জাকির হোসাইন, নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জানুয়ারী ১, ২০২৬ ৬:৩৬ পিএম
  • ডেসকোতে পুনরুদ্ধার অযোগ্য পাওনা ৩১১ কোটি ও প্রভিশন ঘাটতি, বাতিল প্রকল্পেও সম্পদ দেখানোর অভিযোগ
  • ডরিন পাওয়ারে পিপিএ শেষ, ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তা
  • খুলনা পাওয়ারে চুক্তিহীন উৎপাদন ও সম্পদ অবমূল্যায়নের ঝুঁকি
  • পাওয়ার গ্রিডে আন্তর্জাতিক হিসাবমান না মানার অভিযোগ

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের একাধিক কোম্পানির আর্থিক শৃঙ্খলা, চুক্তির ধারাবাহিকতা এবং সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন নিয়ে গুরুতর ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কোন কোন কোম্পানিতে শত শত কোটি টাকার পাওনা আদায় অনিশ্চিত, আবার কোনও কোম্পানির মেয়াদোত্তীর্ণ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ব্যবসার ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পাশাপাশি অনিরাপদ ঋণ, পর্যাপ্ত সঞ্চিতির অভাব এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসরণ না করার অভিযোগও উঠে এসেছে।

২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব বিষয় মিলিয়ে এই খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ২৩টি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি রয়েছে ১১টি। ৪ টি কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে মিলেছে এমন তথ্য।

ডেসকোতে পুনরুদ্ধার অযোগ্য পাওনা ৩১১ কোটি ও প্রভিশন ঘাটতি, বাতিল প্রকল্পেও সম্পদ দেখানোর অভিযোগ

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) আর্থিক প্রতিবেদনে অর্থবছরের ৩০ জুন পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছ থেকে কোম্পানির মোট পাওনা ৫৬০ কোটি ১২ লাখ টাকা। নিরীক্ষকের মতে, এর মধ্যে ৩১১ কোটি ৭ লাখ টাকা পুনরুদ্ধার অযোগ্য। এই অঙ্কের মধ্যে বিহারী ক্যাম্প থেকে পাওনা হিসেবে ২৬৩ কোটি ৮ লাখ টাকা দীর্ঘদিন ধরে জমা হয়ে আসছে। একইসঙ্গে নিষ্ক্রিয় গ্রাহক হিসাব থেকে পাওনা ৪৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সন্দেহজনক পাওনার বিপরীতে কোম্পানি মাত্র ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকার প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখেছে। ফলে ডেসকোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। নিরীক্ষক জানিয়েছে, এর ফলে কোম্পানির সম্পদ অতিরিক্ত দেখানো হয়েছে এবং সমাপ্ত অর্থবছরের ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হয়েছে বলে মনে করে ।

এছাড়া ডেসকোর আর্থিক প্রতিবেদনে ৬৬০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার মজুদ পণ্য (ইনভেন্টরি) দেখানো হয়েছে। তবে হিসাব সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যারে মজুদ পণ্যের আর্থিক মূল্য খুঁজে পায়নি নিরীক্ষক। কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো বাহ্যিক যাচাই-বাছাইও করা হয়নি। ফলে নিরীক্ষকের পক্ষে প্রদর্শিত মজুদ পণ্যের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, ৩০ জুন পর্যন্ত চলতি মূলধন প্রকল্প (সিডব্লিউআইপি) হিসেবে ডেসকো ৫৬২ কোটি ৪১ লাখ টাকা দেখিয়েছে। এর মধ্যে গুলশানে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড সাবস্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের (ইউজিএসএস) ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাতিল করে। প্রকল্প বাতিলের আগে ব্যয় হওয়া ৭৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা এখনও চলতি মূলধন প্রকল্প হিসেবে বহাল রয়েছে।

নিরীক্ষকের মতে, এই মূলধন ব্যয়ের আর কোনো অর্থনৈতিক বা ব্যবসায়িক মূল্য অবশিষ্ট নেই এবং এটিকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল। তা না করায় প্রকল্পাধীন মূলধনের (সিডব্লিউআইপি) পরিমাণ বাস্তবের তুলনায় বেশি দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোম্পানির বক্তব্য

এসব বিষয়ে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) কোম্পানি সেক্রেটারী মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, যেহেতু বিহারী ক্যাম্পের দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া হয় এবং এটা নিয়ে একটা মামলা আছে এজন্য এটাকে প্রভিশনে নেওয়া হয়নি।

গুলশানের প্রকল্প বন্ধের প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, এটা আগামী বছর থেকে সরকার যখন এটাকে ক্যানসেল বলে দিবে। পূর্ণাঙ্গভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার পর থেকে বোধয় ১০ বছর ধরে প্রতি বছরে সমান হারে এটা সমন্বয় করবে।
স্টোর ও একাউন্টসে দুইটি পৃথক সফটওয়্যারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের স্টোরে যে সফটওয়্যারটা ইউজ হয় সেই সফটওয়্যারটারে ইস্যু করার সময় টাকার অ্যামাউন্ট আসে না। কিন্তু পরিমাণ থাকে। যার ফলে অ্যাকাউন্টসে যে সফটওয়্যারটা ব্যবহার করা হয় ওই কোয়ান্টিটি আর এটা ম্যাচ করার সঙ্গে সঙ্গে টাকার অংকটা বের হয়ে আসে। তো আমাদের সাজেশন ছিল যে, স্টোরেজ যে সফটওয়্যারটা ব্যবহৃত হচ্ছে সেই অংশটাতেও টাকার অংক থাকতে হবে। সেটা ওই সফটওয়্যার যারা ডেভেলপ করেছে তাদেরকে জানানো হয়েছে তারা এটা ডেভেলপ করে দিচ্ছে।

ডরিন পাওয়ারে পিপিএ শেষ, ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তা

আরেক কোম্পানি ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির তিনটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বাংলাদেশ রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন বোর্ড (বিআরইবি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে মোট ৬৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) ছিল। ১৫ বছর মেয়াদি এসব চুক্তির মেয়াদ যথাক্রমে ২০২৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে। চুক্তিগুলো নবায়ন এখনও নবায়ন হয়নি। এমন অবস্থায় কোম্পানিটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে কি না সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে নিরীক্ষক।

তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উল্লিখিত তিনটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে বন্ধ থাকলেও ডরিন পাওয়ারের প্রায় শতভাগ মালিকানাধীন ফার্নেস অয়েলভিত্তিক তিনটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২২৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) মেয়াদ যথাক্রমে ২০৩১ সালের ১৬ জুন, ২০৩১ সালের ১৬ আগস্ট এবং ২০৩৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে। কোম্পানির মতে, এসব সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের মাধ্যমে নিজস্ব কার্যক্রম এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণসংক্রান্ত ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে। পরিচালনা পর্ষদ আরও জানিয়েছে, কোম্পানিকে অবসায়নের কোনো ইচ্ছা বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই এবং এমন কোনো পরিস্থিতিও নেই, যা কোম্পানির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ সৃষ্টি করে।

খুলনা পাওয়ারে চুক্তিহীন উৎপাদন ও সম্পদ অবমূল্যায়নের ঝুঁকি

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অন্য কোম্পানি খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে ইউনিট–২ ও ইউনিট–৩ এর বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে বিপিডিবি ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল এক চিঠিতে ‘নো ইলেক্ট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ নীতিতে উভয় ইউনিটের কার্যক্রম পুনরায় শুরুর নির্দেশ দেয়।

কিন্তু নতুন করে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সম্পাদিত না হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নিরীক্ষকের মতে, এই পরিস্থিতি কোম্পানির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব কোম্পানির পরিচালন মুনাফার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে পড়তে পারে।

এছাড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট থেকে প্ল্যান্টের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ভূমি ছাড়া অন্যান্য সম্পদ, কারখানা ও যন্ত্রপাতির (পিপিই) মূল্য হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, পিপিইর বইমূল্য সম্ভবত এর পুনরুদ্ধারযোগ্য মূল্যের তুলনায় বেশি হতে পারে, যা অবমূল্যায়নের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। তবে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই সম্ভাব্য অবমূল্যায়ন আর্থিক হিসাব ও আর্থিক প্রতিবেদনের জন্য এখনো মূল্যায়ন করেনি। এসব বিষয়ে কোম্পানিটির এমডি আল মামুন এম আতিকুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

পাওয়ার গ্রিডে আন্তর্জাতিক হিসাবমান না মানার অভিযোগ

এদিকে ২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ পিএলসির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নিরীক্ষক জানিয়েছে, কোম্পানিটি ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার অবাস্তব লোকসান (আনরিয়ালাইজড ফরেন এক্সচেঞ্জ লস) হিসেবে মোট ৪ হাজার ৭১৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর মধ্যে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৩৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা চলতি মূলধন প্রকল্প (সিডব্লিউআইপি) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, এই হিসাব কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য হলেও আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস–২১ অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়জনিত লোকসান সংশ্লিষ্ট সময়ের লাভ-ক্ষতির বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু কোম্পানি তা না করে লোকসানকে সম্পদের অংশ হিসেবে দেখিয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদনে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড আদার রিসিভেবলস খাতে কোম্পানি মোট ১ হাজার ১১৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা পাওনাদারি দেখিয়েছে। এর মধ্যে বিপিডিবি ও পিবিএসের কাছে পাওনা যথাক্রমে ১৬৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এই দুই কোম্পানির কাছ থেকে মোট ১৭০ কোটি ৭৫ লাখ বিতর্কিত পাওনা হিসেবে উল্লেখ করেছে নিরীক্ষক। নিরীক্ষক তাঁর মতামতে জানিয়েছে এসব অর্থ সম্পূর্ণভাবে আদায় হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও এর বিপরীতে কোনো প্রভিশন বা সম্ভাব্য ক্ষতির সঞ্চিতি রাখা হয়নি।

একই সঙ্গে ডিপিডিসি থেকে হস্তান্তরিত ঋণ বা অ্যাসাইনড লোন ফ্রম ডিপিডিসি (ডেসা) হিসেবে কোম্পানি ৩৫৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা দেখিয়েছে, যা আগের অর্থবছর (২০২৩–২৪) থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। নিরীক্ষক জানিয়েছে, এই ঋণের অস্তিত্ব ও সঠিকতা যাচাইয়ের মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি ডিপিডিসির ২০২৪–২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে পাওয়ার গ্রিডকে পাওনাদারি বা রিসিভেবল হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ঋণটির অনুমোদিত মোট পরিমাণ, পরিশোধের সময়সূচি কিংবা কোনো বকেয়া আছে কি না সে তথ্যও নিরীক্ষকদের কাছে সরবরাহ করা হয়নি।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানি মেয়াদী ঋণের বিপরীতে পরিশোধযোগ্য সুদ হিসেবে মোট ৭ হাজার ৯৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা দেখিয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ প্রকল্পের ঋণের বিপরীতে সুদ (আর্থিক ব্যয়) ৭৩২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, বন্ধ প্রকল্পগুলোর বিদেশি মুদ্রায় নেওয়া ঋণের সুদ হিসাব করা হয়েছে টাকায় রূপান্তরিত মূল ঋণের ওপর, যা আন্তর্জাতিক হিসাবপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে ঋণের মূলধনের ওপর বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়জনিত লাভ বা ক্ষতির ওপর পুনরায় সুদের হার প্রয়োগ করা হয়েছে।

নিরীক্ষক বন্ধ প্রকল্পের ১০টি ঋণের সুদ পুনরায় হিসাব করে দেখেছেন, এতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সুদ ব্যয় ২০৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা কম দেখানো হয়েছে। ফলে বিদেশি মুদ্রার ঋণসংক্রান্ত সুদ ব্যয় এবং পরিশোধযোগ্য সুদ উভয়ই আর্থিক প্রতিবেদনে কম দেখানো হয়েছে বলে মতামত দিয়েছে নিরীক্ষক।

এছাড়া নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, বন্ধ প্রকল্পের ঋণের সুদ সাধারণত ঋণ চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে পরিশোধযোগ্য। কিন্তু গ্রেস পিরিয়ড শেষে কোম্পানি অনুমোদন ছাড়া নতুন একটি পরিশোধ সময়সূচি তৈরি করে, যা অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন করেনি। পরবর্তীতে সেই নতুন সময়সূচিও অনুসরণ করা হয়নি এবং দেরিতে কিস্তি পরিশোধ শুরু হলেও বিলম্বিত সময়ের সুদ হিসাব ও পরিশোধ করা হয়নি। অর্থাৎ অনুমোদনহীন নতুন সময়সূচি তৈরি, তা অনুসরণে ব্যর্থতা এবং বিলম্বিত সময়ের সুদ পরিশোধ না করার বিষয়টি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

পাওয়ার গ্রিডের ব্যাখ্যা

পাওয়ার গ্রিডের নির্বাহী পরিচালক মোঃ মুনিরুজ্জামান ১৭০ কোটি টাকার বিতর্কিত ঋণের বিষয়ে জানান, ধীরে ধীরে পেমেন্ট করে দিচ্ছে। এগুলা যে একদম যে পাওয়া যাবে না সেরকম না। আমরা নিজেরা একটি কমিটিও করেছি এবং এটা আমরা নিজেরা বিষয়টা সমাধান করছি।

ডিপিডিসির হস্তান্তরিত ঋণের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) পূর্বে ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই অথোরিটি (ডেসা) ছিল। ডেসার কিছু এরিয়া আছে ও যে সাবস্ক্রিপশন ছিল সেগুলো ট্রান্সফার পাওয়ার গিডে চলে গেছে। তখন ওখানে কিছু ভেন্ডরস এগ্রিমেন্ট হয়েছে। সম্পদ ট্রান্সফার হলেও কিছু বিষয় অমিমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে। তবে এসব বিষয় চুক্তি অনুযায়ী সমাধান করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সহযোগী কোম্পানিগুলো থেকে ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনায় আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে প্রচুর প্রজেক্ট হয়। এখানে নিজস্ব অর্থায়নের একটা বড় ইস্যু আছে। যেহেতু আমাদের হুইলিং চার্জটা একটু কম। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে প্রজেক্ট করতে হয়। এজন্য রেগুলার ডিএসএলটা দিতে পারছি না। তবে আমরা গত বছরে ১৫০০ কোটি টাকা ডিএসএল পরিশোধ করেছি। এবার এই সপ্তাহে আমরা ২৫৩ কোটি টাকা পরিশোধ করছি।

ওটা ভেরিফাই করে যদি এরকম থাকে তাহলে আমরা আবার অ্যাডজাস্ট করে নেব। কারণ আমাদের এখানে প্রচুর প্রজেক্ট আছে তার মধ্যে এরকম দুই একটা যদি ডিসক্রিপেন্সি থাকে। সেটা সেটেলমেন্ট হয়ে যায়। আমাদের তো অডিটর তো কন্টিনিউয়াস আছে।

সুদ ব্যয়ের অসঙ্গতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওটা ভেরিফাই করে যদি এরকম থাকে তাহলে আমরা আবার অ্যাডজাস্ট করে নেব। কারণ আমাদের এখানে প্রচুর প্রজেক্ট আছে তার মধ্যে এরকম দুই একটা যদি ডিসক্রিপেন্সি থাকে। সেটা সেটেলমেন্ট হয়ে যায়। আমাদের তো অডিটর তো কন্টিনিউয়াস আছে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

আইএমএফ-বিএসইসি বৈঠক টেকসই অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ক্লাইমেট পলিসি ডায়াগনস্টিক টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স মিশনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ...

সিএসই-৩০ ইনডেক্সে নতুন ৪ কোম্পানি যুক্ত

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিএসই-৩০ ইনডেক্স পুনর্গঠন করা হয়েছে। ...

পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বেড়েছে ৯০ শতাংশ

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিন দেশের শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছিল মন্দাভাব। এই মন্দা কাটিয়ে ...

মার্জিন বিধিমালার খসড়া সংশোধনী প্রকাশ, মতামত আহ্বান

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর খসড়া সংশোধনী প্রকাশ করেছে বিএসইসি। একইসঙ্গে খসড়া ...

মার্জিন বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাল ডিবিএ

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫ সংশোধনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন ...