জাহাঙ্গীর আলম আনসারী, সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬ ১০:৪৫ পিএম , আপডেট: মে ৬, ২০২৬ ১০:৪৭ পিএম
  • এক মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২.২৫ বিলিয়ন ডলার
  • এক মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি কমেছে ৬১ কোটি ডলার
  • আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ৩৮১ কোটি ডলার

>> বাণিজ্য ঘাটতি প্রশমনে সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঘাটতির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকা অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করতে হবে: হেলাল আহমেদ খান

মার্কিন-ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পণ্য আমদানিতে। এ কারণে বেড়েছে আমদানি খরচ। এর সাথে বেড়েছে পণ্য আমদানিও। বিপরীতে কমেছে পণ্য রপ্তানি। ফলে ধারাবাহিক বাড়ছে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি। সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন বা ২২৫ কোটি ডলার। আর আগে ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছিল ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন বা ৩১৩ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-এর (বিওপি) সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ ডলার। আর অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাড়িঁয়েছে ১ হাজার ৯১৭ কোটি ৩ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক মাসে (মার্চ) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২২৫ কোটি বা ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ২৩৮ কোটি ৩ লাখ ডলারের। আর অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ১৫৫ কোটি ৬ লাখ ডলারের। এই সময়ে রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি হয়েছে ১ হাজার ৯১৭ কোটি ৩ লাখ ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি নির্ভরতা। তারা বলছেন, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। কিন্তু একই হারে রপ্তানি বাড়ছে না, ফলে ঘাটতি বাড়ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে এবং ডলারের বিনিময় হার আরও বাড়তে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলসি খোলার খরচ বৃদ্ধি এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা সরাসরি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে।

বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অর্থনীতি গবেষক হেলাল আহমেদ খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে আমদানি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়া। বিশেষত জ্বালানি তেল ও এলএনজি, শিল্প-কারখানার কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারি অন্যতম। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট, জ্বালানি আমদানি উচ্চ ব্যয়, সীমিত উৎপাদন, রপ্তানির সীমাবদ্ধতা এ ঘাটতি আরো ত্বরান্বিত করেছে। একই সাথে আমেরিকা ইসরাইল ইরান যুদ্ধ এই সঙ্কটকে আরো তীব্র করেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যেতে পারে, টাকার মান দুর্বল হবে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি হতে পারে, ব্যাংকিং ও আমদানি ব্যবস্থায় চাপ পড়তে পারে। এই বাণিজ্য ঘাটতি প্রশমনে সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঘাটতির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকা অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করতে হবে।

চলতি হিসাবে ঘাটতি কমেছে

এদিকে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও দেশের চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতি কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ১০০ কোটি ডলার। আর অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৭ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি কমেছে ৬১ কোটি ডলার।

চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট হলো একটি দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) অন্যতম প্রধান উপাদান। পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, বিদেশ থেকে আসা আয় ও রেমিট্যান্সের মতো চলতি হস্তান্তর এর অন্তর্ভুক্ত।

আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত কমেছে

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের আর্থিক হিসাবে উদ্ধৃত্ত ছিল ৪০৮ কোটি ৩ লাখ ডলার। আর অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশের আর্থিক হিসাবে উদ্ধৃত্ত কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮১ কোটি ২ লাখ ডলার।

ট্রেড ক্রেডিটে উদ্ধৃত্ত বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে ২৫৬ কোটি ২ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। আর অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে উদ্ধৃত্ত দাড়িয়েছে৩২৩ কোটি ৫ লাখ ডলার।

ট্রেড ক্রেডিট হচ্ছে পণ্য বা পরিষেবা যা এখনই গ্রহণ করা হলেও মূল্য পরে পরিশোধ করা হয়। একে ব্যালান্স অভ পেমেন্টের (বিওপি) স্বল্পমেয়াদি মূলধন প্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ এটি সরাসরি পণ্য আমদানির সঙ্গে অর্থায়নের সম্পর্ক স্থাপন করে।

সার্বিক ভারসাম্যে উন্নতি

আলোচ্য সময়ে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও উন্নতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৩৪২ কোটি ৭ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। আর অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে উদ্ধৃত্ত দাড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি ৯ লাখ ডলার

এফডিআই

দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) বাড়ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুলাই-‌মার্চ ১৩১ কোটি ডলারের এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা ১০০ কোটি ডলারে হ‌য়ে‌ছে।

ত‌বে আলোচিত দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট) নেতিবাচক অবস্থায় নে‌মে‌ছে। অর্থবছরে প্রথম ৯ মা‌সে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (নিট) যা এসেছিল তার চেয়ে ১০ কোটি ৭০ লাখ ডলার চলে গেছে। তার আগের অর্থবছরের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল (ঋণাত্মক) ১০ কোটি ৫০ ডলার।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

খেলাপি হলে মিলবে না ইডিএফ ঋণের নতুন সুবিধা

রপ্তানিমুখী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার অর্থায়ন আরও সুশৃঙ্খল করতে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ...

ফ্রিল্যান্সার ও সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজে নতুন নির্দেশনা

দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ করতে নতুন নির্দেশনা ...