশঙ্কা তাঁর।

জমি হারিয়ে অন্যের জায়গায় আশ্রয়

হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. এনামুল আকনের জীবনও নদীভাঙনে বদলে গেছে। একসময় প্রায় ১০ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন তিনি। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে ধীরে ধীরে তাঁর জমি নদীতে বিলীন হতে শুরু করে। একপর্যায়ে পারিবারিকভাবে পাওয়া দুই বিঘা জমির পাশাপাশি বসতভিটাটুকুও নদীগর্ভে চলে যায়। বর্তমানে পরিবার নিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

এনামুল আকন বলেন, ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার পর থেকেই নদীটা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করতেও ভয় লাগে। যারা এসব করছে, তারা খুব প্রভাবশালী। এখন আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।

ফসলি জমি ও বসতবাড়ি হারিয়েছেন টিটল

একই গ্রামের বাসিন্দা টিটল আকনের গল্পও প্রায় একই। নদীভাঙনে তাঁর গোলাভরা ধান, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি—সবই নদীগর্ভে চলে গেছে। শেষ পর্যন্ত নদীর ওপারে নিজের মাত্র ছয় শতাংশ জমিতে নতুন করে ঘর তুলেছেন তিনি।

টিটল আকন বলেন, আগে এ এলাকায় নদীভাঙনের এমন ভয়াবহতা দেখা যেত না। ড্রেজার বসানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। তবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভয়ে স্থানীয়দের অনেকেই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে চান না।

সন্ধ্যার পর শুরু হয় বালু উত্তোলন

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের অধিকাংশ সময় সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত আড়িয়াল খাঁ নদীর বিভিন্ন অংশে দুই থেকে তিনটি ইঞ্জিনচালিত ড্রেজার দিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়। এসব ড্রেজারের সঙ্গে থাকে বালু পরিবহনের নৌযানও।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজর এড়াতে দিনের বেলায় ড্রেজার ও বালুবাহী নৌযান অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়। ফলে দিনের বেলায় সরেজমিনে গিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কারা এই বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত—এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অনেকেই প্রকাশ্যে কারও নাম বলতে রাজি হননি। তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ভয়ে প্রতিবাদ করাও কঠিন।

ভাঙনের ঝুঁকিতে অর্ধশতাধিক পরিবার

স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক পরিবার নদীভাঙনে বসতভিটা ও জমি হারিয়েছে অথবা সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিদিন নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করা না হলে সামনে আরও বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে হোগলপাতিয়া ও চরহোগলপাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শুভ সরকার বলেন, পানির স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর প্রতিটি বাঁকেই ভাঙন দেখা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে সমীক্ষা চলছে। অচিরেই ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাতের আঁধারে ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করা হলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসনের আশ্বাস

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মিজ্ মর্জিনা আক্তার বলেন, নদীভাঙন মাদারীপুর জেলার একটি বড় সমস্যা। আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। নদীভাঙন রোধে সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে তিনি কয়েকটি ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সরকারের কাছে ছবি পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ভূরুঙ্গামারীতে জমি নিয়ে সংঘর্ষে যুবক নিহত, দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ১৭

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে শহিদুল ইসলাম (৩০) নামে ...

বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান মার্কিন রাষ্ট্রদূতের

যুক্তরাষ্ট্র ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদায় বিশ্বাস করে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ...

কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯০ শিক্ষার্থী

কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। এবারের পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ...