

বহুদিন ধরে ধুঁকছে দেশের পুঁজিবাজার। দীর্ঘদিনের অনিয়ম-কারসাজিতে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাত। একদিকে যখন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে, অন্যদিকে পুঁজিবাজার যেন হেঁটে চলেছে বিপরীত পথে।
গত ১ বছর ধরেও বাজারে দেখা দিয়েছে এক ধরনের স্থবিরতা। পুঁজিবাজারের এই বেহাল দশার পেছনে অন্যতম প্রধান কারন হলো মার্জিন ঋণ থেকে সৃষ্ট নেগেটিভ ইক্যুইটি। যেটিকে বাজার সংশ্লিষ্টরা অভিহিত করেছেন ক্যান্সার হিসেবে।
নেগেটিভ ইক্যুইটি কি?
পুঁজিবাজারে মার্চেন্ট ব্যাংক ও স্টক ব্রোকারগুলোর গ্রাহক বা বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ হিসাব থেকে অনাদায়ী লোকসানকে নেগেটিভ ইক্যুইটি বলা হয়।
অর্থাৎ কোনো বিনিয়োগকারীর মার্জিন অ্যাকাউন্টে থাকা শেয়ারের বাজারমূল্য যখন তার ঋণ ও নিজের মূলধনের চেয়েও কমে যায়। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারী তার অ্যাকাউন্টের দায়ভার বহন করতে ব্যর্থ হন, ফলে তার ইক্যুইটি ঋণাত্মক হয়ে পড়ে।
নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ:
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএসই ও সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারোজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৭টি মার্জিন বিও হিসাবে মার্জিন ঋণ দিয়েছে। এ ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
ডিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলো থেকে দেয়া মার্জিন ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকৃত নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ ৫ হাজার ১৪৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং সুদ ১ হাজার ১৯১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
ফলে, ডিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজগুলোর মোট নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩৩৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো মোট প্রভিশন রেখেছে ১ হাজার ৪৫৮ কোটি ৯ লাখ টাকা।
সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলো বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ দিয়েছে ৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রকৃত নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ ৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং সুদ ২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ফলে, সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মোট নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো মোট প্রভিশন রেখেছে ১ হাজার ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, বিএসইসির অনুমোদিত মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ দিয়েছে ৬ হাজার ৫৪৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রকৃত নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ ২ হাজার ৭০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং সুদ ১ হাজার ৪৫০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ফলে, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো মোট প্রভিশন রেখেছে ১ হাজার ২৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএসই ও সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের মোট নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫২৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট প্রভিশন রেখেছে ২ হাজার ৭০১ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসেবে প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাদে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮২৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
কীভাবে তৈরি হলো এই সমস্যা?
বাজার পতনের সময় যেসব বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনেন, তারা লোকসানে পড়লে অনেক সময়ই সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারেন না। ফলে এই লোকসান জমে জমে পরিণত হয় অনাদায়ী দায়ে। ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো এই ক্ষতির ভার বহন করতে বাধ্য হয়। বছরের পর বছর ধরে এই অনাদায়ী অর্থ জমে একটি বিশাল আকার ধারণ করেছে। জানা যায়, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধ্বসের সময় থেকেই নেগেটিভ ইক্যুইটি তৈরি হয়েছে। ওই সময় বড় ধস হলেও ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফোর্সড সেল করতে পারেনি। ফলে বিপুল পরিমাণের বিনিয়োগ নেগেটিভ ইকুইটিতে পরিণত হয়।
বাজারে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নেগেটিভ ইক্যুইটির কারণে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ধুকছে। এর ফলে ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষেনের চাপ সামলাতে হচ্ছে। ফলে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা বাজারকে নিয়ন্ত্রণহীন ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে।
একটি শীর্ষস্থানীয় সিকিউরিটিজ হাউজের কর্মকর্তা জানান, সিকিউরিটিজ হাউজগুলো অনেক সময় ঋণ নিয়ে তাঁর গ্রাহকদের মার্জিন ঋণ দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে একদিকে হাউজগুলোকে গৃহীত ঋণের সুদ প্রদান করতে হচ্ছে অন্যদিকে বিনিয়োগকারীর হিসাবে থাকা ঋণও ঋণাত্বক হয়ে গেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ
এই সমস্যা সমাধানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। নেগেটিভ ইকুইটি সমন্বয়ে ২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত সময় বাড়িয়ে চলছে বিএসইসি। সর্বশেষ ডিবিএ ও বিএমবিএ’র আবেদনের প্রেক্ষিতে স্টক ব্রোকার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের গ্রাহকের মার্জিন অ্যাকাউন্টে সৃষ্ট নেগেটিভ ইক্যুইটির ওপর প্রভিশন সংরক্ষণের সময়সীমা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করার সিদ্ধান্ত নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, নেগেটিভ ইক্যুইটিকে রাইটড অফ করা বা এটিকে প্রভিশনিং করে মিটিয়ে ফেলার জন্য একটা পরিকল্পনা দাখিলের জন্য বিএসইসি ৩০শে জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছিল। যারা পরিকল্পনা দেয় নাই তাদেরকে এই মাসের মধ্যে পরিকল্পনা জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো পাওয়ার পরে কমিশন কেইস টু কেইস যার যার অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে কে কত সময়ের মধ্যে প্রভিশনিং করবে সেটা বিবেচনা করা হবে।
সবাইকে একই সময় দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, কারও ১০ কোটি টাকা নেগেটিভ ইক্যুইটি আবার কারও ১০ লাখ, এটা তো এক না। এজন্য কেইস টু কেইস সময় বিবেচনা করে সময় দেওয়া হবে।
ভুগতে হবে আরও কয়েক বছর:
নেগেটিভ ইক্যুইটি সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পদক্ষেপ নিলেও খুব দ্রুতই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় নেই। পুঁজিবাজারে বিদ্যমান এই সমস্যা সমাধানে পাঁচ বছর সময় চায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ফোরাম বাংলাদেশ মার্চেন্টন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)।
স্বয়ং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যানও তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, নেগেটিভ ইক্যুইটি সাথে নিয়ে আমাদের চলতে হবে আরও ৪ থেকে ৫ বছর।
এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজন।
এম জি
- ১রোববার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যাবেন প্রধানমন্ত্রী
- ২হাসিনার নির্দেশে গুম করা হয়েছিল সালাহউদ্দিন আহমদকে
- ৩সড়ক-বাড়িতে দূষিত পানি, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সরিষাবাড়ীবাসী
- ৪গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানা, ঋণের সুদ মওকুফ চায় চট্টগ্রাম চেম্বার
- ৫বাংলা কিউআর ব্যবহারে চাঁদাবাজি ও জাল নোটের ঝুঁকি কমবে : গভর্নর
- ৬সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা
- ৭৪২ কৃতী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি ও সম্মাননা দিল মোড়লগঞ্জ মডেল একাডেমি
- ৮ইরানের শর্ত পুরোপুরি মানলেই খুলবে হরমুজ প্রণালি: আইআরজিসি
- ৯অসহায় মায়ের ৫০০ টাকার ভাড়ার জন্য চুল বিক্রি, তবু জোটেনি ঘর
- ১০দেশে বিনিয়োগ করতে চায় গুগল-মেটা-টিকটক: আইসিটি মন্ত্রী
- ১সাতক্ষীরা-ভেটখালী সড়কে বড় বড় খানাখন্দ, চলাচলে চরম ভোগান্তি
- ২সিন্ডিকেট-মজুদদারির বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করবে সরকার
- ৩আখাউড়ায় শাহপীর কল্লা শহীদ’র ওরস সোমবার শুরু
- ৪চিকিৎসক সমাজের পেশাগত উৎকর্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ড্যাব
- ৫অসময়ে তরমুজ চাষে কৃষকের দৃষ্টান্ত স্থাপন
- ৬সমনবাগ চা বাগানে ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে গণবিক্ষোভ
- ৭কাপাসিয়ায় বাবার খরিদকৃত জমি দখল চেষ্টা, থানায় মেয়ের অভিযোগ
- ৮আমরা বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই: শিক্ষামন্ত্রী
- ৯ভরিতে ফের ৪৩৭৪ টাকা বাড়লো সোনার দাম
- ১০চাহিদা অনুযায়ী বগুড়ার তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি: বাণিজ্যমন্ত্রী





পাঠকের মতামত