জাকির হোসাইন, নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০২৬ ৮:৫৫ এএম , আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০২৬ ৮:৫৬ এএম

চীনের বন্ড বাজারের আকার ২৩ হাজার ৯৯৫ বিলিয়ন ডলার
জাপানের বন্ড বাজার ৯ হাজার ৫৩৬ বিলিয়ন ডলার
ভারতের বন্ড বাজার ২ হাজার ৭৮০ বিলিয়ন ডলার

বন্ড মার্কেট নাই বলেই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের উপর নির্ভর করছে- ড. মো. এজাজুল ইসলাম-মহাপরিচালক (বিআইবিএম)

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা হঠাৎ করে বেশি বেশি লাভ চায়: আবু আহমেদ চেয়ারম্যান আইসিবি

বন্ড মার্কেট না থাকার মূল কারণ ব্যবসায়ীরা বেশি বেশি ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভর করে- অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসা – অর্থনীতিবিদ ও ডিন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস

বন্ড বাজার ছাড়া তো পুঁজিবাজার পরিপূর্ণ হয় না-সাইফুল ইসলাম, প্রেসিডেন্ট, ডিবিএ

বিএসইসির পক্ষ থেকে বন্ড বাজারের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে- আবুল কালাম, পরিচালক এবং মুখপাত্র,বিএসইসি

বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের উৎস হিসেবে পরিচিত বন্ড এবং পুঁজিবাজার। তবে দেশের অর্থনীতির চিত্র ভিন্ন—দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড ও পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাক ঋণই প্রধান ভরসা। ফলে একদিকে যেমন বেড়েছে খেলাপি ঋণ, অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তৈরি হয়নি পণ্যের বৈচিত্রতা। তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে বন্ড ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করায় জোর দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

বন্ড বাজারের বৈশ্বিক চিত্র: এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বন্ড বাজারের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বন্ডের সবচেয়ে বড় বাজার রয়েছে চীনে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে চীনের বন্ড বাজারের মোট আকার দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৯৯৫ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান, যার বাজার আয়তন ৯ হাজার ৫৩৬ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ দেশ ভারত ২ হাজার ৭৮০ বিলিয়ন ডলারের বাজার নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে, আর ২ হাজার ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারের বাজার নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ভারতের পরে অবস্থান করছে। ৬৯৫ বিলিয়ন ডলারের বন্ড বাজার নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। ৫৪৪ বিলিয়ন ডলারের বন্ড বাজার নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। সপ্তম অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়ার রয়েছে ৫৩০ বিলিয়ন ডলারের বন্ড বাজার। ইন্দোনেশিয়ার ৪৭৬ বিলিয়ন ডলার, আর ফিলিপাইনের ২৩৭ বিলিয়ন ডলারের বন্ড বাজার রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই রয়েছে পাকিস্তান। দেশটির ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের বন্ড বাজারের আকার ১৩৬ বিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কার ৬০ বিলিয়ন ডলার এবং নেপালের ১৮ বিলিয়ন ডলার।

দেশের চিত্র ভিন্ন, উল্টো পথে অর্থনীতি: এশিয়ার বন্ড বাজারের যখন এমন চিত্র তখন দেশের বাজারে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে দেশের বন্ড বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বন্ড বাজারের তুলনামূলক পর্যালোচনায় বাংলাদেশের নিচে রয়েছে মাত্র একটি দেশ নেপাল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিকভাবে প্রচলন হলো কোন দেশের বন্ড বাজার সবচেয়ে বড় হয়, এরপরে রয়েছে পুঁজিবাজার এবং তার পরে রয়েছে অর্থবাজার অর্থাৎ ব্যাংক খাত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন দেশের অর্থনীতির এই চিত্র প্রচলিত বৈশ্বিক মডেলের উল্টো। পাশাপাশি বন্ড বাজার না থাকায় এবং অতি মাত্রায় ব্যাংক ঋণ নির্ভরতার কারণে দেশে খেলাপী ঋণের চাপ বেড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, “আমাদের দেশে বন্ড মার্কেট নাই বলেই সমস্ত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের উপর নির্ভর করছে। এজন্য ব্যাংক খাতের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি ডিপোজিট নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিলে সেটি অর্থনীতিতে মিসম্যাচ তৈরি করে।”

কেন গড়ে ওঠেনি দেশের বন্ড বাজার? দেশের অর্থনীতির এই উল্টো চিত্র কেন এমন প্রশ্নের জবাবে উঠে এসেছে অর্থনীতিবিদ এবং ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসার ব্যক্তব্যে। তিনি বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, “দেশে বন্ড মার্কেট হওয়া উচিত, কিন্তু আমার দেশে কর্পোরেট বন্ড নাই বললেই চলে। যেটার বড় কারণ হল কর্পোরেশনসের মালিক যারা আছেন, বিজনেসের মালিক যারা তারা বেশি বেশি ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভর করে।”
বন্ড মার্কেট না হওয়ার আরও একটি বড় কারণ হিসেবে ঝুঁকি পরিমাপ করতে না পারাকে দায়ী করেছেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে বন্ডের যে রিস্ক আছে সেই রিস্কটাকে প্রপারলি এসেস করা যায় না। এ কারণে ডিমান্ড সাইডটাও নাই আর সাপ্লাই সাইডটা তো নাই বললেই চলে।”

আরেক অর্থনীতিবিদ ও সরকারী মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারী খাতের কোম্পানিগুলো অনেক আগে ডিবেঞ্চার ছাড়তো। তখন ডিবেঞ্চার কিনে অনেকে প্রতারিত হয়েছে। মানে ওই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষকে প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী সুদ দিতে পারে নাই অথবা আসল দিতে দেরি করেছে। একারণে বিশ্বাসযোগ্য কোন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি ছাড়া মানুষ অন্যদের বন্ড কিনতে চায় না। ফলে তারা ব্যাংক থেকে টাকা নেয়।

দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা বন্ডে আগ্রহী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা হঠাৎ করে বেশি বেশি লাভ চায়। ১০০ টাকায় ১ বছরে ১০ টাকা পাওয়ার জন্য এসব বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ দেখান না।”

করণীয় কী? অর্থনীতিকে সঠিক কাঠামোয় আনতে বন্ড ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও প্রকল্পে অর্থায়নের উৎস হিসেবে বন্ড ও পুঁজিবাজারকে গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক ঋণের প্রবণতা দূর করতে হবে।
তবে বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করতে প্রথমে ট্রেজারি বন্ডকে সক্রিয় করার কথা পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক মুসা বলেন, “আমাদের দেশে ট্রেজারি বন্ডের বাজারটাও সক্রিয় না। বন্ড বাজার গড়তে ট্রেজারি বন্ডগুলোকে সক্রিয় করা যেতে পারে। “
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন বন্ডের মাধ্যমে বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, “পদ্মা সেতু, ঢাকা বিমান বন্দরের থার্ড টার্মিনালের মতো আরও প্রকল্প যেগুলা হয়েছে সেগুলার ক্যাশ ফ্লোর বিপরীতে বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে একসঙ্গে সরকার টাকা পেয়ে যেত। সেটা দিয়ে আরেকটা প্রকল্প করতে পারত। তবে ওই পদ্ধতি শুধু কিতাবেই আছে বাস্তবে করা হয় না।”

পেনশন ফান্ড, ইনস্যুরেন্স ফান্ড তৈরির পাশাপাশি নিয়ম কানুন সহজ করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন ড. এজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “নিয়ম কানুন সহজ সহজ করতে হবে যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ড ইস্যু করবে আর মানুষ কিনতে পারে। এর পাাশাপাশি বাজার তৈরি করতে হবে যাতে বাই সেল করা যায়।”

বন্ড বাজার হলে পুঁজিবাজার পাবে পূর্ণতা, বাড়বে পণ্যের বৈচিত্রতা: পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্ড বাজার থাকলে পুঁজিবাজারও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারে পণ্যের যে বৈত্রিত্যহীনতা বিদ্যমান সেটিও দূর হবে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এবং ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট এবং সাইফুল ইসলাম বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, “বন্ড বাজার ছাড়া তো পুঁজিবাজার পরিপূর্ণ হয় না। বাজারের পুরো টাকা আমরা ইকুইটিতে রেখেছি। শক্তিশালী বন্ড বাজার থাকলে পুঁজিবাজারে আর্থিক পণ্যে বৈচিত্র্য থাকতো। কিন্তু আমরা এই বাজার তৈরি করতে পারিনি।”

কী ভাবছে বিএসইসি:বন্ড বাজারের উন্নয়নে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পদক্ষেপ জানতে চাইলে সংস্থাটির পরিচালক এবং মুখপাত্র আবুল কালাম বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমান কমিশনের মূল লক্ষ্যই হলো পুঁজিবাজার হবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসির সমন্বয়ে একটা যৌথ কমিটি কাজ করছে। বিএসইসির পক্ষ থেকে বন্ড বাজারের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এসব প্রস্তাবে ব্যাংক ঋণের সীমা নির্ধারণ, ডেট ইক্যুইটি রেশিও বেঁধে দেওয়া বা ঋণ ও মালিকানায় থাকা মূলধনের অনুপাত নির্ধারণ করে দেওয়া এবং ঋণের মেয়াদ নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব শর্ত প্রতিপালন না হলে বন্ড বাজারের উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া বিএসইসির উদ্যোগে ডেট সিকিউরিটিজ রুল ২০২১ সংশোধনের কথাও জানান এই কর্মকর্তা।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ডিজিটাল অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক জালিয়াতি

প্রতি দুই সাইবার অপরাধের একটিই এখন আর্থিক জালিয়াতি ৫ বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে সাইবারভিত্তিক আর্থিক ...

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত ৪৪ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান

১০ হাজার একর শিল্পভূমি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত চিনিকল, পাটকল, টেক্সটাইল, ইস্পাত কারখানা, প্রকৌশল শিল্পসহ বিভিন্ন ...

লোকসানে পুরো ব্যাংক খাত

দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, তারল্য সংকট ও মুনাফা কমে যাওয়ার চাপে ...