জাহাঙ্গীর আলম আনসারী, সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৫ ৫:০৩ পিএম
  • ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২৪৮১ কোটি টাকা
  • বর্তমানে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা
  • এক বছরে বেড়েছে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা
  • তিন মাসে বেড়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা
  • মোট খেলাপি ১১৮৫৪৫৬ জন
  • ইচ্ছাকৃত খেলাপি ৩৪৮৩ জন

বিগত আওয়ামী লীগের আমলে অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের লুটপাটের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল দেশের ব্যাংক খাত। নামে-বেনামে ও কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে জালিয়াতি করে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে গেছে। এসব টাকা টাকার অধিকাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের সময় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর ১৬ বছর পর সেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১১৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৩ শতাংশ। সেই হিসাবে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩০ গুণ। এই সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ তুলেছে, যেগুলোর অনেকটাই বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আর ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, এটাই খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নয়। এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৭৬ লাখ ৫ হাজার ৯২৩ জন। গত জুন শেষে মোট বিতরণ করা ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫৬ জন অর্থাৎ মোট ঋণগ্রহীতার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশই খেলাপি। এ ছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৪৮৩ জন। এই বিপুলসংখ্যক খেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ঋণ অবলোপন হয়েছে এমন গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৬ জনে। অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। তবে আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া হিসাবগুলো যুক্ত করলে এই অঙ্ক দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ৫৪২ কোটি টাকায়। এ ছাড়া আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আটকে আছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৭ লাখ ৭ হাজার ২৯৬ কোটি টাকায়।

এর মধ্যে ব্যাংক খাতেরই খেলাপি ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। আর অবলোপনকৃত ঋণসহ হিসাব করলে এই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ বা অনাদায়ী অবস্থায় আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। এতদিন পর্যন্ত অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার ঋণ গোপন বা নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো। কিন্তু নতুন প্রশাসনের অধীনে যখন এসব হিসাব পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তখনই বেরিয়ে আসছে প্রকৃত খেলাপির সংখ্যা ও অঙ্ক।

তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত এক বছরে বেড়েছে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, এক বছরের ব্যবধানে তা প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছে। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা দেশের আর্থিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।

তথ্য বলছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অবস্থাই সবচেয়ে খারাপ। বর্তমানে এসব ব্যাংকের মোট ঋণের ৪৫ শতাংশ খেলাপি, যা গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৪২.৮৩ শতাংশ। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপির হারও বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে—গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি ছিল ১৫.৬০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র বলছে, বিশেষ করে ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এগুলো হলো— ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বেশিরভাগই আগে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ব্যাংকগুলোর এস আলমের প্রভাবমুক্ত হওয়ার পর এগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত (মার্জার) করার প্রস্তুতি নিয়েছে, যাতে এ খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়।

বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেশের জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। এই ঋণ আদায় না হলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিচ্ছে, সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি করছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথমত, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও সম্পদ জব্দের উদ্যোগ; দ্বিতীয়ত, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য নীতি সহায়তা প্রদান, যাতে তারা উৎপাদন সচল রেখে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন; তৃতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী এক থেকে দুই প্রান্তিকের মধ্যেই ব্যাংক খাত কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে স্থায়ী সমাধান আসবে না।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও ‘এক্সিট’ সুবিধা

ব্যাংকের পর এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও (ফাইন্যান্স কোম্পানি) খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিলেন আবেদুর রহমান

নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আবেদুর রহমান ...

পুরনো মালিকদের হাতে আল-আরাফাহ ব্যাংক ফিরিয়ে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার ভার পুরনো মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার ...