জাহাঙ্গীর আলম আনসারী, সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত: এপ্রিল ২১, ২০২৬ ৯:৩৭ এএম , আপডেট: এপ্রিল ২১, ২০২৬ ৯:৫০ এএম

কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতির পদে বহাল থাকতে এ্যাটর্নী অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে অফিসার পদে প্রাপ্ত পদোন্নতি বাতিলের জন্য শ্রম আদালতে মামলা করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত্ব অগ্রণী ব্যাংকের কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন খান। শ্রম আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়ার পর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে আবার মামলা করেছেন। মামলাটি এখন চলমান। তবে একাধিকবার মামলার শুনানি পিছিয়েছে। আর কালক্ষেপন করতে বারবার মামলার শুনানি পেচানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মচারী কল্যাণ সমিতির একাধিক নেতা বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, একজন কর্মচারী অফিসার পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর আর ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারে না। কিন্তু আরিফ হোসেন খান বছরের পর বছর ধরে নিয়ম লঙ্ঘন করে তিনি সমিতির বিভিন্ন পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সমিতির পদ ধরে রাখতে তিনি আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। বারবার মামলার শুনানি পিছিয়ে কালক্ষেপন করছেন। ব্যাংকের নিয়োপ্রাপ্ত আইনজীবীও তার পক্ষে কাজ করছে। তিনি ঠিক মতো শুনানিতে যান না। এবং গেলেও তার বিপক্ষে কোনো জোরালো ভূমিকা রাখেন না।

তাদের অভিযোগ, অধিক সুবিধার জন্যই তিনি পদোন্নতি চান না। অফিসার পদে গেলে তাকে কাজ করতে হবে। আর এখানে থাকলেতো আর কাজ করতে হয় না। নেতাগিরি করেই চলতে পারেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক ও আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আশুতোষ চন্দ্র সিকদার বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, এটার মামলা চলমান। আদালত থেকে নির্দেশনা না আসা পর্যাপ্ত কিছু বলতে পারছি না। আর মামলার শুনানি কয়েকবার পিছিয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আরিফ হোসেন খান অগ্রণী ব্যাংকে মুদ্রাক্ষরিক পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পান। পরে ১৯৯৩ সালের ২৬ জানুয়ারি তার চাকরি স্থায়ী হয়। তারপর ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউডিএ পদে এবং ২০১৪ সালে তাকে এটর্নী অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। আর ২০১৫ সালে তিনি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক হন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে এটর্নী অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে অফিসার পদে পদোন্নতি প্রদানের পরই বেকে বসেন। পদোন্নতি নিতে অস্বীকার করেন। এর মূল কারণ হল অফিসার হলে তিনি আর সমিতি করতে পারবেন না। পদোন্নতি বাতিলের জন্য তিনি মামলাও করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ হোসেন খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, আমি পদোন্নতি গ্রহণ করিনি। এটা বাতিলের জন্য আমি মামলা করেছি। আমার মামলা চলমান। আমি আইনের বাইরে কিছু করছি না। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন- এতদিন কোথায় ছিলেন? এখন আমার দল ক্ষমতায়, এখন এসব প্রশ্ন কেন?

তাহলে দলের প্রভাবে আপনি সমিতির সভাপতি পদে আছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কিছু বলেন নি।

আপনি প্রমোশন বাতিলের জন্য মামলা করছেন কেন এবং অফিসার পদ বাদ দিয়ে সমিতিতে আপনার সুবিধা কী-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি কর্মচারীদের নেতৃত্ব দিতে চায়। আমার বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করছে সবই মিথ্যা। কোনো সুবিধার জন্য আমি সমিতি করি না। আর এখন পর্যন্ত অফিসার পদের কোনো সুবিধা আমি নেইনি।

তবে একাধিক সূত্রের দাবি, ২০১৭ সালে এ্যাটর্নী অ্যাসিস্ট্যান্ট পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে অফিসার হওয়ার পর তিনি দশম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে চাকরির সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, অথচ একই সঙ্গে নিজেকে সমিতিতে প্রতিষ্ঠিত রেখে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতৃত্বে থাকা নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, কর্মকর্তা ও কর্মচারী এই দুই স্তরের স্বার্থ, দায়িত্ব ও প্রশাসনিক অবস্থান এক নয়। ফলে, একজন কর্মকর্তা হয়েও কর্মচারী সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আরিফ হোসেন খান তার চাকরি-সংক্রান্ত অবস্থানকে কেন্দ্র করে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে সেই মামলা দুই দফায় খারিজ হয়ে যায়। আদালত থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়, পদোন্নতি বাতিল করার ক্ষমতা বা এখতিয়ার কারও নেই। অর্থাৎ, তিনি একবার কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর সেটিকে বাতিল দেখিয়ে কর্মচারী কোটার সুবিধা বা নেতৃত্ব ধরে রাখার সুযোগ নেই এমনটাই আদালতের অবস্থান বলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাইয়ে দেখা যায় ।

তবুও প্রশ্ন উঠেছে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনিক বাস্তবতা স্পষ্ট থাকার পরও কেন প্রায় আট বছর ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে?

ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, শুধুমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতি ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ বজায় রাখতেই এ ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে অমীমাংসিত রাখা হয়েছে।

একাধিক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সমর্থিত সিবিএ-সংশ্লিষ্ট সদস্যদের নিয়ে জাতীয়তাবাদী সমর্থিত কর্মচারী কল্যাণ সমিতির কমিটি গঠন করা হয়েছে তার প্রত্যক্ষ মদদে। এটি শুধু সাংগঠনিক প্রতারণাই নয়, বরং কর্মচারী রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার একটি কৌশল।

সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, আদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা কর্মচারীদের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয় বরং নিয়ন্ত্রণ, সুবিধা বণ্টন এবং প্রভাব ধরে রাখাই ছিল এই কমিটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য। ফলে সংগঠনটি প্রকৃত কর্মচারী কল্যাণের প্ল্যাটফর্ম না হয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসন যদি শুরুতেই নিয়ম অনুযায়ী অবস্থান পরিষ্কার করত, তাহলে আজ এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হতো না। তাদের মতে, একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে কর্মকর্তা পদমর্যাদার সুবিধা ভোগ করবেন, আবার কর্মচারী রাজনীতির শীর্ষ পদও আঁকড়ে থাকবেন এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তারা আরও বলেন, ব্যাংকের শৃঙ্খলা, পদমর্যাদাভিত্তিক কাঠামো এবং সুশাসনের স্বার্থে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় এটি ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক সংকট তৈরি করতে পারে।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও ‘এক্সিট’ সুবিধা

ব্যাংকের পর এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও (ফাইন্যান্স কোম্পানি) খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিলেন আবেদুর রহমান

নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আবেদুর রহমান ...

পুরনো মালিকদের হাতে আল-আরাফাহ ব্যাংক ফিরিয়ে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার ভার পুরনো মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার ...